শিকড়ের সন্ধানে 'অগস্ত যাত্রা' সিদ্ধার্থর

6

৬০০ কিলোমিটার পায়ে হেঁটে রাজস্থানের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে যাওয়ার কথা শুনলে প্রথমে মনে হতেই পারে কোনো দুর্দান্ত ভ্রমণ কাহিনীর শুরু হচ্ছে বুঝি। কিন্তু সিদ্ধার্থ আগরওয়ালের এই যাত্রা আসলে নিজের শিকড়কে ছুঁতে চাওয়ার যাত্রা। সমাজ, দেশের সংস্কৃতি আর মানুষকে বুঝতে চান সিদ্ধার্থ। প্রজেক্টের নাম ওয়াকিং ব্যাক টু মাই রুটস্

সিদ্ধার্থ কলকাতার ছেলে, আইআইটি খড়গপুর থেকে এয়ারোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে সদ্য পড়াশোনা শেষ করেছেন। বাধা ধরা চেনা ছকের জীবন কোনোদিনই টানেনি সিদ্ধার্থকে। ঘুরে বেড়ানো ও ছবি তোলা, এই দুটোই ছিল বরাবরের ভাললাগা।

ছাত্রজীবনেই চষে ফেলেছেন ভারতের আনাচ কানাচ। সাইকেল নিয়ে পাড়ি দিয়েছেন কলকাতা থেকে মুম্বই, সেটা ছিল ম্যাডনেস প্রজেক্ট। আর এই পাগলামির মধ্যে দিয়ে ক্রমশ চিনতে শিখছিলেন নিজের চারপাশ, সমাজ, প্রকৃতি। সেই চেনাটাই জন্ম দিচ্ছিল এক নতুন ভাবনার। পরিস্থিতির বদল দরকার, ভাঙা দরকার এই অদ্ভুত স্থিতাবস্থা, প্রয়োজন একটা সচেতন প্রজন্ম যারা ফেসবুকের দেওয়ালে নয়, পরিবর্তনটা করবে বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়ে।

শিকড়হীন, ভোগ সর্বস্বতায় ডুবতে বসা প্রজন্ম, ক্রমাগত বেড়ে চলা বৈষম্যের এই ধূসর পৃথিবীকে একটু সুন্দর করে সাজিয়ে নেওয়ার স্বপ্ন দেখেন এই তরুণ। স্বপ্ন দেখেন একটি দায়িত্বশীল, সচেতন সমাজ গড়ে তোলার। আর সেই রোম্যান্টিক উদ্দেশ্যেই শুরু মিডিয়া হাউস বেদিতাম।

“কথা তো অনেক হয়েছে। ফেসবুকে, ট্যুইটারে ক্রমাগত কথা বলে চলেছি আমরা। কিন্তু তাতে কী বদলাচ্ছে? আমরা যারা সুবিধাভোগী তাঁদের গায়ে তো আঁচ লাগে না। তাই এটা নিয়ে আজ কথা বলি, তো কাল মেতে উঠি নতুন কিছু নিয়ে। আর একটা বড় অংশের মানুষ ভয়াবহ অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে প্রকৃতি। শেষ করে দেওয়া হচ্ছে বনাঞ্চল। কারও কোনও মাথা ব্যথা নেই। জানেই না কেউ। জানতে দেওয়াও হয় না। এই পরিস্থিতিই বদলানো দরকার। আমি চাই প্রত্যেকে নিজে দেখুক, জানুক তার চারপাশটাকে। সেই অভিজ্ঞতাই জন্ম দেবে নতুন মানুষের”, বললেন সিদ্ধার্থ।

বেদিতামের উদ্দেশ্য সমাজে প্রভাব তৈরি করা। মানুষকে সচেতন করা। সামাজিক সমস্যা, পরিবেশ ও সংস্কৃতি এই তিনটি ক্ষেত্রকে কাজের জায়গা হিসেবে বেছে নিয়েছেন সিদ্ধার্থ। তবে সেখানেও বাধা গতের ভাবনায় আটকে পড়তে নারাজ সিদ্ধার্থ শুরু করেছেন অভিনব কিছু প্রকল্প, তারই একটি ওয়াকিং ব্যাক টু মাই রুটস।

