মশালা মুভি নয়, রিতুর পছন্দ ডকুমেন্টারি

0

রিতু ভরদ্বাজ। নামটা কি চেনা মনে হচ্ছে? যারা সিনেমা জগতের খোঁজখবর রাখেন, তাদের কাছে নামটা বেশ পরিচিত। বাণিজ্যিক ফর্মুলা নয়, যে সব পরিচালক স্বাধীন ভাবনা নিয়ে কিছু করতে চান তাদের নিয়েই 'কমন থ্রেড', আর সেই সংস্থারই প্রতিষ্ঠাতা রিতু। মূলত সামাজিক ও পরিবেশগত বিভিন্ন বিষয়ের ওপর ফোকাস করে 'কমন থ্রেড'।


রিতু ভরদ্বাজ
রিতু ভরদ্বাজ

রিতুর সিনেমায় আসার একটা ইতিহাস রয়েছে। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় পাকিস্তান থেকে দিল্লি আসেন তাঁর দাদু-দিদিমা। অনেকটাই সহায়-সম্বলহীন অবস্থা। ঘুরে দাঁড়ানোর সেই লড়াইয়ে শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা পদে-পদে অনুভব করতেন রিতুর বাবা-মা। রিতুর পড়াশোনা যাতে ঠিকমতো হয় তা নিশ্চিত করতে যতটা সম্ভব চেষ্টা করতেন তাঁরা। ভালো স্কুলে পড়াশোনার ব্যবস্থা করা হয় রিতুর। পড়াশোনার ব্যাপারে রিতুর ওপর কোনও কিছু চাপিয়ে দেওয়ার অবশ্য তাঁরা পক্ষপাতী ছিলেন না। বুদ্ধিমতী রিতুও পড়াশোনাটা মন দিয়ে করতেন ও অল্প বয়স থেকেই একটা স্বপ্ন দেখতেন। ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার নয়, বড় হয়ে সাংবাদিকতা নিয়ে পড়তে চেয়েছেন রিতু।আসলে ছেলেবেলা থেকেই টিভির পর্দায় ছবি বা ভিডিও তার মন কেড়ে নিয়েছিল। ছবির মধ্যে যেন কিছু একটা রয়েছে। এই কিছু একটার সন্ধান করতে ফিল্ম স্টাডিজ নিয়ে পড়াশোনা করেন রিতু। পড়াশোনা শেষ হতে Bloomberg Tv-তে একটা চাকরিও পেয়ে যান। সেখানে পরিবেশ বিষয়ে, চাষবাস নিয়ে, ব্যবসা ছাড়াও বিভিন্ন সামাজিক বিষয়ের ওপর ছোট-ছোট তথ্যচিত্র বানাতেন রিতু। এক-একটা বিষয়ের ওপর কাজ করতে গিয়ে আবিস্কারের আনন্দই পেতেন। কিন্তু টিভিতে সবকিছুই যেন তাৎক্ষণিক। খুব বেশি সময় দেওয়া যাবে না। বিষয়ের খুব গভীরে যাওয়ার সুযোগও কম। মূলত এই টানাপোড়েন থেকেই ২০১০ সালে চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে স্বাধীনভাবে কাজ করতে শুরু করেন রিতু।

এরপরের অভিজ্ঞতা কেমন? রিতুর কথায়, "এরপর আমি বেড়িয়ে পড়লাম। গ্রামে-গ্রামে চলে যেতাম। এমন সব গ্রাম যেখানে বিদ্যুৎ নেই, পানীয় জলের ব্যবস্থা নেই, নেই আরও অনেক নাগরিক সুযোগসুবিধা। গ্রামের লোকেরা দেখলাম তাতেই অভ্যস্ত। তাঁদের সেটাই স্বাভাবিক মনে হত। যদিও আমি বুঝতাম এরই নাম লড়াই করে বেঁচে থাকা"। পশ্চিমবঙ্গের একটি গ্রামে চাষের কাজে যুক্ত মহিলাদের সঙ্গে কথা বলে, তাদের সঙ্গে। মিশে রিতু বুঝতে পারেন একটা রিপোটার্জের তুলনায় তথ্যচিত্রের প্রভাব অনেক বেশি হওয়ার সম্ভাবনা। এই সময় থেকেই তাঁর মাথায় আসে কালেকটিভ ফিল্ম মেকিংয়ের কথা। সাতজন প্রাক্তন সহকর্মী এবং বন্ধুকে নিয়ে ২০১৩ সালে রিতু শুরু করেন 'কমন থ্রেড'। "এই সাতজনের মধ্যে কেউ সিনেম্যাটোগ্রাফিতে দক্ষ, কেউ স্ক্রিপ্ট রাইটার, কেউ ফোটোগ্রাফার আবার কেউ শ্যুটিংয়ে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। কিন্তু স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসাবে আমাদের প্রত্যেকের লড়াইটা একইরকম। সেজন্যই আমাদের সংস্থার নাম কমন থ্রেড", বললেন রিতু।


