চলতে চলতেই স্টার্টআপ চালাতে শিখেছেন অর্পণ

0

৯টা-৫টার অফিস, কর্পোরেট জীবনের আপাত নিরাপত্তা, সপ্তাহান্তের পার্টি, বছরে একবার বেড়াতে যাওয়া এভাবেই আর পাঁচজন গড়পরতা বাঙালি মধ্যবিত্তের মতো কেটে যেতে পারত অর্পণের জীবন। শুরুটা হয়েও ছিল সেরকমই। আইআইটি খড়গপুর থেকে পাস করে বার্কলে ক্যাপিটালে কোয়্যান্ট অ্যানালিস্ট হিসেবে চাকরি করতে ঢোকেন অর্পণ কুমার দে। চাকরিটা মনমতোই ছিল সংখ্যা প্রেমিক অর্পণের। তবে কর্পোরেট জীবনের একঘেয়েমি ক্রমেই কাজের আনন্দটা মটি করে দিচ্ছিল। এরকমই এক একঘেয়ে বিকেলে মুম্বইয়ের ১৪ তলার অফিসে কম্প্যুটারের সামনে বসে সিদ্ধান্তটা নিয়ে ফেললেন, নিজের দেশকে জানবেন, খুঁজতে বেরোবেন নিজেকে।

এরপরের মাসগুলি কখনও কেটেছে পাহাড়ের হিমাঙ্কের নীচের তাপমাত্রায়, কখনও সমুদ্রের পাড়ে বা কখনও জঙ্গলের ওয়াচটাওয়ারে। আর এর মাঝেই চিনে নিচ্ছিলেন দেশকে, দেশের মানুষকে। ভারত এক অদ্ভুত দেশ, এখানকার সাংস্কৃতিক বিভিন্নতা, তাদের সহাবস্থান, সহিষ্ণুতা এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। নানারকমের মানুষের সঙ্গে দেখা হয়েছে, কারও কাছে পেয়েছি উষ্ণ অভ্যর্থনা তো কেউ বেশ খারাপ ব্যবহারই করেছেন, বলছিলেন অর্পণ।

কর্পোরেট দুনিয়ায় আর ফিরবেন না সেটা ঠিকই ছিল, দেশের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে ঘুরতেই পরিকল্পনা করে ফেলেন নিজের শুরুয়াতি উদ্যোগের। বন্ধু রওনক নাজনিনের সঙ্গে শুরু করে দেন নিজের কোম্পানি Inkwix। রওনক পেশায় ইঞ্জিনিয়ার। স্কুল, কোচিং সেন্টার, প্রি-স্কুল ও অন্যান্য শিক্ষাভিত্তির কোর্স সম্পর্কে সঠিক, নির্দিষ্ট ও বিস্তারিত তথ্য মেলে Inkwix.com এ। এছাড়াও স্কলারশিপ সার্চ ইঞ্জিন হিসেবেও কাজ করে Inkwix।

“আমাদের অভিজ্ঞতা বলে বিভিন্ন কলেজ বা কোর্স সম্পর্কে যথেষ্ট তথ্য অমিল ইন্টারেটে। আমরা দুজনেই অতীতে অ্যানালিটিকস নিয়ে কাজ করেছি। ডেটা অ্যানালিটিকসকেই শিক্ষাক্ষেত্রে নিয়ে আসতে চেয়েছিলাম আমরা। এর মাধ্যমে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির বিষয় ভাসা ভাসা মতামতের বদলে সুনির্দিষ্ট ও প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়া সম্ভব”, জানালেন অর্পণ।

ঘুরে বেড়ানোর মাঝেই কখনও গোকর্ণের বিচে কখনও বা ঋষিকেশের ক্যাফেতে বসে কাজ সেরেছেন অর্পণ। বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ, ডিজাইন চূড়ান্ত করা সবই করেছেন এর মধ্যেই। ২০১৫এর জানুয়ারিতে শুধুমাত্র একটি শহরের স্কুলগুলির তথ্য নিয়ে যাত্রা শুরু করে Inkwix। বর্তমানে বেঙ্গালুরু আর চেন্নাই এই দুই শহরের চারটি সেক্টরের তথ্য পাওয়া যায় Inkwix এ। তাদের কাছে পাওয়া যাবে প্রায় ৭০০ প্রতিষ্ঠান ও ১০০ স্কলারশিপের খোঁজ। রয়েছেন ১০০ জন নথিভুক্ত গ্রাহক। সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে ছাত্রছাত্রীদের সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে Inkwix।

তাঁর ঘুরে বেড়ানোর অভিজ্ঞতা উদ্যোগের যাত্রার পথে ভীষণভাবেই সহায়ক বলে মনে করেন অর্পণ। “বিভিন্ন ট্রেক থেকে আমি শিখেছি চলতে হবে, এমন কি আহত হওয়ার পরও চলতে হবে। আরও দেখেছি স্থানীয় ব্যবসায়ীরা কি ভাবে তাঁদের ব্যবসায়ীদের পরিষেবা দেন, এবং একজন সত্যিকারের যত্নশীল ব্যবসায়ী কি ভাবে ক্রেতাকে খুশি করেন। এখান থেকে আমি শিখেছি গ্রাহকের সঙ্গে কী ভাবে কথা বলা উচিত। আরও বুঝেছি যতক্ষণ না শুরু করছি আমি কখনই জানি না কত কম টাকা খরচ করে কত বেশি ঘোরা সম্ভব। স্টার্টআপও তাই, কত কম টাকায় কতটা করা সম্ভব সেটা ততক্ষণ বোঝা যায় না যতক্ষণ না কাজটা শুরু করছি, সবথেকে বড় কথা এই ভ্রমণ আমার উদ্ভাবনী শক্তি বাড়িয়েছে”, বললেন অর্পণ।

নিজের শহর কলকাতাতেই সংস্থার মূল অফিস করেছেন অর্পণরা, বললেন, আমরা কলকাতাতেই ফিরতে চেয়েছিলাম। অনেক অভিযোগ এই শহরকে ঘিরে, প্রায়ই শুনি কোনও ভবিষ্যত নেই আমাদের এই শহরের। আমরা কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর আগে চেষ্টা করতে দেখতে চেয়েছিলাম। আমরা যা ভেবেছিলাম তার থেকে অনেক বেশি সুযোগ এখানে রয়েছে। অবশ্যই এটা বেঙ্গালুরু নয়, কিন্তু স্টার্টআপদের জন্য অনেক সুযোগ রয়েছে এই শহরে”।

খুব তাড়াতাড়িই আরও দুটো নতুন ক্ষেত্র-পরীক্ষা ও কোর্স সংক্রান্ত তথ্য নিজেদের ওয়েবসাইটে আনতে চলেছে Inkwix। রোজকার জীবনে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য ডেটা অ্যানালিটিক্সের ব্যবহার আনতে চাইছে এই সংস্থা। এবিষয় গ্রাহকদের শিক্ষিত করাটাই সবথেকে কঠিন চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন অর্পণ।

এছাড়াও তাঁরা যে তথ্য সংকলিত করতে চাইছেন তার পরিমাণ বিশাল, এবং তাঁরা চান এটা যতদূর সম্ভব বিস্তারিত করতে, সেটাও একটা কঠিন কাজ বলেই মনে করেন অর্পণ। অর্পণ বললেন, “কোনও কোম্পানির সিইও যখন সিদ্ধান্ত নেন, তখন মতামত নয় তিনি তথ্যের ওপরই নির্ভর করেন, আমরা সাধারণ মানুষরা সেটা কবে শিখব”।