প্রকল্পের শুরু গত বছর ডিসেম্বরে, পরিকল্পনা ছিল দিল্লি থেকে আজমেঢ় পৌঁছনো, দূরত্ব মোট ৬০০ কিলোমিটার, কিন্তু পায়ের চোটের কারণে শিকড় থেকেই ফিরে আসতে হয় সিদ্ধার্থকে, ১২ দিনে হেঁটেছিলেন প্রায় ৪০০ কিলোমিটার। কিন্তু হাল ছেড়ে দেওয়া সিদ্ধার্থের অভিধানে নেই, তাই এবছর সেই যাত্রাই শেষ করতে যাচ্ছেন সিদ্ধার্থ। যাকে বন্ধুরা চেনে অ্যাসিড বলে। 

আগেরবার যেখানে শেষ করেছিলেন এবার শুরু করবেন তার কিছুটা আগে থেকেই, হাঁটবেন ফতেপুর থেকে জয়পুর হয়ে আজমেঢ় পর্যন্ত প্রায় ৩২০ কিলোমিটার। পথে থাকবে স্থানীয় মানুষদের সঙ্গে কথা বলা, সমস্যার ক্ষেত্রগুলিকে জানা, স্থানীয়ভাবে যারা কাজ করছেন তাঁদের সঙ্গে আলোচনা আর এই প্রাচীন সমৃ্দ্ধ সংস্কৃতির সাথে পরিচিত হওয়া। সামাজিক সমস্যাগুলিকে তুলে ধরা ও সংস্কৃতির পুনরুজ্জীবন। প্রাথমিক লক্ষ্য বলতে এই দুটিই। নিজের এই উদ্যোগে আরও অনেককে সামিল করে নিতে চান সিদ্ধার্থ। বিশেষতঃ বিভিন্ন শিল্পীদের, যাঁরা নিজ নিজ শিল্পের মাধ্যমে বিষয়গুলিকে তুলে ধরতে পারবেন মানুষের কাছে। এর পাশাপাশিই এই প্রজেক্টের মাধ্যমে কৃষক, গ্রামীণ ব্যবসায়ী ও শহরের ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য বিনিয়োগ সংগ্রহ করবেন সিদ্ধার্থ, 'রঙ দে' নামের একটি সংস্থার মাধ্যমে তা পৌঁছে যাবে তাঁদের কাছে।

“শিল্প মানুষের কাছে পৌঁছনোর একটি শক্তিশালী মাধ্যম, সেটা ফটোগ্রাফি, ছবি আঁকা, গান বা লেখা যাই হোক না কেন, আমি তাই চাই বিভিন্ন শিল্পীরা আমার সঙ্গে এই প্রজেক্টে যোগ দিন, যাতে তাঁরা নিজের শিল্পের মাধ্যমে নিজেদের বোধ মানুষের কাছে তা পৌঁছে দিতে পারেন”, জানালেন সিদ্ধার্থ। আগামী বছরগুলিতে ভারতের প্রতিটি রাজ্যে এই প্রকল্পটি করার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর।

সম্পূর্ণ প্রকল্পটি পায়ে হেঁটে করার কারণ হিসেবে সিদ্ধার্থ জানালেন, “আমি চাই মানুষ বিষয়টি নিয়ে ভাবুক, বিষয়গুলি আলোচনায় আসুক, আর তার জন্যই আমি আমার শরীর, আমার শ্রমকে ব্যবহার করছি। মানুষকে বিষয়টি নিয়ে ভাবানোর জন্য, তাঁদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্যই এই ফর্মটিকে বেছে নিয়েছি আমি”।

বেদিতামের আরও একটি অভিনব প্রকল্প ট্রি-আর্ট প্রজেক্ট। বরাবরই সিদ্ধার্থের ফোটোগ্রাফির অন্যতম মূল বিষয় থেকেছে গাছ। সিদ্ধার্থ মনে করেন প্রতিটি গাছই একেকটি শিল্প, প্রত্যেকটি গাছেরই কিছু গল্প বলার আছে। সিদ্ধার্থ বললেন, “আমাদের শহরেই কত গাছ আছে কিন্তু বিজ্ঞাপন, হোর্ডিং আর হাইরাইসের মাঝে আমরা লক্ষ্যই করি না, অথচ কি অদ্ভুত সুন্দর একেকটি গাছ, আমি চাই সবাই দেখুক, লক্ষ্য করুক প্রকৃতির এই সৌন্দর্য, আমি ইন্স্টাগ্রাম, ফেসবুক ইত্যাদি সোশ্যাল মিডিয়ায় আমার তোলা ছবিগুলি দিয়ে খুব ভাল সাড়া পেয়েছি, অন্যরাও এই ধরণের ছবি তুলে আমাকে পাঠিয়েছে, তাঁরাও গাছকে লক্ষ্য করতে শুরু করেছে। এখান থেকেই শুরু হয় ভালবাসা। মানুষের মধ্যে পরিবেশ সংরক্ষণ, বনাঞ্চল রক্ষা নিয়ে সচেতনতা তৈরি হওয়া খুব দরকার আর তার জন্য প্রয়োজন ভালবাসা”।

