পাহাড়ের প্রেমে চাকরি ছেড়ে ব্যবসায়ী সপ্তর্ষি

0

কর্পোরেট দুনিয়াকে গুডবাই বলে পাহাড়ের ডাকে সাড়া দিলেন সপ্তর্ষি রায়। ডাক নাম সপ্ত। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ছাত্র। পাহাড় তাঁকে টানত ছোটবেলা থেকেই। ৯০ এর দশকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় বন্ধুদের সঙ্গে প্রথম ট্রেকিং করেন। সবাই মিলে সান্দাকফু, জোংরি ট্রেকে যাওয়া যেমন হয়। কিন্তু সেই থেকেই মাথায় ঘুরপাক খেত পাহাড়ি পথ, রডোডেনড্রন, বরফে গাঁইতি গাথার মুহূর্তগুলো। 

হিমালয়কে জানার আগ্রহই তাঁকে এরপর ক্রমে কুমায়ুন, গাড়োয়াল, হিমাচল ও লাদাখে একের পর এক ট্রেকে নিয়ে গেছে। এরই মধ্যে শুরু চাকরি জীবন। উইপ্রো, কগনিজেন্টের মতো বিভিন্ন সংস্থায় সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করেছেন সপ্ত। তবে কর্মজীবনের ব্যস্ততা কখনওই ট্রেকিং থেকে দূরে রাখতে পারেনি। সময় সু্যোগ হলেই পাড়ি দিয়েছেন হিমালয়ের বিভিন্ন প্রান্তে। পিন পার্বতী, রূপকুন্ড-রন্টি স্যাডেল, কালিন্দির মতো ট্রেকগুলি করা সেই সময়ই। যত পাহাড়ে গেছেন তত বুঝেছেন কর্পোরেট জীবনের দমবন্ধকর পরিবেশে ফিরে যাওয়া তার কম্ম নয়। তাই ফাইনালি ট্রেকিংকেই পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন সপ্তর্ষি। কর্পোরেট জীবনের নিশ্চয়তা ছেড়ে খুলে ফেললেন ট্রেকিং এজেন্সি হিমালয়া ট্রেকার্সের (HT)।

বন্ধুদের উত্সাহ ও সাহায্য ছিলই, আর ছিল হিমালয়ের প্রতি ভালোবাসা আর কর্পোরেট জীবনে টিমকে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিজ্ঞতা। ২০১০ এর জুনে হিমালয়া ট্রেকার্সের প্রথম ট্রেক গাড়োয়াল হিমালয়ের রূপকুন্ড লেক। ইতিমধ্যেই হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউট থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়া হয়ে গিয়েছিল সপ্তর্ষির।

“আমরা যখন আগে ট্রেক করতাম, দু’ধরণের ট্রেকারদের দেখতাম, এক, আমাদের মতো কিছু উত্সাহী যারা নিজেদের মতো করে ট্রেকের ব্যবস্থা করে যেতাম বা স্থানীয় ক্লাবের দ্বারা আয়োজিত ট্রেকিং যার নেতৃত্বে থাকতেন যাদের আমরা বলি হার্ডকোর ট্রেকাররা। এই দুইক্ষেত্রেই ছেড়া তাঁবু ও স্লিপিং ব্যাগ, অল্প ও খারাপ খাবার ছিল প্রায় নিয়মিত বিষয়, অনেক সময়ই আবার গিয়ে দেখা যেত গাইড যথেষ্ট দক্ষ নন। ট্রেকের ভাললাগাটাই নষ্ট হয়ে যেত। আরও এক ধরণের ট্রেক হত, এজেন্সির সঙ্গে, খুব ভাল ব্যবস্থা, তার থেকেও ভাল দাম। এক সঙ্গে ৩০-৩৫ জনের দল নিয়ে যায় তারা, সঙ্গে সহায়তাকারী কর্মী হাতে গোনা, ফলে প্রত্যেক ট্রেকারের দিকে যথাযথ নজর দেওয়া অসম্ভব, এবং প্রয়োজন ও সুবিধা মতো ট্রেকের কোনও পরিবর্তনও সম্ভব নয়, নিজে এজেন্সি খোলার সময় এই বিষয়গুলি মাথায় রেখে ছিলাম”, বললেন সপ্তর্ষি।

