ঘরে-ঘরে টাটকা বাতাসের ফ্রি-হোম ডেলিভারি!

0

ঘরের মধ্যেই গোলাপ, চন্দ্রমল্লিকা, রজনীগন্ধা কিংবা অন্য কোনও মরসুমি ফুল।ঘরময় ছুটে বেড়াচ্ছে ফুলের মিষ্টি সুবাস। পড়ার টেবল থেকে বারান্দার একফালি জায়গা, সব জায়গাতেই সবুজের হাতছানি। ঘরের মধ্যেই যেন এক টুকরো বাগান। এমন একটা পরিবেশ কার না ভালো লাগে! ‌আপনিও নিশ্চয়ই এর ব্যতিক্রম নন। প্রশ্ন হল কীভাবে সম্ভব হবে ইন্ডোর গার্ডেন। কীভাবে চলবে দেখভাল? উত্তরটা হল আপনার প্রাথমিক একটু উদ্যোগে। আর বাকিটা? সেটাও খুব সহজ।

নগরায়নের দাপটে কমছে গাছপালা, বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই অক্সাইডের দাপট, বাড়ছে পরিবেশ দূষণ। ঘরে-বাইরে বিশুদ্ধ বাতাসের অভাব। পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের কথা ভেবে অনেক শহরেই তাই গুরুত্ব বাড়ছে ইন্ডোর গার্ডেন বা ঘরোয়া বাগানের। কিন্তু এমন একটা বাগান তৈরি ও তার পরিচর্যা সহজ নয়। সূর্যালোকের ব্যবস্থা, জল দেওয়া, মাটিতে প্রয়োজনীয় খনিজের মিশ্রণ-সবমিলিয়ে ব্যাপারটা শ্রম ও সময়সাপেক্ষ। এর বিজ্ঞানসম্মত সমাধানে এগিয়ে এসেছে বেঙ্গালুরুর বায়োটেক স্টার্টআপ ইকো ওয়ার্কস (Eco Works)। সংস্থাটি তৈরি করেছে গন্ধহীন একটি পলিমার জেল, যা অনেকটা স্পঞ্জের মতো। এর নাম দেওয়া ইকো ওয়ান্ডার জেল। এই জেল সহজেই ধরে রাখতে পারে জল ও গাছপালার জন্য প্রয়োজনীয় পদার্থ।


স্যাটেলাইট ডেটার মাধ্যমে ইজরায়েলের তেল আভিভ ইউনিভার্সিটির একটি সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০০২ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে বেঙ্গালুরুতে বায়ু দূষণ গড়ে প্রায় ৩৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে নাগরিক জীবনে। বয়স্কদের ১০ শতাংশ ও শিশুদের ৫০ শতাংশ এমন সব রোগের শিকার যার শিকড় রয়েছে পরিবেশের মধ্যেই। শুধু বেঙ্গালুরু নয়, ভারতের অন্য শহরগুলিতেও একই প্রবণতা। কথায় বলে লোহা দিয়েই লোহার মোকাবিলা করতে হয়। সেই ধারণাতেই এর একটা বায়োলজিক্যাল সলিউশন দিয়েছে নাসা (ন্যাশনাল এয়ারোনটিকস অ্যান্ড স্পেস রিসার্চ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন)। নাসার এক মহাকাশ গবেষণায় জানা গিয়েছে ইন্ডোর পলিউশনের টোটকা হতে পারে ইন্ডোর প্ল্যান্টস। ঘরের কোণে এক হাত, দু'হাত গাছের কি এতটা ক্ষমতা রয়েছে? ব্যাপারটা তাই আরও ভালোভাবে বুঝতে মিসিসিপির স্পেস সেন্টারে আরও গবেষণা চলছে।যার নাম দেওয়া হয়েছে বায়োহোম।ফলাফল আপাতত বেশ ইতিবাচক।

নাসার এই কর্মকাণ্ড থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই ইকো ওয়ান্ডার জেল তৈরি করেছে বেঙ্গালুরুর বায়োটেক স্টার্টআপ ইকো ওয়ার্কস। বাড়ির দূষিণ বাতাসকে এক্সিট ডোর দেখিয়ে ঘরে-ঘরে টাটকা বাতাসের ফ্রি-হোম ডেলিভারি। ব্যাপারটা অনেকটা তেমনই। জৈব-রসায়নগার হিসাবে ইকো ওয়ার্কস বেছে নিয়ে বেঙ্গালুরুরই একটি নামি বায়োটেক ল্যাব ভিট্টল মালিয়া সায়েন্টিফিক রিসার্চ ফাউন্ডেশনকে। এই ল্যাব ভারত সরকারের ডিপার্টমেন্ট অব বায়োটেকনোলজি স্বীকৃত।


