পাথর শিল্পের দৌলতে বদলে গেছে বেলপাহাড়ি

0
"...ষণ্ডা যখন আসে তেড়ে/ উঁচিয়ে ঘুষি ডাণ্ডা নেড়ে/ আমরা হেসে বলি জোয়ানটাকে/ ঐ যে তোমার চোখ-রাঙানো/ খোকাবাবুর ঘুম-ভাঙানো/ ভয় না পেলে ভয় দেখাবে কা'কে?"

- (মহাত্মা গান্ধী প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

পশ্চিম মেদিনীপুরের বেলপাহাড়ি ক'দিন আগেও ছিল মাওবাদীদের আস্তানা। রক্তের দাগ লেগে থাকত পাথর খাদানে, জঙ্গলের পাতায়। শহরের মানুষ যেতে ভয় পেত। গ্রামের মানুষের মরতে হত অনাহারে, অর্ধাহারে। ধীরে ধীরে এলাকায় শান্তি ফিরতেই ছবিটা বদলাতে শুরু করেছে। এখন নিজের মতো করে বাঁচার আশ্রয় খুঁজছেন এলাকার মানুষ। গুলি গোলা নয়। পাথর খাদানের ঠুকঠাক শব্দ এখন বেলপাহাড়ির আকাশে বাতাসে। ওঁরা পাথর দিয়ে তৈরি করেন মূর্তি, থালা, গ্লাস, বাটি। শহরের বাজারে ভালো বিক্রি। কলকাতায় এবং অন্যত্রও দারুণ বিক্রি হচ্ছে ওই সব হাতের কাজ। কলকাতা হস্তশিল্প মেলায় এসেছেন তেমন বহু শিল্পী। নিয়ে এসেছেন তাদের পসরা। বিক্রি হয়ে যাচ্ছে হটকেকের মতো। 

বেলপাহাড়ির নব মিস্ত্রি বলছিলেন আজও নাকি তাঁরা ভুলতে পারেন না ত্রাসের সেই স্মৃতি। “তখন রোজগারও তেমন হত না। ধীরে ধীরে এলাকা শান্ত হয়েছে। বেড়েছে ব্যবসার সুযোগ”। নব পাথর খাদানে কাজ করেন। মূর্তি বানান। যেমন বেলপাহাড়ি ব্লকের কাশীডাঙা গ্রামের বাসিন্দা অক্রুর সিং। বংশানুক্রমে পাথর খোদাই করেন ফলক, মূর্তি, থালা, বাসন তৈরি করাই তাঁর কাজ। শুধু তাঁরই নয়, কাশীডাঙার ১৭টি পরিবার এই শিল্পের সঙ্গেই যুক্ত। ওঁরা বলছিলেন এখন দারিদ্র কাটিয়ে দুটো পয়সার মুখ দেখতে পাচ্ছেন ওঁরা। পাথর শিল্পের দৌলতে অন্যান্য শহর ঘুরছেন। শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা টের পাচ্ছেন। আরও বেশি টের পাচ্ছেন ব্যবসা টিকিয়ে রাখার তাগিদ। এখন আর ভুল বুঝিয়ে, ভয় দেখিয়ে, চমকিয়ে ওদের অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া যাবে না।

শিমূলপাল গ্রাম পঞ্চায়েতের শিমূলপাল, ঢাঙিকুসুম, বীরমাদল, লবণি গ্রামেরও বেশ কয়েকটি পরিবারের পেশা পাথর শিল্প। বেলপাহাড়ির কয়েকটি শবর পরিবারও এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। আসলে শিমূলপাল গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় পাথর খাদান আছে। তাই এই খাদানকে কেন্দ্র করেই রুটিরুজির সন্ধান পেয়েছেন ওঁরা। মূলত কালো পাথরের ওপর খোদাই করেই কাজ করেন। তবে ঘিয়ে, লালচে, সাদা পাথরেরও চাহিদা আছে। সূক্ষ্ম কাজের ক্ষেত্রে ওড়িশার জোশিপুর থেকে সাদা পাথর আনাতে হয়।

বেলপাহাড়ি ব্লক ছাড়া রাজ্যের মধ্যে বাঁকুড়া জেলার ছাতনায় এই পাথর শিল্পীদের দেখতে পাওয়া যায়। গ্রামের মেলায় ভালো দাম ওঠে না। তাই ২০০৮ সাল থেকে অক্রুর সিং, নেপুর সিং, নবকুমার মিস্ত্রিরা বছরে দু-তিনবার পাড়ি দেন ভিন রাজ্যে। কলকাতার হস্তশিল্পমেলা, দিল্লি হাট, বিশ্ব বাংলা হাটে। বিক্রি দুর্দান্ত। হায়দরাবাদের হাইটেক সিটিতে ওঁদের কাজ দারুণ জনপ্রিয়। অক্রুর, নব‍’দের আশা, একদিন বিদেশেও পাড়ি দেবে তাঁদের বানানো সামগ্রী।

আগে ওদের কাজ ছিল ফলক তৈরি করা। চাহিদা অনুযায়ী এখন থালা, গ্লাস, বাটি তৈরি হচ্ছে। তবে রাজ্যের বাইরে এখন বিপুল চাহিদা দেখা দিচ্ছে পাথরের মডেলের। তাই মডেল তৈরিতেও হাত পাকাতে শুরু করছেন শিল্পীরা। সরকারের তরফেও ক্লাস্টারের মাধ্যমে ওঁদের তৈরি সামগ্রী বিক্রির ব্যবস্থা করা হয়েছে।

বর্তমানে সরকারের তরফে তাঁদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে। শিমূলপালে আর ঠাকুরানপাহাড়িতে ‘কমন ফেসিলিটি সেন্টার‍’ গড়ে তোলা হয়েছে। শিল্পীদের বিনামূল্যে যন্ত্রপাতি, প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রয়োজনে ওড়িশা থেকে মাস্টার ট্রেনার এনেও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় তাঁদের। এছাড়া আর্টিসান ক্রেডিট কার্ডের ব্যবস্থা করা হয়েছে যাতে প্রয়োজনে আর্থিক সাহায্য পেতে পারেন পাথর শিল্পীরা। সরকারের তরফে তাঁদের জন্য হেলথ ইনসিওরেন্সেরও ব্যবস্থা রয়েছে। এরজন্য বছরে মাত্র ৮০ টাকা দিতে হয়। কোনও শিল্পীর স্বাভাবিক মৃত্যু হলেও এই ইনসিওরেন্স পলিসি থেকে ৬০ হাজার টাকা পাবে তাঁদের পরিবার।

বিনপুর-২ ব্লকের ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট অফিসার বা আইডিও মহাদেব সোরেন বলেন, “পাথরের কাজ প্যাকেজিংয়ের সমস্যা রয়েছে। তাই বিদেশে বিপুল চাহিদা থাকা সত্ত্বেও রপ্তানিতে সমস্যা হচ্ছে।”

তবে সব থেকে বড় সমস্যা ছিল বেকারত্ব আর কূপমণ্ডুকতা। এলাকার মানুষের মনোবলের অভাব, উদ্যোগ নেওয়ার মেরুদণ্ডই ভেঙে দিতে চেয়েছিল মাওবাদী সন্ত্রাস। পরিস্থিতি বদল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই সমস্যায় ইতি টেনেছেন স্থানীয় মানুষই। এখন ওঁরা নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে বিশ্বজয়ের স্বপ্ন দেখছেন।

Related Stories