প্রতি মুহূর্তের প্রতিবন্ধকতাই মিনুর ‘অ্যাডলাইফ‍‍‘-এর জন্মদাতা

0

দিনরাত এক করে মানসিক অক্ষমতার শিকার সন্তানের দেখভাল করতে গিয়ে ভাবনাটা মাথায় আসে কলকাতার মিনু বুধিয়ার। কারণ এমন এক সন্তানকে নিয়ে সার্বিক পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার লড়াইটা যে একজন মায়ের পক্ষে কতটা কঠিন তা প্রতি মুহুর্তে অনুভব করতেন মিনু। বাইরের জগতে এমন সন্তানের চিকিৎসা থেকে শুরু করে ভবিষ্যত গড়ার যুদ্ধে পদে পদে কী ধরণের সমস্যার মুখে অভিভাবকদের পড়তে হয় তা হাড়ে হাড়ে টেরও পাচ্ছিলেন তিনি। যে সমস্যার সম্মুখীন তাঁকে প্রতি পদে হতে হয়েছে তা যেন অন্যদের না হয় সেই ভাবনা থেকেই মিনু বুধিয়া গড়ে তোলেন অ্যাডলাইফ। এমন এক কেন্দ্র যেখানে আছে চিরাচিরত ও অচিরাচরিত দু‍’ভাবেই মানসিক বিকাশের চিকিৎসার সুযোগ।

ছোট থেকে মিনু বুধিয়ার মেয়ে প্রাচী মানসিক অক্ষমতার শিকার। ফলে মা হিসাবে তিনি প্রতি মুহুর্তে ভাবতেন মেয়ের ভবিষ্যত নিয়ে। বড় হয়ে প্রাচী কী করবে তা ভাবতে গিয়ে কুলকিনারা পেতেন না মিনু। শুধু টিভি দেখা আর বিকেলে বেড়ানোর মধ্যেই নিজের মেয়ের জীবনকে বেঁধে ফেলায় প্রবল আপত্তি ছিল তাঁর। তিনি চাইতেন প্রাচীও বড় হয়ে আর পাঁচজনের মত চাকরি করুক। নিজের পায়ে দাঁড়াক। বিদেশে এধরণের সুবিধা থাকলেও ভারতে সেসব নেই। আবার এমন ছেলেমেয়েদের সুস্থ জীবনে ফেরানোর চিকিৎসাও সমস্যার। কারণ এক একটা জায়গায় এক এক রকম চিকিৎসা করাতে নিয়ে যেতে হয়। যা অভিভাবকদের জন্য অবশ্যই সমস্যার।

অনেকটা শখ মেটাতেই মানুষের মন ও চিকিৎসা বিজ্ঞান নিয়ে বাড়িতে অবসর সময়ে পড়াশোনা করতেন মিনু বুধিয়া। কগনিটিভ বিহাভিওর থেরাপি বা সাইকোথেরাপির কোর্সও করেন। বিভিন্ন স্কুল, কলেজে ছাত্রছাত্রীদের কাউন্সেলিংয়ের কাজও শুরু করেন তিনি। সেইসঙ্গে চলছিল প্রাচীকে নিয়ে বিভিন্ন থেরাপি সেন্টারে ছোটাছুটি। একএকটা জায়গায় এক এক রকম থেরাপি ও চিকিৎসা করাতে গিয়ে মিনু অনুভব করেন এমন একটা জায়গা দরকার যেখানে মানসিক অক্ষমতার চিকিৎসার এক ছাদের তলায় সব রকম সুযোগ সুবিধা পেতে পারেন সাধারণ মানুষ।