দিন-কয়েকের জন্য বেড়াতে গেলে বা জরুরি কাজে দূরে যেতে হলে অনেকেই সমস্যায় পড়েন। বাড়ির বয়স্ক লোকদের কে দেখাশোনা করবে, বাড়ির পোষ্যদের দেখভালেরই বা কী হবে। এ সব দায়িত্ব সামলানোর জন্য বড় শহরগুলিতে কিছু সংস্থাও গড়ে উঠেছে। কিন্তু আপনার বাড়ির টবের গাছ? কয়েকদিন জল না পেলেই তো শুকিয়ে কাঠ। ইকো ওয়ান্ডার জেল থাকলে কিন্তু বেশ কয়েকসপ্তাহের জন্য আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন। হ্যাঁ, কয়েক সপ্তাহ। চার সপ্তাহ জল না পেলেও গাছ বেঁচে থাকবে এমনই এই জেলের কার্যকারিতা। এই জেল এমনই এক সংমিশ্রণ যাতে গাছের প্রাণধারণের উপযোগী কার্বোহাইড্রেটস-সহ জরুরি উপাদান রয়েছে। এমনই এক পলিমার যা পরিবেশবান্ধব এবং রঙিন। রংচঙে এই ব্যাপারটা ঘরের শোভাও বাড়াচ্ছে। অর্থাৎ রোজকার দেখভাল বা জল দেওয়ার ব্যাপারটাই নেই। তাতেও গাছের বাড়বৃদ্ধি আটকাবে না।


ইকো ওয়ার্কসের সিইও সমীর ওয়াধয়া বললেন, "আমরা খুব কম বাড়িতেই ইন্ডোর প্ল্যান্টস দেখি। এখনকার এই ব্যস্ত সময়ে সকলের পক্ষে প্রতিদিন গাছের পরিচর্যা সম্ভব হয় না।ইকো ওয়ান্ডার জেল সেই ব্যাপারটাকে সহজ করে দিয়েছে। রোজ-রোজ গাছের দেখভালের কোনও প্রয়োজন নেই। মাসে একবার বা দু'বার গাছে জল বা সার দিন। ব্যাস আপনার দায়িত্ব শেষ। বাকিটা বুঝে নেবে ইকো ওয়ান্ডার জেল"। আমেদাবাদ আইআইএমের এমবিও সমীর আগে একটি নামি কর্পোরেট সংস্থায় কাজ করতেন। কিন্তু মন টেকেনি। পরিবেশ ও সমাজকে কিছু ফিরিয়ে দেওয়ার তাগিদ থেকেই জড়িয়ে গিয়েছেন এই কাজে। এখন তাঁর প্রথম লক্ষ্য, বেঙ্গালুরু শহরের প্রত্যেকটি বাড়িতে, প্রত্যেকটি অফিসে ইন্ডোর প্ল্যান্ট লাগান। এরপর ধাপে-ধাপে দেশের অন্য শহরগুলিতে। এতে একদিকে যেমন পরিবেশ দূষণে রাশ টানা সম্ভব হবে অন্যদিকে ঘর বা অফিসের সৌন্দর্যও বাড়বে।

গাছপালা নিয়েই গত ৩৫টা বছর কাটিয়ে দিয়েছেন ইকো ওয়ার্কসের মেন্টর ডক্টর অনীল কুশ। দেশ-বিদেশের বহু নামি বায়োটেক রিসার্চের সংস্থায় কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। এর মধ্যে রয়েছে ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব এগ্রিকালচারাল রিসার্চ, ফ্রান্সের পাস্তুর ইনস্টিটিউট, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রকফেলার ইউনিভার্সিটি, সিঙ্গাপুরের ইনস্টিটিউট অব মলিকিউলার অ্যান্ড সেল বায়োলজি। সেই অনীলবাবুর কথায়,"জৈবিক উপায়ে বায়ু শোধনে বিশেষ ভূমিকা নিয়েছে এই জেল। গাছে কখনও সখনও জল দিলেই হল"।

শুধু ইকো ওয়ান্ডার জেল নয়, ইকো ওয়ার্কসের আস্তিনে রয়েছে পরিবেশ উপযোগী আরও প্রোডাক্ট। ফল, সব্জিতে কীটনাশকের ব্যবহার ক্রমেই বাড়ছে। ক্ষতিকর এইসব কীটনাশকের প্রভাব এড়াতে সবজি বা ফল খাওয়ার আগে ইকো ভেজ ওয়াশ দিয়ে ধুয়ে নিন। ইকো ভেজ ওয়াশ মিলবে বেঙ্গালুরুর বড়-বড় সব বিপণিতেই। যার মধ্যে রয়েছে নামধারিজ, টোটাল মল, ফুড ওয়ার্লড কিংবা বিগ বাস্কেট। বাগানে ফলমূল ফলানোর জন্য রয়েছে বেশকিছু ভেষজ প্রোডাক্ট। ডেন্টাল কেয়ারের ক্ষেত্রে রয়েছে পেঁপে থেকে তৈরি একটি বিশেষ টুথপেস্ট। এই পেস্ট ব্যবহারে ড্রিলিং ছাড়াই দাঁতের ক্ষয়রোধ সম্ভব হয় বলে সংস্থার দাবি।