India Shining ভূতের ভয়, নরেন্দ্র মোদিরও কি হয়?

1
এখন প্রশ্নটা হল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঠিক কী করবেন, ২০১৯ এ লোকসভা ভোটের আগে শেষ পূর্ণাঙ্গ বাজেট পেশ করতে চলেছে মোদি সরকার। আচ্ছে দিনের স্বপ্ন ফেরি করতে করতে স্লগ ওভারে চলে এসেছেন তিনি। গুজরাট নির্বাচনের পর নিন্দুকেরা বলেছে লৌহ পুরুষ নাকি কাঁদছিলেন। গুজরাট তার যৌবনের উপবন সেখানেও জয় অত সহজ ছিল না।

দীর্ঘদিন ধরে যে গুডস অ্যান্ড সার্ভিস ট্যাক্স নিয়ে জল্পনা কল্পনা, সেই জিএসটি কার্যকর করে দেখিয়ে দিয়েছেন এই ভদ্রলোক। এর পিছনে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। তবু তিনি করতে পেরেছেন কেবলমাত্র মানুষ তাঁর প্রতি আস্থা রেখে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়েছে। তাই বুক চিতিয়ে সাহস দেখাবার প্রয়োজন পড়লেই তিনি শক্তিমানের মতো হাজির হয়ে যান। তিনি যে সাহসী সেকথা হাড়ে হাড়ে মজ্জায় মজ্জায় টের পেয়েছে ভারত। টাকা বাতিলের উদাহরণটাই ধরুন না কেন, কেউ কখনও ভাবতে পেরেছিল রাতারাতি হাজার টাকা পাঁচশ টাকার নোট বন্ধ করে দেওয়া যায়! কালোটাকা কতটুকু আটকানো গিয়েছে তা নিয়ে লক্ষ প্রশ্ন আছে। থাকবেও। কিন্তু রাজনীতির সেই তর্জা আমাদের আলোচ্য নয়। আমাদের আলোচ্য আসন্ন বাজেট। এবং মনের কোণে সুড়সুড় করছে যে প্রশ্নটা সেটা হল এবার উনি ঠিক কী করবেন?

বিজেপিকে আরও একটি টার্ম টিকে থাকতে গেলে ঠিক কী করা উচিত ক্যাপ্টেন মোদির? একদিকে বিজেপির নিজস্ব ভোট-ব্যাঙ্ক। দীর্ঘদিনের অনুগত অন্ধভক্ত মধ্যবিত্ত ভোটার। যারা শহরেই বাস করেন। অথবা কসমোপলিটান কিংবা মাঝারি মাপের শহরে এসেছেন গ্রাম থেকে। অথবা যারা শহরে শুধু টিকে থাকার লড়াই করছেন। সেই সব মানুষ যাদের দেবদ্বিজে ভীষণ ভক্তি। অথবা শহীদের পরিবারকে বাঁচাতে চাঁদা তোলেন, চাঁদা দেন। অথবা যারা বাসে ট্রেনে গুঁতো খেতে খেতে নিত্যদিন ছোটেন। শুধু টিকে থাকার লড়াইটায় ক্রিজে টিকে আছেন স্টিকি উইকেটের মতো এরকম সব মানুষ মোদির মুখের দিকে তাকিয়ে আছেন। যখনই মোদি স্বচ্ছ ভারতের দাবি তুলেছেন, এরাই রবিবার হাতে ঝাঁটা নিয়ে পাড়ার রাস্তায় পনের মিনিট ঝাঁট দিয়েছেন। সেলফি তুলেছেন। ফেসবুকে শেয়ার করেছেন। কিংবা ডোকলামে ভারতীয় সেনার যাওয়া উচিত কি উচিত নয় এই নিয়ে বিশারদের মতো জানিয়ে দিয়েছেন তাদের মতামত। ট্রেনে, বাসে, ট্রামে, চায়ের আড্ডায় বাকিরা হা করে শুনেছে। যখন সার্জিকাল অপারেশন হয়, নিয়ন্ত্রণ রেখা পেরিয়ে ভারতীয় সেনা জঙ্গি ঘাঁটিতে আক্রমণ করে, নিহত জওয়ানদের মৃত্যুর প্রতিশোধ নেয়, তখন এরাই একটা ক্রিকেট ম্যাচ জেতার আনন্দ নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়া তোলপাড় করে ফেলেন। সেই জনতার রায়ের দিকে তাকিয়ে থাকায় অন্যায় নেই।

আরও অন্যায় নেই কারণ এই জনতাই দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম দলের সভাপতি, লোকসভায় বিরোধী দলনেতাকে যারপর নাই তাচ্ছিল্য করে ডাকেন পাপ্পু। তাদের ইচ্ছা অনিচ্ছা আশা আকাঙ্ক্ষা আর জাতীয়তাবাদী সেন্টিমেন্টের খেয়াল রাখার দায় তো খোদ মোদিরই।

কিন্তু আজকাল একটু অন্য সুরও শুনতে পাচ্ছেন মোদিজী। 'অচ্ছে দিন'- নিয়ে বন্ধুকে জোকস পাঠানো শুরু করেছে মানুষ। নোট বাতিলের পর, এবং শিশু খাদ্যেও ১৮ শতাংশ জিএসটি কার্যকর হওয়ার পর মানুষ আড়ে ঠারে বুঝিয়ে দিয়েছে তাদের মন কি বাত। লৌহ পুরুষের ইস্পাত কঠিন চোয়ালের আশ্বাস তাঁরা চান না। এবার আরও অন্য কিছু চাইছেন। অর্থনৈতিক সুরাহা চাইছেন। আয়করে ছাড়ও চাইছেন। ব্যাঙ্কে জমা রাখা টাকার নিরাপত্তা চাইছেন। জনতা দেশের জিডিপি বাড়ায় কিংবা কমায় বিচলিত নয়। বাজারে জিনিসের দাম। নিত্য দিনের বাড়তে থাকা খরচ এবং কমতে থাকা রোজগারে বেশি বিচলিত।

