অজস্র কাঁটা সরিয়ে কুসুমের ফুটে ওঠা

0

ওর নাম কুসুম। অথচ, ওর জীবনের চলার পথে শুধুই বিছানো ছিল কাঁটা‌। পরপর দুর্ভোগ। প্রতিবারই নতুন করে হার্ডেল টপকে এগোনোর লড়াই করেছে মেয়েটা। হার না-মানা জেদ তাঁকে এগিয়ে নিয়ে গেছে সাফল্য়ের দরজায়। হাতের কাজই হাতিয়ার। কুসুম দাসের হস্তশিল্পে মোহিত পূর্ব মেদিনীপুরের এগরা, বাসুদেবপুর। এখন অনেক মহিলার জীবনেই কুসুমের সাফল্যের সুগন্ধ পাওয়া যায়।

চাষবাস করে কোনওমতে সংসার চলে। আর্থিক কারণে জীবনের প্রথম বড় পরীক্ষা আর দেওয়া হয়নি কুসুম দাসের। মাধ্যমিকের স্বপ্ন বুকে চেপে চলে যেতে হয়েছিল শ্বশুরবাড়িতে। বিয়ের কয়েক বছর পর এবার মস্ত বড় ধাক্কা। আচমকাই ‌কুসুমদেবীর স্বামী মারা যান। একরত্তি দুই মেয়েকে নিয়ে তখন অথৈ জলে পড়ার অবস্থা। তখন থেকেই নিজেকে লড়াইয়ের জন্য তৈরি করে ফেলেন। স্থির করেন, হস্তশিল্পে নিজেকে উজাড় করে দেবেন। প্রথমে টেডি বিয়ার দিয়ে শুরু, তারপর ঝিনুক, মোমবাতি আরও কত কী।

মেয়েদের বাপেরবাড়িতে এনে রোজগারের পথ খুঁজতে থাকেন কুসুমদেবী। শুভানুধ্যায়ীদের মাধ্যমে পূর্ব মেদিনীপুরের সাতমাইলে কাকলী দাসের সঙ্গে যোগাযোগ হয় তাঁর। টেডি বিয়ার ও নানারকম পুতুল তৈরির কাজ দ্রুত শিখে নেন। কাজ করতে করতে বুঝে যান শুধু পুতুল তৈরি করে এগরায় পড়তে থাকলে হবে না ভাল রোজগার করতে হলে বাইরে যেতে হবে। প্রথমে এগরা বাজারের বিভিন্ন দোকান দিয়ে শুরু হয় তারপর ধীরে ধীরে হলদিয়া, কাঁথি স‌হ পূর্ব মেদিনীপুরের বিভিন্ন জায়গায় মেলা, প্রদর্শনীতে তাঁর সামগ্রী তুলে ধরেন কুসুম দাস।

জীবনে অনেকটা যখন ঘুরে দাঁড়িয়েছেন তখন ফের চ্যালেঞ্জ হয়ে এল অর্থ। ব্যবসা শুরু করতে গেলে যে পুঁজি লাগবে তা কুসুমদে বীর ছিল না। প্রথমে এক প্রতিবেশীর থেকে সাড়ে সাত হাজার টাকা ধার নেন। তাড়াতাড়ি সেই টাকা মিটিয়ে দেওয়ায় আত্মবিশ্বাস এক লহমায় তাঁর অনেকটাই বেড়ে যায়। যোগাযোগ করেন বিডিও অফিসে। সেখান থেকে স্থানীয় এক স্বনির্ভর গোষ্ঠীর থেকে ২৫ হাজার টাকা ঋণ নেন তিনি। গত বছর থেকে নিজেই শুরু করেন ব্যবসা। বিভিন্ন মেলা, প্রদর্শনীতে গিয়ে তিনি বুঝতে পারেন শুধু একটি সামগ্রী রাখলে ক্রেতার মন পাওয়া ভার। তাই মোম দিয়ে নানারকম শো পিস বানানো শুরু হয়। পাশাপাশি ঝিনুক দিয়ে বিভিন্ন অলঙ্কার তৈরি করেন কুসুমদেবী। আর এই রোজগার থেকেই দুই মেয়েকে উচ্চশিক্ষার পথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন তিনি। মেয়েদের মধ্যে শুধু শিক্ষার আলো জ্বালিয়ে খান্ত হওয়া নয়, নিজেও এর মধ্যে প্রাইভেটে মাধ্যমিক পাশ করেছেন। জীবনের এই যুদ্ধে পাশে পেয়েছেন বেশ কয়েকজন প্রতিবেশীকে। কুসুমদেবীর কথায়, ‘‘ওরা আমায় সবসময় ভরসা জুগিয়েছে। কঠিন সময়ে ওদের সাহচর্য কখনও ভুলব না।’’ প্রতিবেশীরাও মুগ্ধ তাঁর লড়াইয়ে। এলাকার বাসিন্দা অশোক জানা বলেন, ‘‘কুসুম আমাদের কাছে প্রেরণা। ওকে পেয়ে আমরা অনেকটাই সমৃদ্ধ হয়েছি।’’

কুসুমের উত্তরণের কথা পৌঁছেছে প্রশাসনের কানে। হস্তশিল্প নিয়ে কোথাও কিছু হলে স্থানীয় প্রশাসন তাঁকে খবর দেয়। তাঁর হাতযশ দেখ এলাকার মেয়েরাও এখন টেডি বিয়ার শিখতে চাইছে। নিজের কাজ সামলে কখনও তাজপুর, কখনও পিছাবনিতে ট্রেনিং দিতে যান কুসুম দাস। তাঁর দৌলতে এখন অনেকেই পুতুল বানিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে শিখেছে। কুসুমদেবী বলেন, অনেক বাধা পেয়েছি, কিন্তু মানসিকভাবে কখনও ভেঙে পড়িনি। আরও এগোত চাই।’’ সেই স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করতে জানুয়ারির শেষে জম্মু-কাশ্মীরের শ্রীনগরে যাচ্ছেন তিনি। উপত্যকায় দেখাতে চান বাংলার হস্তশিল্পের মহিমা।