মিনু বুধিয়ার হাত ধরে শুরু হয় অ্যাডলাইফ। প্রায় দু‍’বছর কেটে গেছে। সেইসঙ্গে অনেকটা উন্নতিও করেছে মিনুর এই সংস্থা। চারটি পদ্ধতিতে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে অ্যাডলাইফ। ক্লিনিক্যাল, ট্রেনিং এণ্ড ডেভেলপমেন্ট, অ্যাকাডেমিয়া ও মাইন্ডস্পিক। ক্লিনিক্যাল বিভাগ সাইকিয়াট্রিস্ট, সাইকোলজিস্ট, ফিজিওথেরাপিস্ট, স্পিচ থেরাপিস্ট ও ভয়েস ক্লিনিকের মাধ্যমে চিকিৎসা করে।ট্রেনিং এণ্ড ডেভেলপমেন্ট বিভাগ অভিভাবক, ছাত্রছাত্রী, স্কুল কর্তৃপক্ষ, কর্পোরেট দুনিয়ার মানুষজনের জন্য কর্মশালার আয়োজন করে। অ্যাকাডেমিয়া সাধারণ কাউন্সেলিং কোর্স থেকে শুরু করে প্লে থেরাপি, বিহাভিওর মডিফিকেশন, স্পেসিফিক লার্নিং ডিসঅর্ডার সহ বিভিন্ন কোর্স করিয়ে থাকে। মাইন্ড স্পিক হল মুক্ত মঞ্চ। যেখানে মানসিক অক্ষমতা সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে যে কেউ তাঁর বক্তব্য তুলে ধরতে পারেন।

আগামী দিনে আরও একটি নতুন বিভাগ চালু করতে চলেছেন অ্যাডলাইফের প্রতিষ্ঠাতা মিনু বুধিয়া। ‘আই ক্যান ফ্লাই’ নাম দিয়ে এই নয়া বিভাগে ভোকেশনাল টাস্কের মধ্যে দিয়ে মূলত ‌মানসিক অক্ষমতার শিকার যুবক যুবতীদের চিকিৎসা করা হবে। তাঁরাও যে সমাজকে সৃজনশীল কিছু দিতে পারে সেই বিশ্বাস তাদের মধ্যে তৈরি করাই হবে এই বিভাগের মুখ্য উদ্দেশ্য। মিনু বুধিয়ার দাবি, আই ক্যান ফ্লাই কোর্সে যোগ দেওয়া যুবক যুবতীদের মধ্যে লুকিয়ে থাকা প্রতিভা খুঁজে বার করে তাদের সেদিকে এগিয়ে দেওয়ার কাজ করবেন অ্যাডলাইফের শিক্ষক-শিক্ষিকারা। এই কোর্স করা যুবক যুবতীদের উজ্জ্বল ভবিষ্যত উপহার দিয়ে তাদের মুখে হাসি ফোটাতে অ্যাডলাইফ বদ্ধপরিকর বলেই জানালেন মিনু। ‘আই ক্যান ফ্লাই’-এ তালিম নেওয়া এঁদের শুধু আর্থিক দিক থেকেই স্বনির্ভর করে তুলবে না, সেইসঙ্গে তাদের এই প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে স্বাধীনভাবে বাঁচার শক্তি যোগাবে।

আই ক্যান ফ্লাইয়ের কোর্স তৈরি করছেন বিশেষজ্ঞরা। যুবক যুবতীদের দক্ষতাকে সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত তুলে নিয়ে যেতে চেষ্টার ত্রুটি থাকছে না বলেই দাবি করেছেন মিনু বুধিয়া। মানসিক দিক থেকে অক্ষমতার শিকারদের যাঁরা দেখভাল করেন তাঁদের ঠিক কী করা উচিত তারও পাঠ দিচ্ছে অ্যাডলাইফ।

অ্যাডলাইফকে আরও উন্নত করতে মিনু বুধিয়া পাশে পেয়েছেন তাঁর বড় মেয়েকে। এমনকি প্রাচীকেও বেশ কিছু স্পর্শকাতর বিষয়ে পাশে পাচ্ছেন তিনি। মিনু খুশি। তাঁর মতে, ঈশ্বর যাই করেন তার একটা উদ্দেশ্য থাকে। প্রাচীই তাঁকে নিজের মত করে সমাজকে সাহায্য করার উৎসাহ যুগিয়েছে। সব কিছুর জন্য ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন মিনু বুধিয়া।