পাহাড় ও প্রকৃতির প্রতি ভালবাসা আরও একটা বিষয়ও ভাবিয়েছিল সপ্তর্ষিকে। ট্রেকিংয়ের সময় ক্যাম্প করার পর অনেকেই প্লাস্টিক, প্যাকেট, কাচের বোতল, ক্যান ইত্যাদি পাহাড়েই ফেলে আসেন। তাই হিমালয়া ট্রেকার্সের প্রথম লক্ষ্যই পরিবেশের কোনো ক্ষতি না করে ট্রেকের আয়োজন করা, সংস্থার ভাষায় গ্রিন ট্রেক। প্লাস্টিক ব্যবহার না করা, জ্বালানি হিসেবে কাঠ ব্যবহার না করা, স্থানীয় খাবারের ওপর নির্ভর করা, বায়োডিগ্রেডেবল্ নয় এমন বর্জ্য ফেরৎ নিয়ে আসা ইত্যাদি নিয়ম কড়া ভাবে মেনে চলা হয় হিমালয়ার ট্রেকার্সের যে কোনও ট্রেকে।

“ট্রেকিংকে ঘিরে প্রায়ই একটা অদ্ভুত অনিশ্চয়তার বাতাবরণ তৈরি করা হয়, ট্রেকিং যেন একটা প্রচন্ড কঠিন ব্যাপার এবং মুষ্টিমেয় কিছু লোকের জন্য। কিন্তু আমরা তা মনে করি না। শহুরে জীবন ও মোবাইল নেটওয়ার্ক থেকে দূরে থাকার এ এক অদ্ভুত নেশা যা সহজে ঝেড়ে ফেলা সম্ভব নয়। প্রকৃতি ভালবাসে এরকম বাকি অনেকের জন্যই নিশ্চয়ই এটা সত্যি। ট্রেকিং তো পর্বত অভিযান বা রক ক্লাইম্বিং নয় যে প্রশিক্ষণ লাগবে, আপনাকে তো আসলে শুধু হাঁটতেই হবে তাই না? সকলেই যাতে এই অসাধারণ অভিজ্ঞতার স্বাদ পেতে পারেন সেটা আমাদের লক্ষ্য”, জানালেন সপ্তর্ষি।

পরিবেশ বান্ধব ট্রেক করানোর পাশাপাশি, ট্রেকের সময় উন্নতমানের সামগ্রী ব্যবহার, প্রতিটি সদস্যের দিকে যথাযথ নজর দেওয়া ও সাহায্য করার জন্য উপযুক্ত সংখ্যক কর্মীর উপস্থিতি নিশ্চিত করা, পুষ্টিকর ও ভাল খাবার দেওয়া ইত্যাদি বিষয়গুলির দিকে নজর দেওয়া হয় যে কোনও ট্রেকে। সহায়ক টিম ও ট্রেকারের সংখ্যার অনুপাত সবসময়ই অন্তত ১:৩ রাখা হয়, প্রয়োজনে আরও বেশি , যাতে দরকার মতো প্রত্যেকেই সাহায্য পান। এবং সবসময়ই নিয়ে যাওয়া হয় ছোটো টিমে।

হিমালয়ার ট্রেকার্সের শুরু থেকেই সপ্তর্ষির সঙ্গে রয়েছেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের আরেক স্নাতক, বর্তমানে দিল্লি নিবাসী কৃষ্ণেন্দু ব্যানার্জী। ছাত্রজীবন থেকেই একসঙ্গে ট্রেক করছেন সপ্তর্ষি আর কৃষ্ণেন্দু। পেশায় পিয়ার ম্যানেজার কৃষ্ণেন্দুর ঝুলিতে রয়েছে মাউন্ট থেলু, মাউন্ট কোটেশ্বর ও মাউন্ট দেও টিব্বার মতো পর্বত অভিযানের অভিজ্ঞতা, এইচএমআইয়ে প্রশিক্ষণও নিয়েছেন কৃষ্ণেন্দু। হিমালয়া ট্রেকার্সের ট্রেকের প্রস্তুতি থেকে নতুন রুটের খোঁজ সবকিছুতেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে কৃষ্ণেন্দুর।

