তপনের ছবিতে কোলাজ ফর্ম আর জীবন কনটেন্ট 

0

ছোট ছোট চিত্রপট। রং-তুলির টানা-পোড়েন । ইচ্ছে মতো, অনেকটা শিশুরই মতো, কাগজ ছেঁড়া। জড়ো করা ছেঁড়া কাগজ থেকে একটি দুটি তুলে নেওয়া । আঠা লাগিয়ে তারপর সেঁটে দেওয়া নিজের ভাবনার চিত্রপটে। একটির সঙ্গে ছন্দ মিলিয়ে আর একটি। এভাবেই গড়ে উঠছে একের পর এক ছবি। ফুটে উঠছে ছন্দ। নীরব সুর। এইভাবে জীবনের ও শিল্পের নানা নির্যাস সংহত হয়ে গড়ে ওঠে তাঁর ছবি। তিনি পৌঁছতে চান চিত্রচেতনার একেবারে উৎসমূলে। অবয়বকে ভেঙে ভেঙে রূপান্তরিত করেন নিরবয়বে। অবয়বের যেমন একটা রূপ আছে, তেমনি রূপ আছে নিরবয়বেরও। অবয়ব যেখানে নেই, প্রকৃতির পরিচিত কোনও রূপ যেখানে শনাক্ত করা যায় না, সেটাই নিরবয়ব। এই বিমূর্তের ভিতর দিয়েও জীবনের কথা বলেন তপন। আক্ষরিক অর্থেই জীবন থেকে অভিজ্ঞতার মিশেলে হুগলির তপন সাহা তৈরি করেন জীবনের রঙিন কোলাজ। অ্যাকাডেমিক আঙিনার বাইরে তপনবাবুর ব্রেনচাইল্ডরা খোঁজ দেয় অন্য এক দুনিয়ার৷

এই কোলাজগুলিতে সেরকম বাস্তবের প্রত্যক্ষ অনুষঙ্গ হয়তো কিছু নেই। কিন্তু আছে অন্য এক নির্মাণের খেলা। ছেঁড়া কাগজের একটি রূপ-কে অন্য একটি রূপের পাশে বসিয়ে তাদের আকার ও বর্ণের মধ্যে একই সঙ্গে সাযুজ্য ও সংঘাত তৈরি করে দেওয়া, তারপর সেই টানাপড়েনকেই অন্য রূপের ভিতর অনুপ্রবেশ করিয়ে চিত্রীয় পরিসরকে পরিপূর্ণ এক ভারসাম্যে স্থিত করা, যে স্থিতি অদৃশ্য ছন্দে ও অশ্রুত এক সুরে আন্দোলিত হতে থাকে। হুগলির ব্যান্ডেল স্টেশন সংলগ্ন বাড়িতে যত্রতত্র কাগজের আঁকিবুকি, পাওয়া না পাওয়ার হাজারো হিসেব ফুটিয়ে তোলা হাজারো কাগজের টুকরোয়।

চল্লিশোর্দ্ধ অকৃতদার তপন সাহা পারিবারিক ব্যবসা করতে হবে বলে বাড়ি ছাড়েন সদ্য যৌবনে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গে। তারপর ঠিকানা শান্তিনিকেতন। সেই শুরু। তবে কিছুটা বেহিসেবী চালে। টেরাকোটা নিয়ে নানা কাজ। টানা আঠেরো বছর নিমগ্ন ছিলেন মাটির কাজে। তার মাঝেই কোলাজের আনাগোনা। ২০০৯ সাল থেকে বন্ধু অনুপম চক্রবর্তীর অনুপ্রেরণা কোলাজকে করে তুললেন ধ্যানজ্ঞান। ‘এক থেকে দেড় মাস লাগে এক একটি কোলাজ শেষ করতে। কাজই শেষ কথা। কোনও ফাঁকিবাজি চলবে না। কোলাজ নিয়ে নতুন প্রজন্ম গবেষণা করুক। পাশে আছি’, অঙ্গীকার তপনবাবুর।

যত্রতত্র ক্যানভাসে চলে রঙ-তুলি। জলরঙ, মাটি, কাগজ মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় ‘তপন’তুলির টানে। কল্পনা আর জীবন থেকে অভিজ্ঞতার মিশেলে হুগলির তপন সাহা তৈরি করেন জীবনের রঙিন কোলাজ। ভালোবাসা পেয়েছেন ভিনরাজ্যের মানুষের কাছে। হরিয়ানা, রাজস্থান সরকারের পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। পেয়েছেন রাজ্যস্তরের পুরস্কারও। ডাক পেয়েছেন বেঙ্গালুরুতে। দর্শকের উপচে পড়া ভিড় জানান দিয়েছে মানুষের ভালোবাসার কথা।

তপনবাবু বোঝেন ‘ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়’। পেটে গামছা বেঁধে অন্তত শিল্প হয় না। তাই হয়ত কোলাজেও ভেসে ওঠে ভগ্ন পৃথিবী অস্তমিত হওয়ার ছবি। তবুও আশায় বুক বাঁধেন কোলাজ শিল্পী। কাগজের টুকরোয় স্বপ্ন বোনেন। বলা ভালো কুড়িয়ে পাওয়া স্বপ্ন জুড়ে নতুন পৃথিবীর সন্ধান দিয়ে যান অবলীলায়।