"বখাটে" শিশুদের নিয়েই গীতার সামাজিক উদ্যোগ

0

গীতা বলেন বাগান। ১৫ বাই ১১ ফুটের চিলতে ঘর। থুড়ি! বাগানে ফুল ফোটান গীতা রাউত। সাধারণ গড়ন, দৃপ্ত চিবুক আর একরাশ স্বপ্নভরা চোখ। স্বপ্ন দেখেন, স্বপ্ন বোনেন-একদিন রেললাইনের ধারের, রাস্তার ফুটপাথে, প্লাটফর্মে, অলি-গলি তস্য ঘুপচিতে ভেসে যাওয়ার চলতি স্রোতে বয়ে যাওয়া শৈশবকে নতুন জীবনের সন্ধান দেবেন।

স্বপ্ন তো দেখেন। রেস্তর জোর কোথায়। সাধারণ এক এনজিও কর্মী। ছোটবেলা থেকে মানুষের সেবাতেই মন। স্কুল যাওয়ার পথে যখন দেখতেন রেললাইনের ধারে অথবা অলিগলিতে তারই বয়েসি ছেলেমেয়েদের কেমন ছন্নছাড়া জীবন, বড্ড মন খারাপ হত। ইচ্ছে করত হাত ধরে স্কুলে নিয়ে যেতে। ইচ্ছে করত জানাতে, জীবন ধূসর নয়, সাত রঙের রামধনু। এইসব সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে স্কুলের পাঠ শেষ হওয়ার আগেই একটি এনজিরওর সঙ্গে জুড়ে যান। স্বপ্ন, কুঁড়ি ফোটাবেন। ঝড়তে দেবেন না অকালে।

পড়াশোনা শেষ করার পরও এনজিওতে কাজ করা ছাড়েননি। ১৫ বছর ধরে নানা এনজিও ঘুরেছেন। কাজ করে নানা অভিজ্ঞতা হয়েছে। পথে অবহেলায় বেড়ে ওঠা, ডেনড্রাইটের নেশায় বুঁদ, বখে যেতে যেতে ফিকে হয়ে যাওয়া একদল শৈশবে একরাশ খোলা হাওয়া এনে দেন ওদের দিদি-গীতা দিদি। কেউ ছিল না। শেখানোর। শাসন করার। রোগে-শোকে গায়ে মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দেওয়ার। এখন আছেন, গীতা দিদি। অন্ধকার সরিয়ে আলোর খোঁজে মেতে ওঠে একঝাঁক মুখ। বাচ্চাগুলির নতুন জীবনের স্বাদসন্ধান দেন গীতা। তাঁর এই প্রচেষ্টা দেখে এগিয়ে আসেন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন টিয়ার্সের প্রধান কিশোর জয়সওয়াল। গীতাকে ঘর দেন আঁকার স্কুল গড়তে। গীতার হাত ধরে আঁকা শিখতে শিখতে অতীত ভুলে ভবিষ্যতের রঙ মাখে ক্যানভাসে।

ভোরের আলো ফুটতেই চোখ মুছতে মুছতে প্রতিদিন টিয়ার্সের দরজায় হাজির ফুটফুটে কচিকাচার দল। দাঁত মাজা, প্রার্থণা, প্রাতরাশ। তারপর শুরু পড়াশোনা। একটু পরে ড্রইং, নানারকম বুদ্ধি বাড়ানোর খেলা। সারাদিন কাটিয়ে বাড়ি ফেরা। ‘ইতিমধ্যে ডেনট্রাইটের মতো নানা নেশায় যেসব বাচ্চারা অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে কাউন্সেলিং হয়। এটা একদিনে সম্ভব নয়। দিনের পর দিন একটু একটু করে বুঝিয়ে নেশা ছাড়ানো। বড় হয়ে নিজের পায়ে যাতে দাঁড়াতে পারে সেই দিকে নিয়ে যেতে চাই’, বলেন গীতা।

মূলত কিশোর জয়সওয়ালের টাকায় চলে এনজিও টিয়ার্স। ‘সারা জীবন ধরে স্বপ্ন দেখেছি মানুষের সেবা করব। গীতার মধ্যে সেই সম্ভাবনা খুঁজে পেয়েছিলাম। ওর হাতেই তাই এনজিও চালানোর দায়িত্ব তুলে দিই’, বলেন কিশোরবাবু। এমন মহৎ কাজে সাহায্যের হাত বাড়ান পড়শিরাও। চেয়েচিন্তেই এনজিও চালানোর খরচ জোগাড় হয়। বড় কোনও সাহায্য এলে সুরাহা যেমন হয়, বেপথু বাচ্চাগুলিকে পথে ফেরানোর সুযোগ আরও বাড়ে। গীতা চান, আরও হাজারো গীতা এগিয়ে আসুক। দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ুক এই ধরনের প্রয়াস। এগিয়ে আসুন আরও কিশোর জয়সওয়ালরা। আলোর পথের পথিক হোক অবহেলা আর অনাদরে বেড়ে ওঠা বাচ্চাগুলি।