পারসি ফ্যাশন চর্চায় ধ্রুবতারা দিল্লির আশদিন

2

গারা। দেখেছেন শাড়িটা! নকশাকাটা গাঢ় রঙের ঝকমকে শাড়ি। বড় বড় মোটিফ, ফুল, প্রজাপতি। অ্যামব্রয়েডারি করা পাড়ে কারুকার্য। সব মিলিয়ে জবড়জং জমকালো দুর্দান্ত এফেক্ট। ধনী পারসি পরিবারের মহিলাদের পরনে সচরাচর দেখে থাকবেন। বারোশ বছর আগে গালিচা, এসেন্স, তাদের সঙ্গীত আর এই পোশাক সঙ্গে করে নিয়ে ভারতে এসেছিলেন পারসিরা। তারপর ভারতের সংস্কৃতির সঙ্গে মিলে মিশে গিয়েছে এর ডিজাইন। কিন্তু পোশাকের এই প্রাচীন সংস্কৃতি এখনও আগলে রেখেছেন একজন আধুনিক ফ্যাশন ডিজাইনার। আশদিন লিলাওয়ালা। মাধুরী দীক্ষিত থেকে হেমা মালিনি হালের সোনম কাপুরের মতো বলিউড তারকারা আশদিনের ফেব্রিকের ফ্যান। পারসিদের এই পোশাক সংস্কৃতিতে আধুনিকতার ছোঁয়া দিয়েছেন এই যুবক। দিল্লির ডিজাইনার, লেখক আশদিন সেদিন এসেছিলেন সংস্কৃতির পীঠস্থান কলকাতায়।

আশদিন নিজে পারসি। ঠাকুমার দেরাজে রাখা হাতে বোনা পারসি গারা অ্যামব্রয়েডারি করা শাড়ি তরুণ ডিজাইনারের মনে প্রথম দাগ কাটে। মায়ের কালো গারায় হলুদ আর গোলাপি গোলাপের সুরম্য বাগানে হারিয়ে যেতেন শৈশবে। এই নান্দনিক স্বপ্নমাখা জগতেই আশদিন খুঁজে পেয়েছেন তাঁর নিজের ঠিকানা। দাদাকে ফ্যাশন ডিজাইনিং পড়তে দেখে নিজেও উৎসাহ পান। বুঝে যান ডিজাইনিং নিয়েই এগোবেন। ক্যারিয়ার ঠিক করতে বাবা-মায়ের সাহায্যও পেয়েছেন অনেকটা। আহমেদাবাদের ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব ডিজাইন থেকে টেক্সটাইল ডিজাইনিংয়ে গ্র্যাজুয়েট হন। ২০১২য় তৈরি হয়েছে তাঁর নিজের নামের ব্র্যান্ড ‘আশদিন’। তার ডিজাইনে ঐতিহ্যের গারা পেয়েছে আধুনিকতার ছোঁয়া। রং, ফেব্রিক, মোটিফ বসানোর জায়গা আধুনিক পছন্দ অনুযায়ী পাল্টে দিয়েছেন এই বৈপ্লবিক ডিজাইনার। আর তাতে ফ্যাশনের পারস্পেক্টিভটাই বদলে গিয়েছে। অ্যামব্রয়েডারির আকার, মোটিফের জায়গার পরিবর্তন শিল্পের দাবি মেনেই করেছেন আশদিন। বলছিলেন, কোনও অবাস্তব কিছু নয়, একদম প্রকৃতির ছাপ প্রতিটি শাড়ির জমিনে। শুধু শাড়ি নয় অ্যামব্রয়েডারি করা ককটেল ড্রেস, গাউনও রয়েছে আশদিনের কালেকশনে। আইডিয়া ছিল, বহু বছর আগের সমৃদ্ধ ডিজাইনকে আধুনিকতায় রূপ দেওয়ার। ঐতিহ্যবাহী নানা শাড়িও আশদিনের কালেকশনে রয়েছে। অ্যামব্রয়েডারির সূক্ষ্ম কাজের মধ্যে দিয়ে ফুল, পাখির ডিজাইন অবাক করার মতো।

পারসি বণিকরা চিনে আফিম নিয়ে যেতেন বেচতে। ব্যবসা করতে গিয়ে চিনের অদ্ভুত সুন্দর এক ধরনের অ্যামব্রয়েডারি বণিকদের ভালো লেগে যায়। তাঁরাই ধীরে ধীরে এমন শিল্পকর্মকে ভারতে নিয়ে আসতে থাকেন। চিনা পোশাকে পাখি, প্রজাপতির মোটিফের ব্যবহার ছিল। সেটাই গারায় নিয়ে এসেছেন পারসিরা। শুধু এই শিল্পকর্মকে আত্মস্থ করতে একযুগ ধরে ইরান আর চিনে পড়ে ছিলেন আশদিন, ইতিহাস খুঁজে বেড়িয়েছেন। বোঝেন পারসি গারা আসলে ফিউশন। পারসি, ভারতীয়, ইউরোপীয় এবং চিনা শিল্পকর্মের মিক্সড-ব্যাগ। ফিউশনের সেই অ্যামব্রয়েডারিকে নিজস্বতা দিয়ে নতুন রূপে পেশ করেছেন। নানা ধরনের নানা রঙের প্রজাপতির মোটিফ নিজের কাজেও ব্যবহার করেছেন আশদিন। আসলে শাড়ির জমিতে মোটিফের গাঁথনে গল্প বোনেন তরুণ এই ডিজাইনার। এরই মধ্যে ‘থ্রেড অব কন্টিনিউটি’ নামে একটি বই লিখে ফেলেছেন। ইউরোপ, আমেরিকাতেও ‘আশদিন’ এর বাজার আছে। একসময় কলকাতাতেও যে পারসিদের থাকার একটা পুরনো ইতিহাস ছিল সে বিষয়ে জেনে তাজ্জব বনে গেলেন শিঁকড়ের সন্ধান করে বেড়ানো এই তরুণ। শহরের একমাত্র পারসি রেস্তোরাঁ মাঞ্চারজি যে সাধারণ রোল সেন্টারে বদলে গেছে শুনে দুঃখই পেলেন ইতিহাস সন্ধানি ছেলেটা।