তাজা মন নিয়ে সমস্যার সুলুক সন্ধান করেন কমিশনার বিবেক

0

গুড়গাঁওয়ে মিউনিসিপ্যাল কমিশনারের বিরাট অফিস‍। হঠাৎ-ই জনা পনের জাঠ হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পরল তার অফিস ঘরে। রাগে ফেটে পড়ছিল ওরা। নানান সমস্যা তার প্রতিকার চাই। ততক্ষণে পেল্লাই অফিসটা লোকের ভিড়ে হয়ে গেছে ছোট্ট খুপরি।

নেহরু জ্যাকেট পরা কমিশনার বসেছিলেন ডেস্কের অপর প্রান্তে। হাসি মুখে সবাইকে শান্ত করে দিতে তার দুমিনিটও লাগল না। ভদ্রলোকের নাম বিকাশ গুপ্তা।গুড়গাঁওয়ের মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের কমিশনার। বছর ৩৮ এর বিকাশের জন্য এই ধরনের পরিস্থিতি নতুন কিছু নয়। রোজই কিছু না কিছু হচ্ছে। গত বছর শহরের এই শীর্ষ পদ যখন পেয়েছেন তখন থেকেই বিকাশ গুপ্তা নিজের কাজ স্থির করে নিয়েছেন। গুড়গাঁও দ্রুত শহরে পরিনত হচ্ছে, আর অপরিমিত পরিকাঠামোয় নিজেদের খাপখাইয়ে নিতে প্রতিনিয়ত লড়াই করে চলেছেন সেখানকার মানুষ। ২০০১ এর ব্যাচের আইএএস অফিসার শহরের উন্নয়নের অনেক অভিজ্ঞতা সম্পন্ন বিকাশ গুপ্তাই যে গুগাঁওয়ের শহুরে লোকগুলিকেসামলানোর জন্য একেবারে ঠিক পছন্দ ছিলেন, সেই ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই। গুরগাঁও কর্পোরেশনের প্রধান হওয়ার আগে বিকাশ শহরের স্থানীয় প্রশাসনের সচিব এবং ডিরেক্টর ছিলেন এবং স্টেট আরবান লাইভলিহুড মিশন, হরিয়ানা সরকারের স্টেট আরবান ডেভেলপমেন্ট অথরিটির ডিরেক্টর ছিলেন। রোহতাক মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের কমিশনার এবং জেলার ডেপুটি কমিশনারেরও দায়িত্ব সামলেছেন তিনি।

শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে বসে জাঠ গ্রামবাসীদের অভিযোগ শুনে বিকাশ মনে মনে ঠিক করে নেন দুপক্ষকেই সামলাতে হবে। গ্রামবাসীদের অভিযোগ ছিল, তাদেরই এক প্রতিবেশীর বর্জ্য পৃথকীকরণের ইউনিট এবং মানসিক ভারসাম্যহীনদের জন্য যে হোম চলে সেটা সরাতে হবে। দলের যুবকরা একটু বেশিই প্রতিবাদী হয়ে উঠছিল যখন অভিযুক্ত নিজের অবস্থানের কথা জানাচ্ছিল। কমিশনারকে সে জিজ্ঞাসা করে, ‘যদি উৎখাত করা হয় তাহলে আমি যাব কোথায়? আমাকেই সেই পরিমান জমি অন্য জায়গায় দিতে হবে যেখানে সঙ্গীসাথিদের নিয়ে যেতে পারব’। যারা অভিযোগ করছিলেন তারাও নাছোড়বান্দা। তাদের অভিযোগ, ওই হোমের বাসিন্দা কয়েকজন মানসিক ভারসাম্যহীন গ্রামের রাস্তায় উলঙ্গ হয়ে ঘুরে বেড়ায়। পরে সচিবের সঙ্গে কথা বলে কমিশনার যার বিরুদ্ধে অভিযোগ তাকে নির্দেশ দেন, একমাসের মধ্যে অন্য একটি নির্দিষ্ট জায়গায় সবাইকে নিয়ে সরে যেতে।