মার্কেটিং বলতে ওয়েবসাইট (http://himalayatrekker.com), ওয়ার্ড অফ মাউথ ও ফেসবুকের মতো সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মের ওপরই ভরসা করে হিমালয়া ট্রেকার্স। “যারা আমাদের সঙ্গে যান, তাঁরা ফিরে এসে পরিচিতদের বলেন, এভাবেই নতুন ট্রেকার আসেন, আর যে একবার ট্রেকিংয়ের স্বাদ পেয়ে যান তিনি তো ফিরে ফিরে আসবেনই, এছাড়া ফেসবুক থেকে জেনেও অনেকে যোগাযোগ করেন”, বললেন সপ্তর্ষি।

স্থানীয় মানুষদের সচেতনতা বৃদ্ধি করে ব্যবসায় তাঁদের সর্বোচ্চ অংশগ্রহণ করানোও অন্যতম লক্ষ্য এই সংস্থার। সেই উদ্দশ্যেই প্রতিটি ট্রেকে গাইড ও সহায়ককারী কর্মী হিসেবে স্থানীয় মানুষকে নিয়োগ করা হয়। এতে যেমন একদিকে স্থানীয় মানুষের আয়ের সংস্থান হয় ও স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হয় অন্যদিকে ট্রেকারদের নিরাপত্তাও নিশ্চিত হয়, কারণ হিমালয়কে তার ভূমিপুত্রদের থেকে ভাল কেউ চেনে না, আবহাওয়ার পরিবর্তন বা রাস্তার খুঁটিনাটি জানা থাকায় আপতকালীন পরিস্থিতিতে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন তাঁরা। সপ্তর্ষি ও বাকিদের দীর্ঘদিনের পাহাড়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এই গাইড ও সহায়ক কর্মীদের নির্বাচন করা হয়।

“আমার এই এজেন্সি শুরুর প্রাথমিক কারণটাই ছিল পাহাড় ও পাহাড়ের মানুষের প্রতি ভালবাসা, তাই তাদের ক্ষতি হয় এমন কিছু যাতে কখনই না হয় সেইদিকে সবসময়ই নজর দেওয়া হয়”,বললেন সপ্তর্ষি।

সংস্থার বয়স পাঁচ, প্রথমদিকের বছরগুলি কেটেছে হিমালয়ের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত - লেহ-লাদাখ, গাড়োয়াল, কুমায়ুন, সিকিমে স্থানীয় গাইড ও সহায়ক কর্মীদের সঙ্গে নিজেদের যোগাযোগ তৈরি করতে, পাশাপাশি ছিল পরিচিত রুটে নিয়ে যাওয়া, তারপর ধীরে ধীরে ক্রমশ কঠিন ও নতুন পথের খোঁজ ও সেখানে ট্রেকারদের নিয়ে যাওয়া শুরু করে HT।

বর্তমানে রূপকুন্ড, জোংরি গোচালা, সিঙ্গালীলা পাস-ফোকটে দারা, রুপিন পাস, কালিহেনি পাস, সতোপন্থ তাল, পিনপার্বতী পাস, হর কি দুন, চাদার, সুন্দরডোঙা সহ একাধিক ট্রেক নিয়মিত আয়োজন করে হিমালয়া ট্রেকার্স। সপ্তর্ষি নিজে সঙ্গী হন কিছু ট্রেকে, এ পর্যন্ত মোট ৩০টি রুটে পাঁচশোরও বেশি ট্রেকারকে নিয়ে গিয়েছেন তাঁরা।

ট্রেকিংকে মানুষের কাছে নিরাপদ ও উপভোগ্য করে তোলাই উদ্দেশ্য সপ্তর্ষির। সপ্তর্ষির নিজের অন্যতম আগ্রহের জায়গা হিমালয়ের সমৃদ্ধ প্রাণী ও উদ্ভিত জগত। “প্রকৃতির মাঝে কয়েকটা দিন সহজ জীবন কাটিয়ে এসে একজন ট্রেকারের রোজকার জীবনযাত্রায় তার কিছু প্রতিফলন থাকলে আমাদের প্রয়াস খানিকটা হলেও সফল”, বললেন সপ্তর্ষি। নিজের পাহাড়ের প্রতি ভালবাসা ও পাহাড়ের নেশাকে আরও অনেকের মধ্যে চারিয়ে দিতে ও পাহাড়ের স্থানীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নে সাহায্য করতেই তাঁর এই উদ্যোগ।