লিচু ফলিয়ে সোনালি দিনের আশায় ফরাক্কা

0

দেখতে দেখতে বৈশাখ জৈষ্ঠমাস পড়ে যাবে। গাছেগাছে আমের বোল, কাঁঠাল গাছে এঁচোর আর লিচু গাছে মুকুলের থোকা জানান দিচ্ছে, ফাল্গুন পড়ে গিয়েছে।  সামনে বৈশাখ। আর বৈশাখ মাস মানে আম,লিচু,জাম,তরমুজের মরশুম। পাকা আম,কাঁঠাল আর লিচুয় জামাইষষ্ঠীর সেই দিন। যে কটা ফলের নাম বললাম তার মধ্যে সবচেয়ে ক্ষণস্থাযী হল লিচু। মেরে কেটে দিন পনেরো বাজারে মেলে।তারপরই হাওয়া। তার কারণ অবশ্য সেভাবে ফলন না হওয়া। বাড়িতে বাড়িতে যত না আম গাছ,লিচুগাছ কটাই বা দেখা যায়। মুর্শিদাবাদে লিচুর ফলন সবচেয়ে বেশি। সেই মুর্শিদাবাদেই এবার লিচুর ফলন বাড়াতে চাষিদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে উদ্যান পালন দফতর। জঙ্গিপুরের উদ্যান পালন দফতর চাষিদের পরিকল্পিত ভাবে লিচু চাষের পরামর্শ দিচ্ছে।

জেলা উদ্যান পালন দফতরের হিসেবে, মুর্শিদাবাদ জেলায় লিচুর বাগান রয়েছে ৩,৪০০ হেক্টর জমিতে। গত বছর লিচু ফলনের পরিমান ছিল ৪০ হাজার টন। জেলার বেশির ভাগ লিচু বাগানই রয়েছে জঙ্গিপুর মহকুমা এলাকায়। প্রায় ২৭৫০ হেক্টর জমিতে লিচু চাষ হয়। গেল বছর মহকুমায় ৩২ হাজার টন লিচু হয়। দফতরের এক কর্তা জানান, জঙ্গিপুরে লিচুর ফলন আরও বাড়াতে তাঁরা গাছে মুকুল ধরার আগে থেকেই বাগান মালিকদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল জৈবপদ্ধতিতে লিচুর চাষ। উদ্যান পালন দফতরের দাবি, জৈব পদ্ধতিতে লিচুর ফলন যেমন ভাল হবে,তেমনি ফলের সঙ্গে শরীরে বিষ ঢোকার সম্ভাবনাও থাকে না।

ভাল লিচু চাষ করার স্বীকৃতি হিসেবে ২০১৩ সালে রাজ্য সরকার কানপুরের চাষি আশরাফুল শেখকে ‘কৃষিরত্ন’ সম্মান দেয়। এবারও লিচু চাষের প্রশিক্ষণ নিতে আসেন তিনি। ২১ বিঘে জমিতে লিচু বাগান আশরাফুলের। বাগানে রয়েছে দেশি ও মুম্বই ছাড়াও চিনা, কাফেরি, বেদানা ও আতা প্রজাতির লিচুও। প্রায় শ’তিনেক গাছ। সেই আশরাফুল বলেন, ‘এত দিন চাষিরা অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বাগান পরিচর্যা করেছেন। ফলে লিচুতে চুষি পোকা থেকে নানা ধরনের রোগ পোকার আক্রমণ ঘটত। ফলন মার খেত। বাজারের কীটনাশক সার বিক্রেতাদের পরামর্শ মতো সার প্রয়োগ করতেন চাষিরা। তাতে অনেক সময় ফল মিলত না। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ মেনে চাষ করলে, সে সমস্যা থাকবে না’। এই বছর তিনি ২০টি গাছে লিচু ফলাচ্ছেন শুধুমাত্র জৈব সার প্রয়োগ করে। কলকাতার মলে জৈব প্রক্রিয়ায় উৎপাদিত ফলের চাহিদা রয়েছে। পরীক্ষামূলক ভাবে তিনি জৈব প্রদ্ধতিতে চাষ শুরু করেছেন। লাভবান হলে জৈব চাষের পরিমাণ বাড়াবেন।

অন্যদিকে, ইলিয়াসপুরের নজরুল ইসলামের ৮ বিঘে লিচু বাগান ।গাছ রয়েছে ১৩২টি। মূলত দেশি ও মুম্বই জাতের গাছ। বছর পঞ্চান্নের নজরুল ইসলাম আগে বাগানের পরিচর্যা থেকে ফল-বিক্রি সবই নিজের হাতে করতেন। কিন্তু বছর দুয়েক ধরে তিনি বাগানই লিজ দিচ্ছেন। তিনি জানান, ‘বাগানের বয়স ২৩ বছর হল। পোকার আক্রমণে ফলন কম হচ্ছে। গত বছর ফলন মার খেয়েছে। তাই কীভাবে লিচু গাছের পরিচর্যা করবেন, তার ঠিকঠাক উপায় শিখতে প্রশিক্ষণ নিতে এসেছেন। জেলা উদ্যান পালন দফতরের বিশেষজ্ঞ শুভদীপ নাথ বলেন, ‘জঙ্গিপুর ও ফরাক্কার লিচুর মান সবচেয়ে ভাল। এই মান ধরে রেখে কীভাবে উৎপাদন বাড়ানো যায়, তারই চেষ্টা হিসেবে বাগান মালিকদের নিয়ে এই প্রশিক্ষণ’। তাঁর পরামর্শ, ‘যদিও লিচু গাছে মুকুল আসেনি, তবু এখনই বাগানের গাছগুলিতে নিম মিশ্রিত জৈব কীটনাশকের পরিমাণ বাড়িয়ে রাসায়নিক কীটনাশক অল্প পরিমাণে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে। এতে গাছের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে উঠবে। মাঘ মাসের শেষে গাছে মুকুল আসে এবং মুসুরির দানার মত গুটি ধরে। তখনও একই ভাবে স্প্রে করতে হবে। এর ফলে চুষি পোকার আক্রমণ থেকে রক্ষা পেয়ে বৈশাখের প্রথম সপ্তাহে লিচুর চাষ সম্পূর্ণ হবে। বৈশাখের শুরুতেই লিচু উঠলে, চাষিরা ভাল দাম পাবেন’।

উদ্যান পালন দফতর স্থানীয় কানুপুরের বাগানে জৈব প্রক্রিয়ায় স্বল্প পরিমাণে লিচু উৎপাদনের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। সেই লিচুর সঙ্গে বাজার চলতি লিচুর মানের ফারাক দেখতে যাচাই করতে চাইছে দফতর। জৈব প্রক্রিয়ায় উৎপাদিত লিচু কলকাতার কয়েকটি খুচরো বিক্রয়কেন্দ্রে বিক্রির চিন্তাভাবনা রয়েছে। এতে সাফল্য পেলে অন্য বাগান মালিকদের এ নিয়ে উৎসাহিত করা হবে।