কমন থ্রেডের শুরুটা খারাপ হল না।দ্বিতীয় বছরেই সংস্থার কাজকর্ম প্রায় পাঁচগুণ হয়ে গেল। আর তার পরের বছর সেটাও দ্বিগুণ!আসতে লাগল স্বীকৃতিও। ২০১৪ সালে All India Environmental Journalism Competition-এ শ্রেষ্ঠত্বের পুরস্কার পেল কমন থ্রেড। এইসময় বিভিন্ন বিষয়ের ওপর একগুচ্ছ তথ্যচিত্র তৈরি করা হয়।এর মধ্যে রয়েছে ভারতে প্রান্তিক শ্রেণির মানুষের কাছে বিচারের সুযোগ, পঞ্চায়েত ব্যবস্থা, শিশু সাহিত্যিক, নগরায়নের ফলে জয়পর ও দিল্লিতে খাদ্যাভাসে প্রভাব, উত্তরাঞ্চলে বীজ সংরক্ষণ ইত্যাদি। লন্ডনের একটি প্রোডাকশন হাউসের সঙ্গে বিবিসি'র জন্য তথ্যচিত্র (ভারতের ভৌগোলিক বৈচিত্র্যের ওপর)তৈরির কাজেও হাত লাগায় কমন থ্রেড। শিক্ষাদান বা পেডাগগির ওপর লন্ডনের ওপেন ইউনিভার্সিটির সঙ্গে মিলেও কাজ করে রিতুর সংস্থা।এজন্য ২০১৫ সালে লন্ডনে Bond Innovation Award পেয়েছে কমন থ্রেড।


এইসব তথ্যচিত্র থেকে যা চেয়েছিলেন, সেই মনের খিদে কি মিটছে? রিতু বলছেন, হ্যাঁ, তিনি তা পেয়েছেন। শুধুই তথ্যচিত্র নয়, এগুলি তার থেকেও বেশি। যখন কোনও একটা বিষয় নিয়ে কাজ করছেন, সেই বিষয়টার ভিতরে ঢুকছেন, বিভিন্ন মানুষজনের সঙ্গে কথা বলছেন অনেক না-জানা কিছু চোখের সামনে চলে আসছে। কোনও একটা গ্রামের মানুষ তাদের আপন করে নিচ্ছেন, দৈনন্দিন কাজের সঙ্গে পরিচয় করাচ্ছেন বা এমন কিছু চোখের সামনে ঘটতে দেখছেন তা কোনওদিন ভেবেও দেখেননি। এটাই সবথেকে বড় প্রাপ্তি।"আমি দেখলাম এমন অনেক বিষয় রয়েছে যেগুলি নিয়ে কাজ করা যায়। জরুরি কিছু প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে একটা গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হতে পারে আমাদের এই তথ্যচিত্র। এমন নয় যে সিক্রেট কোনও ব্যাপারকে তুলে ধরতে হবে, বরং আমরা অনেকেই যা জানি সেই সব বিষয়কেই একটু অন্যভাবে তুলে ধরা", বললেন রিতু।


তথ্যচিত্রের জগতে কয়েকটা বছর কাটানোর পরে রিতু মনে করেন পরিবেশ নিয়ে আমাদের অনেক কিছুই করার আছে। এই যে জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটছে, তার ফলে আমাদের জীবনে তার কী প্রভাব পড়তে পারে তা নিয়ে ভাবা দরকার।দেশের মানুষের মধ্যেও সচেতনতার বার্তা প্রয়োজন। এ ব্যাপারে অবশ্য ক্ষোভও উগরে দিলেন রিতু। তাঁর কথায়," আমাদের দেশে এমন একটা প্রচার চালান হয় যে প্রো-এনভায়রনমেন্ট মানেই যেন অ্যান্টি ডেভেলপমেন্ট। উন্নয়ন কী সেটাই যেন আমরা ভুলতে বসেছি। একটা উদাহরণ দিচ্ছি। সম্প্রতি পশ্চিম ভারতের কয়েকটি রাজ্যে ঝড়ে ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। কিন্তু উত্তরাখণ্ডের চাষিরা তাদের ফসলের অনেকটাই বাঁচাতে পেরেছিলেন। কারণ তাঁরা জৈব উপায়ে ভূমি-সংরক্ষণের কাজটা করেছিলেন। কিন্তু মিডিয়া উত্তরাখণ্ডের এই ব্যাপারটা নিয়ে সেই অর্থে নীরব। সব জায়গায় ঝড়ের ভয়াবহতা নিয়েই যত উৎসাহ"।


আমরা কেউই বিচ্ছিন্ন নই। এই বিশ্ব, পরিবেশ, প্রকৃতি, প্রাণী, মানুষ সবাই একটা বৃত্তের মধ্যেই রয়েছি। কেউ কাউকে ছাড়া নই। যে ফাঁকটুকু রয়েছে, ফারাকটা রয়েছে সেটাকেই তাই একটা সুতোয় জুড়তে চায় কমন থ্রেড। সময় একটু লাগবে ঠিকই, কিন্তু বেশি সংখ্যক মানুষ এগিয়ে এলে সেটাও সমস্যা হবে না।