গোলপোস্টের দিকে এগোচ্ছেন কালচিনির ভবানী

পায়ে জুতো নেই। পুষ্টিকর খাবার নেই। শুধু অদম্য ইচ্ছে শক্তিই ভরসা। কুড়িয়ে বাড়িয়েই আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখছেন কালচিনির কন্যা। ভবানী মুণ্ডা।

0

বাড়ির মেয়ে বল পায়ে দৌড়বে! তাও আবার কালচিনির অজ পাড়া গাঁয়ে! এমন অলক্ষুণে মেয়ে ভবানীর অমনতর শখ দেখে রে রে করে উঠেছিল বাড়ির সবাই, পাড়া পড়শিরাও। বাবা-মা তো ভেবেই আকুল, এই মেয়ের বিয়ে দেবেন কীভাবে। আর ওদিকে? কে কি বলল, কে নিন্দা করল ওসব থোড়াই কেয়ার। দুধের দাঁত পড়ার আগেই বল পায়ে ড্রিবলিং শিখে যায় ভবানী মুণ্ডা। ফুটবলের টানে মাত্র ১১ বছর বয়সে ঘর ছেড়ে আশ্রয় নিয়েছিল বন্ধুর বাড়ি। সেখানে থেকেই লড়াই জারি। শুধু নিজের খেলাধুলোই নয়, পাশের আরও পাঁচটি মেয়ের জন্য তৈরি করে দিয়েছেন খেলার ময়দান।

এ এক মর্যাদার লড়াই। ফুটবলের ময়দানে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে এক নারীর মাথা তুলে দাঁড়ানোর লড়াই। ডুয়ার্সের কালচিনির সবুজ গালিচায় এ যেন এক বিপ্লব। সামাজিক স্রোতের প্রতিকূলে লড়াই অধিকারের, দাবি মর্যাদার। দারিদ্রের সঙ্গে ড্রিবলিং। গোল করা আর হয়ে ওঠে না ভবানীর। বাড়ির অবস্থা ভাঁড়ে মা ভবানী। ঠাট্টা মনে হতে পারে। আসলে কখনও কখনও জীবনও তো মানুষের দৈনন্দিন চাহিদাগুলি নিয়ে ঠাট্টাই করে যায়। তা সত্ত্বেও বাল্যপ্রেম মরেনি কালচিনির বনবস্তির ভবানী মুণ্ডার।

ভবানী বলে চলেন, ‘আটিয়াবাড়ি চা বাগানে বাবা কাজ করতেন। পরিবারে ছিলেন মা, চার বোন ও ছয় ভাই। দু’বছর বয়সেই বাবা মারা যায়। প্রথম ফুটবল খেলার ঝোঁক চাপে ১৯৯৭ সালে। সেই সময় বয়স ছিল সাত বছর। বোন হাফপ্যান্ট পরে ফুটবল খেলবে। কে বিয়ে করবে বোনকে ? তাই আপত্তি ছিল দাদাদের। ২০০১ সালে ফুটবলের জন্য ঘর ছেড়ে এক বান্ধবীর বাড়িতে গিয়ে উঠি’।

কালচিনি হিন্দি হাইস্কুলে সাফাই কর্মীর কাজ নিয়েছিলেন পেটের তাগিদে। তখন তিনি ইউনিয়ন অ্যাকাডেমির ছাত্রী। ২০০৪ সালে বন্ধুর দিদির কাছে টাকা ধার করে কালচিনি থানার পাশে ছোট্ট চায়ের দোকান করেন। পড়াশোনা আর খেলাধুলো চালিয়ে যাওয়ার জন্য। শুরু হল অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। বছর চারেক আগের কথা। দুই বন্ধুকে নিয়ে মহিলা ফুটবল দল তৈরির পরিকল্পনা করেন ভবানী। গড়ে তোলেন ডুয়ার্স একাদশ নামে মহিলা দল। এখন দলের সদস্য সংখ্যা ২০ জন। সবাই চা বাগানের শ্রমিক পরিবারের। সারাদিনের হাড়ভাঙা খাটুনির গ্লানি মেটে ওই ফুটবলেই। অসম সহ তরাই ডুয়ার্সের বিভিন্ন এলাকায় মহিলা ফুটবল দল বলতে এখন সবাই চেনে ভবানীকে।

মাঠের বাইরের লড়াইও রোজ বেঁধে ভবানীকে। বিয়ে করেছেন দশরথ কুজুরকে। আর্থিক অবস্থা এতটাই খারাপ যে, সদ্যজাত শিশু কন্যার জন্য অনুষ্ঠান করতে শ্বশুর বাড়ির একটি গরু বিক্রি করতে হয়েছে । চায়ের দোকানের জন্য নেওয়া ১৫ হাজার টাকাও শোধ হয়নি এখনও। কালচিনির নিমতি মোড়ের গোরে লাইনে শ্বশুর বাড়িতে কোলে মেয়েকে নিয়ে বসে লড়াইয়ের কাহিনী বলতে বলতে আনমনা হয়ে পড়ছিলেন ভবানী। ২০১৪-য় লরিয়াল প্যারিস এবং ফেমিনা পত্রিকার তরফ থেকে তাঁকে পুরস্কৃত করা হয়। তার আগে পর্যন্ত কোনও প্ৰশাসনিক সহযোগিতা আসেনি। ভবানীর কথা প্রচার হতেই টনক নড়েছে প্রশাসনের। কদিন আগে কোচবিহারের রাসমেলা ময়দানে উত্তরবঙ্গ উৎসবের মঞ্চে সংবর্ধনা দেওয়া হল এই মহিলা ফুটবলারকে। এক লক্ষ টাকার চেক, ট্রফি, শংসাপত্র। ভবানী বললেন, ‘এক লক্ষ টাকার চেক পেয়েছি। এটা আমার জীবনে পাওয়া সবচেয়ে বড় টাকা। ওই টাকা ভাঙিয়ে চায়ের দোকানের ঋণ শোধ করব। বাড়ির জন্য গরু কিনব। বাকি টাকা খেলার জন্য রাখব।’ ভবানীর স্বপ্ন শুধু ফুটবল নয়, বিভিন্ন খেলায় মহিলাদের উৎসাহিত করা। ইতিমধ্যে কাবাডি ও ভলিবলের টিম তৈরি করেছেন।

পায়ে জুতো নেই। পুষ্টিকর খাবার নেই। শুধু অদম্য ইচ্ছে শক্তিই ভরসা। কুড়িয়ে বাড়িয়েই আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখছেন কালচিনির কন্যা। একবুক সাহস নিয়ে গাঁয়ের মাঠে ঝড় তুলছেন ক্যাপ্টেন ভবানী আর তাঁর দলবল। উইংয়ে গোল করার অভ্যেসটা এমন হতশ্রী জীবনকেও টের পাইয়ে দিতে হবে তো।