জন্ম এবং বড় হওয়া জয়পুরে। গুপ্তা ইলেকট্রনিক্স এবং কমিউকেশনে স্নাতক হন রিজিওনাল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ বর্তমানে যেটি মালাইয়া ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি নামে পরিচিত। একেবারেই মনের খেয়ালের বশে আইএএস পরীক্ষায় বসেন। ‘সাধারণ মানের ছাত্র ছিলাম। প্রথম দশজনের মধ্যে থাকতাম, তবে পাঁচজনের মধ্যে কখনই নয়’, বলেন গুপ্তা। ‘যদি জিজ্ঞেস করেন কেন ইঞ্জিনিয়ারিংকে বেছে নিয়েছিলাম, সত্যি কোনও উত্তর আমার জানা নেই’, তিনি বলেন। একটু থেমে যোগ করেন, ‘অংক আর বিজ্ঞানে খুব ভালো ছিলাম। ফলে স্বাভাবিকভাবে ওটাই পছন্দের ছিল। কিন্তু যদি জানতে চান কেন আইএএস হলাম, তাহলে বলতে পারি, ক্লাস নাইনে পড়ার সময় খুব কাছ থেকে মণ্ডল-মন্দির প্রতিবাদ দেখায়, ছোটবেলা থেকে রাজনৈতিক পরিস্থিতি খুঁটিয়ে বিচার করতাম’। প্রথম দিকে গুপ্তা ভেবেছিলেন ইঞ্জিনিয়ারিং পাশের পর বিজনেস ম্যানেজমেন্ট পড়বেন অথবা সমসাময়িকদের অনেকের মতো কর্পোরেট সেক্টরে কাজ করবেন। যাইহোক, ৯৬ সালের এক ঘটনা, তিনি খবর পান তাঁরই এক সিনিয়র আইএএস পাশ করেছেন। ‘আর দশজনের মতো আমিও ভাবতে লাগলাম হয় কর্পোরেটে কাজ করব, অথবা সিভিল সার্ভিস। তাই সিনিয়রের কথা যখন শুনলাম, নিজেও ভাবলাম, একবার দেখাই যাক না কী হয়’, বলেন তিনি। তিন তিন বার চেষ্টা পর অবশেষে সফল হলেন গুপ্তা। ‘প্রথমবার রেলে পেলাম। পছন্দ হল না। তৃতীয় বছর ভাবলাম শুধু আইএস দেব না, ক্যাট পরীক্ষাও দেব’। সেই বছরই সব পরীক্ষায় পাশ করলেন। অতীতের এক ঘটনার কথা আজও মনে পড়ে তাঁর। ‘হঠাৎ করে স্বভাবে একটু বদল আসছিল। ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের দ্বিতীয় বছরে বেশ গা ছাড়া ভাব ছিল। ৬৫ জনের মধ্যে ২৩ রেঙ্ক করলাম। পরিষ্কার মনে আছে, মাইক্রো ইলেকট্রনিক্সের ভাইভা দিতে গিয়ে দেখলাম, আমার কিছু মনে পড়ছে না। কিছুই জানা ছিল না। বুঝতে পারলাম কঠোর পরিশ্রম ছাড়া কিছু হয় না’। সেই যে শিক্ষা পেলেন, এখনও অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলেন।

নভেম্বরে গুড়গাঁওয়ে ইয়োরস্টোরির স্টোরি ইভেন্টে তিনি বলেন, ‘শহরের নানা কাজে পুরসভার মতো গণ প্রতিষ্ঠানগুলির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শহরের নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণেই এটা সম্ভব। উদ্যোগী মনোভাব থাকতে হবে’। ওই ইভেন্টে গুপ্তা অন্তত ১০টি স্টার্টআপের সঙ্গে কথা বলেন। তাদের কাজকর্মগুলি সম্পর্কে উৎসাহ দেখান। কেউ কেউ আবার শহরের রাস্তা এবং শক্তি উৎপাদন সংক্রান্ত বিষয়ে উৎসাহী। গুরগাঁওয়ের মতো জায়গা সামলানো চাট্টিখানি কথা নয়। গ্রাম্য এবং শহুরে লোকদের মধ্যে ঝগড়া লেগেই থাকে। পুরনোপন্থী এবং নয়াপন্থীদের মধ্যে ফারাক অনেকটাই। এই সমস্যা মেটাতে এবং সবার জন্য সমাধান খুঁজতে তাজা মনের দরকার। কমিশনার বিকাশ গুপ্তাকে দেখে মনে হয়, তাঁর কাছে এই সব সমস্যার সুলুক রয়েছে।

লেখক-দীপ্তি নায়ার, অনুবাদ-তিয়াসা বিশ্বাস