ট্রি-আর্ট প্রজেক্টে বিভিন্ন মাধ্যমের শিল্পী, পরিবেশবিদ ও ভলান্টিয়ারদের সঙ্গে কাজ করার ইচ্ছে রয়েছে সিদ্ধার্থর। পরিকল্পনা রয়েছে ভারতের প্রতিটি জাতীয় উদ্যানে তাঁদের সঙ্গে গিয়ে অভিজ্ঞতা সংগ্রহের। সেখান থেকে ফিরে এসে শহরে নানা প্রদর্শনীতে শিল্পের মাধ্যমে তাঁদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরবেন তাঁরা। চিত্রশিল্পীদের সঙ্গে এ বিষয়ে কাজও শুরু করেছে বেদিতাম। আর এই প্রজেক্টিতে প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহের জন্য সিদ্ধার্থ তৈরি করছেন বিভিন্ন প্রোডাক্ট। খুব স্বাভাবিকভাবেই তাতেও থাকছে গাছ ও প্রকৃতি। তৈরি করেছেন টোট ব্যাগ, ভবিষ্যতে স্কার্ফ, স্টোল, টি-শার্ট, কুর্তি, কুশন কভার, বেড স্প্রেড এরকম নানান জিনিস তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। এতে একদিকে যেমন প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় টাকা পাওয়া যাবে অন্যদিকে মানুষের গাছকে দেখার চোখও তৈরি হবে, গাছের নিজস্ব সৌন্দর্য লক্ষ্য করতে শুরু করবেন তাঁরা, পরিবেশ সংরক্ষণ, বা সামাজিক সমস্যা, এই ইস্যুগুলিকে আমি এতোটাই মূলস্রোতে নিয়ে আসতে চাই যাতে মানুষ এগুলিকে এড়িয়ে যেতে না পারে”, বললেন সিদ্ধার্থ। গঙ্গা-দূষণের বিষয় সচেতনতা গড়ে তুলতে আগামী বছর গঙ্গার তীর ধরে হেঁটে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর।

তাঁর এই সংস্থা শিল্পীদের কর্মসংস্থানেও ভূমিকা রাখতে পারবে ভবিষ্যতে, এমনটাই বিশ্বাস সিদ্ধার্থর। শুধুমাত্র টাকা রোজগারের জন্য শিল্পীদের নানা রকমের কাজ করতে হয়, সেই সব কাজে তাঁদের প্রতিভার ছাপ রাখার সুযোগ প্রায় থাকেই না। কিন্তু শিল্পীদের সমাজের জন্য অনেক কিছু করার আছে, বেদিতাম তাঁদের সেই সুযোগ করে দিতে পারবে”, বললেন তিনি।

বেদিতামকে অলাভজনক সংস্থা হিসেবেই ভাবছেন সিদ্ধার্থ, বিনিয়োগ এখনও সংগ্রহ হয়নি, তবে তা নিয়ে ভাবিত নন মধ্য কুড়ির এই যুবক। আপাতত আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছনো ও আরও বেশি মানুষকে এই ভাবনার সঙ্গে সম্পৃক্ত করে নেওয়াই তাঁর লক্ষ্য। কাজ করলে টাকা ঠিকই যোগার হয়ে যাবে বললেন আত্মবিশ্বাসী সিদ্ধার্থ।

আগামী দিনে আরও নানা প্রকল্পের ভাবনা রয়েছে সিদ্ধার্থের, রয়েছে সেগুলি নিয়ে এগোনোর সুসংহত পরিকল্পনা, অবস্থা পরিবর্তনের স্বপ্ন, ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতা ও নিজের কাজের প্রতি প্যাশন। বছর ২৫ এর এই উজ্জ্বল আত্মবিশ্বাসী যুবকের সঙ্গে কথা বলতে বলতে ঘুরে ফিরে একটা কথাই মনে আসছিল বারবার, “আমরা যদি এই আকালেও স্বপ্ন দেখি, কার তাতে কী”!