মেঘনার রক্তে বলিউড, মগজে হুইসলিং উডস্

0

মেঘনা ঘাই চলচ্চিত্র নির্মাতা সুভাষ ঘাইয়ের মেয়ে। এখানেই পরিচয় শেষ নয়। সবে শুরু। তিনি বিজ্ঞাপণ আর বিপণন দুনিয়ার সফল পেশাদার মানুষ। তাঁর বাবার পরদেশ, তাল, ইয়াদের মতো ছবির বিপণন সামলেছেন মেঘনা। মেঘনার রক্তে বলিউড। সুভাষ ঘাইয়ের স্বপ্ন ছিল একটা পেশাদার ফিল্ম স্কুল বানাবেন। মাথায় মেঘনার নামটাই খেলে গিয়েছিল। লন্ডন থেকে ডেকে পাঠালেন মেঘনাকে। আর আজ আমরা কথা বলব "হুইসলিং উডস্ ইনটারন্যাশনাল ফিল্ম স্কুল" এর প্রেসিডেন্ট মেঘনাকে নিয়ে।

মেঘনা জানতেন, তিনি সৃজনশীল নন। কিন্তু তাঁর বাবার এই ফিল্ম স্কুলের ভাবনাটা তাঁর দারুণ লেগেছিল। অভিনয় তাঁর কাপ অফ টি না-ই হতে পারে, কিন্তু ব্যবসাটা তো তিনি ভালোই বোঝেন। আর বাবার দৌলতে ফিল্মের প্যাশনটাও তাকে এই স্কুলের সঙ্গে সেঁটে দিয়েছিল। সংস্থাটাকে তিনি সন্তানের মতো ভালোবেসে ফেললেন।

ভিত্তি প্রস্তর

২০০১ সালে মেঘনা দেশে ফিরলেন এবং WWI ফিল্ম স্কুলের ভাবনাটাকে নিজের জীবনের অংশ করে নিলেন। পরের ৫ বছর WWI এর সদস্যদের নিয়ে বিভিন্ন গবেষণাকেন্দ্রে,কলেজে, বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং ফিল্ম স্কুলের সন্মেলনে অংশগ্রহন করলেন। শুধু পাঠ্যক্রমের উন্নতিই নয়, নিয়ম, প্রশাসনিক কাঠামোকেও আরও মজবুত করতে চাইলেন মেঘনা। কেমন হবে প্রতিষ্ঠান। স্থাপত্যের দিক থেকে দেখতেইবা কেমন হবে তাও স্থির করলেন মেঘনা। তিন বছরে এই বিদ্যালয় তৈরি হল। ক্যাম্পাসটি খুব বড়। আমেরিকার একটি ফিল্ম স্কুলের ডিন মেঘনাকে বলেছিলেন স্কুলের এলাকা বড় হওয়া দরকার। 

প্রতিষ্ঠান যত বড়ই হোক না কেন তার অভ্যন্তরীণ পরিকাঠামো মজবুত হওয়া চাই। এই প্রতিষ্ঠানের সাথে অনেক ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক দক্ষ বিশেষজ্ঞরা যুক্ত। প্রতিষ্ঠানের সিলেবাস তৈরি করেন শেখর কাপুর,মনমোহন শেট্টি ,আনন্দ মাহিন্দ্রা এবং শ্যাম বেনেগালের মত লোকেরা। সি বি এস সি বোর্ডের ১১ ও ১২ ক্লাসের ছাত্রদের জন্য বিভিন্ন ধরনের মিডিয়া স্টাডি সিলেবাসের অন্তভুক্ত করা হয়েছে। সব ছাত্র চলচ্চিত্র নির্মাতা হবে না ঠিকই তবুও প্রত্যেকের চলচ্চিত্র সম্পর্কে সঠিক ধারনা জন্মাবে।

সফলতার সিঁড়ি...

০ জন ছাত্র কে নিয়ে শুরু করে আজ ৪০০ জন ছাত্র এখানে পড়ছেন। স্নাতক হয়ে বলিউডে কাজ করছে এমন ছাত্রের সংখা হাজারেরও বেশি। ২০১৩ সালে এই স্কুলের লাভের পরিমাণ ছিল ১৮ লক্ষ ৮৬ হাজার টাকা। ২০১৩ সালের অগাষ্টে "হলিউড রিপোর্টার" পত্রিকা WWI কে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ১০ টি ফিল্ম স্কুলের মধ্যে জায়গা দিয়েছে। মেঘনার ছাত্ররা ফিল্ম দুনিয়ায় ধর্মা প্রোডাকসানস, ডিজনি, যশরাজ ফিল্মস, ফ্যানটম ফিল্মসের মতো কোম্পানিতে চাকরী পাচ্ছেন। তাঁদেরই ছাত্র মোহিত ছাব্রা তো রাতারাতি বিখ্যাত। তাঁর শর্ট ফিল্ম ''দ্য রবার ব্যান্ড বল''  ২০১৩-য় কান্ ফিল্ম ফেস্টিভেলে সিলভার ডলফিন পেয়েছে। একই বছর পেয়েছে ডুভিল গ্রীণ গোল্ডেন অ্যাওয়ার্ডও। এছাড়া ফ্র্যান্স এন্ড সিটি স্টোরিজ প্রোজেক্ট (২০১২) পুরস্কারও জিতেছে ফিল্মটি।