কিছু মানুষ ক্রমশই টের পেতে শুরু করেছেন মোদির অচ্ছে দিন আসুক নাই আসুক একটা বদল ইতিমধ্যেই দেশের অর্থনীতিতে এসেছে। সম্প্রতি দেশের বাজার আরও মুক্ত করে দিয়েছেন মোদি সরকার। যে নীতি ঘোষিত হওয়ায় দেশের ব্যবসায়ীদের চেয়ে বিদেশের ব্যবসায়ীরাই বেশি উল্লসিত। লাইসেন্স রাজ মুছে ফেলার কথা বলা হয়। ইজ অব ডুয়িং বিজনেস নিয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চ দাপিয়ে বেড়ান তিনি। টিভির পর্দায় মুদ্রা লোন দিয়ে দেশের অর্থনীতির ভীত মজবুত করার ফলাও বিজ্ঞাপন বেরয়। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে সেগুলোর সুযোগই পান না সাধারণ ছোট উদ্যোগপতিরা। সরকার যাই বলুক রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলি মুদ্রা লোন দিতেই আগ্রহী নয়।

অন্যদিকে ওয়ার্ল্ড ইকনমিক ফোরামের সাম্প্রতিক রিপোর্ট বলছে ইনক্লুসিভ ডেভেলপমেন্টের নিরিখে ভারত ৬২ তম। চিন যেখানে ২৬-এ। পাকিস্তানের ব়্যাঙ্ক ৪৭। আরও শুনবেন, নেপাল ২২-এ এবং বাংলাদেশ আছে ৩৪-এ। ফলে উন্নয়নের প্রশ্নেও ব্যাক বেঞ্চার মোদির ভারত। গত বছর ৭৯ টি দেশের মধ্যে ভারত ছিল ৬০-এ। চিন ছিল ১৫-য়। পাকিস্তান সেবছর ছিল ৫২-য়। ফলে এবছর কিছুটা হলেও উন্নতি করেছে পাকিস্তান। আর ভারত আরও পিছিয়ে গিয়েছে রেসে।

রিপোর্টে পরিষ্কার বছরের পর বছর ধরে দেশের মানুষের জীবন যাপনের মান, পরিবেশ এবং আসন্ন প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার নিরিখে ভারত পিছিয়ে আছে। এই তালিকা তৈরি করে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম। ফলে দেশের মানুষের ভালো থাকা মন্দ থাকার এই তালিকায় চিনের থেকে তো বটেই পাকিস্তানের থেকে, এমনকি নেপাল আর বাংলাদেশের থেকেও অনেক অনেক পিছিয়ে আছে ভারত। অক্সফ্যামের রিপোর্ট বলছে দেশের ধনী আর দরিদ্রের মধ্যে ফারাকটা এখন সব থেকে বেশি। বৈপরীত্য এতটাই যে দেশের মাত্র এক শতাংশ মানুষের কাছে ৭৩ শতাংশ সম্পদ কুক্ষিগত হয়ে রয়েছে।

আর এরই মধ্যে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে নিয়ম করে। ওষুধের দাম বাড়ছে। গ্যাসের দাম সাধারণ মধ্যবিত্ত মানুষের কপালে ইতিমধ্যেই ভাঁজ ফেলছে। উন্নয়নের ঢাক ঢোল যত বেজেছে, গ্রামের মানুষের আশা আকাঙ্ক্ষা সেই হারে পূরণ হয়নি। মনে রাখবেন, ১৩০ কোটির ভারতের ৭০ শতাংশই থাকেন গ্রামে। কৃষি নির্ভর এই দেশে চাষের সামগ্রীও তুলনামূলক ভাবে অন্যান্য প্রতিবেশী রাষ্ট্রের থেকে বেশি। কৃষি ক্ষেত্রে বৃদ্ধির হারও কম। তারমধ্যে মোদি ঘোষণা করেছিলেন ২০২২ এর মধ্যে কৃষকের রোজগার দ্বিগুণ করবেন। বাজেটে যদি শ্যাম কূল দুইই রাখতে হয় তবে ব্যয় বরাদ্দ বাড়াতে হবে। আবার ব্যয় বাড়লে রাজকোষের ঘাটতিও বাড়বে। শাঁখের করাতে মোদি সরকার।

অন্যদিকে, ৫৬ ইঞ্চি বুকের ছাতি ফুলিয়ে দেশাত্মবোধ জাগানিয়া ভাষণ দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী। শত্রুর মুখের ওপর জবাব দিচ্ছেন। আর হাততালি পড়ছে দেশের সোশ্যাল মিডিয়ায়।

কিন্তু হাততালির ফাঁকেও গুজরাট নির্বাচন শিক্ষা দিয়েছে অমিত শাহ, নরেন্দ্র মোদিকে। সামান্য হলেও ভাবনা শুরু করেছেন মোদি। সামনে রাজ্যে রাজ্যে ভোট। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই লোকসভা নির্বাচন। পাশা পালটাবে না। নিশ্চিত জানেন। এই আত্মবিশ্বাসের প্রতি অহংকারও আছে। তবু, সব যে সুরে বাজবেই এমনও নয়। অটল বিহারী বাজপেয়ীর জমানায় ২০০৪ সালের নির্বাচনে ইন্ডিয়া শাইনিংয়ের প্রচারের মধ্যেই নীরবে পাল্টে গিয়েছিল পাশা। সেই ভূতের ভয় মোদির কি হয়? ফলে এবারের বাজেট খুবই গুরুত্বপূর্ণ।