বাঙালির তোপসে বাবাজির মছলিবাবা দারুন হিট

2

জয় বাবা ফেলুনাথের মছলিবাবকে মনে আছে তো? একটা খবর দিয়ে রাখি। বারাণসী থেকে কলকাতায় এলো 'মছলিবাবা'। কিন্তু ‘মছলিবাবা’র কারবার আর আঁশ নিয়ে নয়, আস্ত মাছ নিয়ে। হাত পাতলেই মিলবে কাতলার পেটি থেকে ভেটকির ফিলে, ইলিশের মনপসন্দ পিস। বিশ্বাস হচ্ছে না তো? নাহ, রহস্য রেখে দেওয়া ঠিক হবে না, বাঙালি সাধের মাছ থেকে বঞ্চিত হবেন। মছলিবাবা আসলে অত্যাধুনিক কাঁচা মাছের দোকান। বিল ৫০০ টাকার ওপর হলে ৫ কিলোমিটারের মধ্যে পাওয়া যাবে ফ্রি হোম ডেলিভারিও। জানালেন ফেলুদার তোপসে, থুড়ি, সংস্থার অন্যতম কর্ণধার সিদ্ধার্থ চট্টোপাধ্যায়।

মাছের বাজার মানেই বিটকেল আঁশটে গন্ধ, প্যাঁচপ্যাচে কাদা চিল চিৎকার, ধাক্কাধাক্কি, মাঝে মধ্যেই দাম নিয়ে ঝগড়া, কোমর বেঁধে দরাদরি। খেতে বসে পাতে প্রমাণ সাইজের মাছের টুকরো অত ঝক্কির নিট ফল। আর রবিবার, ছুটির দিন হলে তো কথাই নেই। এই ঝামেলা আরও তিন চার গুণ বাড়িয়ে ভাবুন। এত ঝক্কির কথা মনে করে বাজারের ব্যাগ হাতে নিতেই শিউরে ওঠেন আপাত বিলাসী, ওলা উবেরের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত জীবনের ছেলেমেয়েরা। তা বলে কি বাঙালি মাছ খাবে না! হয় কখনও? সময় বদলেছে। মানুষের ধারণা, নিত্যদিনের কাজের ধরনও বদলে যাচ্ছে। তাদের কথা ভেবেই ‘মছলিবাবা’, হেসে বললেন সিদ্ধার্থবাবু, সংস্থার অন্যতম কর্ণধার। এবছরের গোড়ায় ৩১ জানুয়ারি ৪ উদ্যোক্তা সিদ্ধার্থ চট্টোপাধ্যায়, রাজীব নিয়োগী, অলোকেশ বন্দ্যোপাধ্যায় আর রাজীব মান্ডেল ১০ লক্ষ টাকা পুঁজি নিয়ে ‘মছলিবাবা’ শুরু করেন। ২৪ এ লেকভিউ রোডে ৩৫০ স্কোয়ার ফুটের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত এই জায়গাটিকে অনেকে মজা করে বলেন কাঁচামাছের ‘ফ্লুরিজ’।

দক্ষিণ কলকাতার এক বাঙালি বাড়ির নীচতলাকে বাছা হয়েছিল মছলিবাবার জন্য। সাদা দেওয়াল, উঁচু ছাদ, তামার বাতিদান এবং বইয়ের তাকে বাঙালি খানার রেসিপি। ঝাঁ চকচকে। মাছবাজার কে বলবে! তাকে ফালি করা মাছ, গোটা মাছ সব আছে। এমন অনেক পরিবার রয়েছে একজন মাত্র মাছ খেতে ভালোবাসেন। বাজারে একটুকরো মাছ পাওয়া যায় না বলে বেচারার মাছই খাওয়া হয় না। মছলিবাবা খোলার সময় এটাই মাথায় ছিল, একটুকরো মাছও কেনা যাবে এখান থেকে। আসলে আধুনিক পরিবারের কথা ভেবেই মছলিবাবা। যেকোনও আকারে তাজা মাছ পাওয়া যাবে এখানে, এমন অভিনব মাছের স্টোরের পেছনে কী আইডিয়া ছিল বলছিলেন সিদ্ধার্থ চট্টোপাধ্যায়, যিনি ভজহরি মান্নারও কর্ণধার। পরিমাণের থেকে মানে বেশি নজর দেন ওরা। দু একঘণ্টার মধ্যে মাছ বিক্রি না হলে নিজেদের রেস্তারাঁয় পাঠিয়ে দেন রান্নার জন্য। দিনে দু'বার স্টক পাল্টান। সকালে ৮.৩০ টা থেকে ১টা এবং বিকেলে ৪.৩০ টে থেকে রাত ৯ টা পর্যন্ত প্রতিদিন খোলা থাকে মছলিবাবা।

প্রায় সব রকম সামুদ্রিক এবং মিঠে জলের মাছ পাওয়া যায়। ভেটকি, ইলিশ, রুই, গলদা, বাগদা, তোপসে, ট্যাংরা, দেশি ট্যাংরা সব টাটকা মাছ থরে থরে সাজানো, চোখে পড়লেই লোভ সামলানো দায়। জমাট বরফে পাওয়া যাবে ভিয়েতনামের বাসা, অক্টোপাস, আন্দামানের রক লবস্টার, কাঁকড়া। রাজ্য মৎস্য দফতরের মাছ এবং সুন্দরবন, ক্যানিং, দীঘা, বকখালি, বসিরহাট, মালঞ্চর সমবায় থেকে সরাসরি মাছ নেওয়া হয়, যাতে ক্রেতার হাতে সেরাটা তুলে দেওয়া যায়। দেড় কেজির একটা ইলিশের দাম পড়ে দেড় হাজার টাকা। দুজনের পরিবারে এত দামি বড় ইলিশ বাড়াবাড়ি হয়ে যায়। তার চাইতে জাম্বো সাইজের পিস কিনুন প্রতিটা ২৮০ টাকায়। একটু ছোট ইলিশ হলে পার পিস ২৪৫ টাকা। এক্কেবারে পয়সা উসুল। তেমনি তোপসে এক একটা ২০ টাকা করে, বড় বাগদা চিংড়ি ৫০ টাকা প্রতি পিস, বরফ জমা রক লবস্টার প্রতিটি ২৫০ টাকা করে। ধরা যাক চিতল মাছ। ৮০০ টাকা কেজি বাজারে আবার ৫০০ গ্রামের নীচে বিক্রি হয় না। মছলিবাবায় বড় চিতল মাছের টুকরো মিলবে ১৯০ টাকায়। মাছের অর্ডার দিয়ে অপেক্ষা করছেন যখন একবার তাকের বইয়ে রেসিপি দেখে নিন।

মছলিবাবা আসলে একটা ট্রেন্ড সেট করে দিল। শুধু শহরে কেন গোটা রাজ্যে এধরনের স্টোর এটাই প্রথম। তার ওপর এমন জায়গায় খোলা হয়েছে যেখানকার মানুষ এই কনসেপ্টকে সাদরে গ্রহণও করেছেন। চার উদ্যোক্তা জানালেন হিট করে গিয়েছে ৬ মাসেই। এবার শহরের আরও কয়েক জায়গায় মছলিবাবাকে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা শুরু হয়ে গিয়েছে।