শুরুতে অনেক সমস্যা ছিল এখন বিন্দাস

এখন তো রমরমিয়ে চলছে WWI স্কুল। তবে প্রথম থেকেই পরিস্থিতি এরকম ছিলনা। আসল সমস্যা হল দক্ষ শিক্ষকের অভাব। মেঘনা আমাদের জানিয়েছেন বলিউডের পেশাদার নির্মাতা ও যোগ্য শিক্ষক একই ব্যক্তির মধ্যে পাওয়া কঠিন। পরিকাঠামো ও প্রযুক্তি আরও একটা বড় চ্যালেঞ্জ । ভাগ্যক্রমে সোনি তাঁদের সঙ্গে যুক্ত আছে। পৃথিবিতে সোনি মিডিয়ার ক্যাম্পাস আছে লন্ডনে, লস এঞ্জেলসে আর WWI তে।

মিডিয়া স্টাডি ও তার ভবিষ্যত নিয়ে বহু মা-বাবাই খুঁতখুঁতে। সৃজনশীলতা সম্পর্কে তাঁদের প্রজন্মকে বোঝানো কঠিন। এই স্কুল বর্তমানে B.Sc ও MBA ডিগ্রী দিচ্ছে। তামিলনাড়ুর ভারতিদশান বিশ্ববিদ্যালয় ও মনিপাল বিশ্ববিদ্যালয় এর সাথে যুক্ত হয়েছেন মেঘনারা।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

এই ফিল্ম স্কুলে ছাত্ররা শুধুমাত্র চলচ্চিত্র নির্মান ই নয়, বরং সাংবাদিকতা ,ফ্যাশন , অ্যানিমেশন এসবও শিখছেন। মেঘনারা আরও ডানা মেলতে চান। তাই পার্টনার বানিয়েছেন ডি.ওয়াই পাটিলকে। পুনেতে খুলবেন একটি শাখা। লন্ডনের ব্র্যাড ফোর্ড কলেজে একটি ক্যাম্পাস খুলেছেন ওঁরা। নাইজেরিয়ায় পৃথিবীর সবথেকে বড় সিনেমা তৈরির সেন্টার আছে তবে ওখানে কোনও থিয়েটার নেই। কোনও ফিল্ম স্কুলও নেই। তাই ট্রেন্ড মিডিয়ার সঙ্গে গাটছড়া বেঁধে WWI এখানে বানাচ্ছে আফ্রিকান ফিল্ম এন্ড টিভি অাকাদেমি। একটা বিরাট ফিল্ম সিটি তৈরি হবে এখানে। মেঘনা বলেছেন তাঁদের দর্শন হলো শিল্প,বাণিজ্য এবং প্রযুক্তির সমন্বয়। এখন এই স্কুলের ১৫-২০% ছাত্র অন্য দেশের।

বাবা ফ্যাক্টর

সুভাষ ঘাইয়ের মেয়ে হিসেবে মেঘনা সুবিধা ও অসুবিধা দুইয়েরই সম্মুখীন হয়েছেন। বলিউডে তাঁর বাবার নাম তাঁকে ফিল্ম দুনিয়ায় প্রথম দিকের বাধা টপকাতে সাহায্য করেছে। তেমনি অসুবিধার দিক হলো এই স্কুলের সব বিষয়েই মানুষ সুভাষ ঘাইয়ের ছোঁয়া পেতে চান। নিজস্ব সৃজনশীলতা ও শৈলী দিয়ে মেঘনা ইতিমধ্যেই হিন্দি ফিল্ম ইনডাস্ট্রির অনেক তথাকথিত নিয়ম ভেঙ্গে দিয়েছেন।

এখন তাঁর আর কোনও বস নেই

আমরা তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম আবার কখনও গতানুগতিক চাকুরি জীবনে ফিরে যাবেন কিনা? মেঘনা জোরে হেসে উত্তর দিলেন, তিনি জানেন না তিনি কি করবেন, কারণ সব চাকরিতেই একজন বস্ থাকেন আর গত কয়েক বছর ধরে তিনি কাউকেই তাঁর কাজের রিপোর্ট করেননি।

মেঘনার মতে মহিলাদের কাজের উপযোগী জায়গা হল ভারত। এখানে অনেক সহযোগিতা পাওয়া যায়। প্রতিটি মেয়ের কাজ করা উচিত। যেকোনও কাজই ভাল যদি সেটা মন দিয়ে করা যায় । মা হয়ে ঘরের কাজ করেও মহিলারা সাবলীল ভাবে বাইরের জগতে সিম্পলি দুর্দান্ত কিছু করতে পারে সেটা স্বয়ং মেঘনা ঘাই দেখিয়ে দিয়েছেন।