নেপালে অনাথ শিশুদের মা ম্যাগি ‘ডোয়নি’

বয়স তখন ১৭। কৈশোরেই সুন্দর পৃথিবী গঠনের স্বপ্ন দেখেছিলেন। সেই স্বপ্নকে রূপ দিতে নীরবে কাজ করে চলেছেন। এর মধ্যে পেরিয়েছে আরও ১০ বছর। এগিয়েছেন অনেকটা পথ। সেই বদলের ছাপ পড়েছে নেপালের শিশুদের মধ্যে।

0

আলাপ করুন। ইনি ম্যাগি ডোয়নি। ২৭ বছরের এই প্রাণবন্ত নারী নেপালে কোপিলা ভ্যালি চিল্ড্রেনস হোম এবং ব্লিঙ্কনাও ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করে অনাথ পথশিশুদের মধ্যে আশার আলো জাগিয়েছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে স্কুলের গণ্ডী পেরিয়ে আর বিশ্ববিদ্যালয়ে যাননি ম্যাগি। ম্যাগি বলেছেন, “ আমি শ্রেণিকক্ষের বাইরের জগত থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে চেয়েছিলাম, সেই জন্য নেপালের উদ্বাস্তুদের সাহায্যার্থে ভারতের একটি সংস্থার সঙ্গে কাজ করেছিলাম।” এই অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনকে বদলে দেয়। এই সময় একটি নেপালি মেয়ের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল যে ৬ বছর আগে পালিয়ে এসেছিল, আর কখন‌ও ফিরে যায়নি। ম্যাগি সিদ্ধান্ত নেয় তাঁর সঙ্গেই নেপাল ঘুরতে যাবে।“২০০৬ সালে আমি প্রথম নেপাল যাই, ঘুরতে ঘুরতে আমি বুঝতে পারি এখানে উন্নয়নের খুব দরকার, না হলে বাচ্চারা পিছিয়ে পড়বে। সামরিক যুদ্ধের পর সেখানে প্রায় ১ কোটি শিশু অনাথ হয়ে যায়, আমি তাদের জন্য কিছু করতে, নিউ জার্সিতে আমার পিতামাতার কাছে আমার জমানো অর্থ চেয়ে পাঠিয়েছিলাম।ওই ৫০০০ ডলার নিয়ে নেপালে আমি একটা ছোট্ট জায়গা কিনে স্কুল করেছিলাম অনাথ বাচ্চাদের জন্য।”

আট বছর পর ম্যাগির স্কুলে ২৩০ জন বাচ্চা ও ১৪ জন শিক্ষক রয়েছেন। আজ তিনি বিশ্বের দরবারে স্বীকৃতি পেয়েছেন, বয়স তাঁর কাছে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। ম্যাগির কথায় “১৮ বছর বয়স থেকে আমি এই কাজ করছি, আমি কখনও ভয় পাইনি। আমি জানতাম সব সমাস্যার সমাধান করতে পারা যায় না, তাই আমি সাহায্য চাইতে কুণ্ঠা বোধ করিনি। ভাগ্যক্রমে আমি সবাইকে পাশে পেয়েছি।” ম্যাগি বাচ্চাদের খুবই ভালোবাসেন।শিশুদের কাছে তিনিই একমাত্র অভিভাবক। অল্প বয়েসেই যেন তাদের মা হয়ে উঠেছেন।

ম্যাগি জানালেন, “কিছু বাচ্চা খুব ছোট বয়সে স্কুলে এসেছিল, ফেলে আসা জীবনের কথা তাদের কিচ্ছু মনে নেই, তাই অনেক বাচ্চা তাঁকে মা বলেই ডাকে।” মজার বাপ্যার হল ম্যাগির পিতামাতাকে ওই কচিকাঁচারা দাদু, দিদা বলে। ম্যাগির ধারনা নেপালকে পরিবর্তন করতে মডেল স্কুল বেশ উপযোগী। ম্যাগির কথায়, “আমি মনে করি নেপালকে উন্নত করতে শিক্ষাই উপযুক্ত হাতিয়ার, আমি বাচ্চাদের জন্য বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে চাই, যেখানে তারা পরিবারের অভাব বোধ করবে না।” ম্যাগির এই স্বার্থহীন ভালোবাসা দুনিয়ার কাছে নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত। “আমি এখানে নেপালি ভাষা না জেনে কাজ করতে এসেছিলাম, কিন্তু এখন আমি এদের ভাষা রপ্ত করেছি আর আমার সব বাচ্চারা ইংরাজিতে কথা বলতে পারে। অনাথ শিশুদের শিক্ষাদানের ব্যাপারটা সহজ নয়, কারণ তারা কখনো কারও কাছে ভালোবাসা পায়নি, তা সত্বেও তারা খুব সুন্দরভাবে বড় হচ্ছে। এটা দেখে আমি গর্বিত।”- ম্যাগি জানালেন।

পরিবারের থেকে দূরে থাকার কারনণ তাঁকে ব্যাক্তিগত ভাবে কিছু সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে। “প্রথমে যখন মা-বাবা আমার পড়াশোনা ছাড়ার সিদ্ধান্ত সম্পর্কে জানতে পারলেন, তাঁরা একদমই খুশি ছিলেন না, কিন্তু কিছুদিন পর তাঁরা আমাকে দেখতে এসে বাচ্চাদেরকে দেখে খুব খুশি হয়েছিলেন এবং তাঁরা বেশ গর্ব বোধ করেন। গত আট বছরে যা যা ঘটেছে তাঁর জন্য আমি খুব উপকৃত। সবসময় যেটা করি তা হল, চলার পথে কোনও বাধা এলে তাকে সরিয়ে এগিয়ে চলি”। দারিদ্রমুক্ত হতে গেলে, সমাধানের পথে বিশ্বাস থাকতে হবে। নেপালে ব্লিঙ্কনাউ ফাউন্ডেশন গুণগতভাবে দারুন কাজ করছে , তবে এখনই অন্য জায়গায় স্কুল খোলার কোনও পরিকল্পনাই নেই তাদের। “আমি আমার নিজস্ব সম্প্রদায়ের মধ্যে কাজ করতে চাই, ওখানে অনেক কিছু করার আছে। আমি আমার কাজের মধ্যেই আমার ছাপ রেখে যেতে চাই।” পরিবর্তনের জন্য আমি সবাইকে উদ্বুদ্ধ করতে চাই। বাচ্চাদের জন্য আমি আমেরিকার থেকে সাহায্য পাই। কখনও কখনও আমি আমার কাজের জন্য বেশ খুশী ও উচ্ছ্বসিত বোধ করি। যেখানে ও যাদের কাছে বড় হয়েছি, সব ছেড়ে আসাটা সহজ ছিল না কিন্তু এখন আমি বুঝি নেপালে না এলে, বাচ্চাদের জন্য কিছু না করলে জীবনটাই বৃথা হয়ে যেত। ওদেরকে চোখের সামনে বড় হতে দেখছি এটাই বড় পাওয়া।

যুবক-যুবতীদের উদ্দ্যেশে ম্যাগী কিছু পরামর্শ দিয়েছেন, “ কিছু পরিবর্তনের জন্য বয়সকাল অবধি ও টাকা-পয়সার জন্য অপেক্ষা করার দরকার নেই, করতে হলে এখনই কর। আমি যদি এখনও সঠিক সময়ের জন্য অপেক্ষা করতাম, তাহলে আমার বাচ্চারা নতুন জীবন না পেয়ে কোথাও হারিয়ে যেত।”