তাঁতে স্বপ্ন বোনেন উদ্যোক্তা নিশা

0

মহারাষ্ট্রের বুলধানা জেলা। কাঠফাটা রোদে প্রচণ্ড গরমে ঘেমে নেয়ে প্রায় ২০০ চাষি তুলো সংগ্রহ করেন গাছ থেকে। এরপর তুলোর গাদা ধোনা হয়, তার থেকে বীজগুলি বের করে আনা, সব শেষে বোনা। তুলো তোলা থেকে গাদা করা এবং তারপর মিলে নেওয়া পর্যন্ত ঝক্কির শেষ নেই। ‘বেশিরভাগ মিলই আবার তুলো যেখানে চাষ হয় তার থেকে বহু দূরে’, বলেন ‘জারিয়া’র কর্নধার নিশা নটরাজন। ‘জারিয়া’ হল ফরমায়েশি পোশাকের একটি সংস্থা।

নিশা নটরাজন,কর্নধার, জারিয়া
নিশা নটরাজন,কর্নধার, জারিয়া

‘একজায়গা থেকে আরেক জাগায় পাঠানোর সময় সুতোর ওপর ভালই ধকল যায়। তাই সুতো তৈরির আগে তন্তুগুলিকে শক্তপোক্ত করে নিতে হয়। নয়তো সুতো স্বাভাবিকতা হারিয়ে ফেলে’।এখানেই শেষ নয়। উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছানোর আগে মাঝে বিরাট অংশের মধ্যসত্ত্ব ভোগীরদের কারণে যে টাকা চাষির হাতে যায় তা আর বলার মতো নয়। চাষিদের এই দুরবস্থা ভাবিয়ে তুলেছিল নিশাকে। ভাবলেন উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে চাষিকে ভালো মানের কাপড় এবং সুতো বোনার সুযোগ তৈরি করে দিলে পরিস্থিতি বদলাতে পারে। সেই লক্ষ্য নিয়ে খান্নান লক্ষ্মীনারায়ণের প্রতিষ্ঠিত ‘মাইক্রোস্পিন’ এ বিজনেস ডেভেলপার হিসেবে কাজ শুরু করেন নিশা। তখনও কিন্তু ‘জারিয়া’র জন্ম হয়নি। তার জন্য আমাদের ৬ বছর পিছিয়ে যেতে হবে।

মাইক্রোস্পিনে সুতো তৈরি
মাইক্রোস্পিনে সুতো তৈরি

‘বাড়ির লোক বন্ধু-বান্ধবদের বিয়ের পোশাকের ডিজাইন আমিই করে দিতাম। তখন ব্যবসার কথা মনেই আসেনি’, বলেন নিশা। সেই সময় বেঙ্গালুরুর ক্রিস্ট ইউনিভার্সিটিতে হোটেল ম্যানেজমেন্টের ছাত্রী ছিলেন। ‘বেঙ্গালুরুতে ফিরে আসার আগে কোচিনে কিছুদিন কাজ করেছিলাম। ‘অ্যামাজনে’ কিছুদিন কাজ করার পর ভবিষ্যৎ দেখতে পেলাম না। বন্ধুরা পরামর্শ দিল ‘যা ভাল লাগে তাই কর’। কিন্তু কীভাবে?’ বলেন নিশা। ‘আমি অনেক কিছু করতে ভালোবাসি। কিন্তু তার থেকে উপার্জনের উপায় কী?’ ২০১৩ সালে নিশা বন্ধুর জন্য বিয়ের পোশাক ডিজাইন করেন। আর সেটাই ছিল টার্নিং পয়েন্ট। ভেবে নিলেন, ‘এটাই তো আমি করতে পারি। আর এই ইন্ডাস্ট্রিতে আমার চেনাজানাও ভালো’। দেরি করলেন না আর। সুরাট থেকে ২ জন কারিগর, একজন মূল দরজি এবং একজন তাঁর সহকারি-এই দুজনকে নিয়ে দু বছর আগে নিজের কাজ শুরু করেন। সেই বছর ‘জারিয়া’ নিশার নিজস্ব ডিজাইনে মূলত সিল্কের ওপর দুটি বিয়ের পোশাক বানায়। সেই শুরু। নিশা ঠিক করেন ব্যবসার সঙ্গে সামাজিক দায়বদ্ধতাকেও গুরুত্ব দেবেন।

‘মাইক্রোস্পিন’ এ নিশা এক চাষির ছেলেকে খুঁজে পান। লোনের দায়ে তার বাবা আত্মহত্যা করেন। ‘কিছুদিন আগেও সে পুনেতে নির্মান শিল্পের কর্মী ছিল। ‘মাইক্রোস্পিন’এর ইউনিট খোলার পর মায়ের কথায় সে গ্রামে ফিরে আসে। সাত মাস কাজ করার পর লোন নিয়ে একটা কাইনাটিক লুনা কিনে ফেলে। দেখলাম ‘মাইক্রোস্পিন’ কীভাবে তার জীবন পালটে দিল। হতে পারে আমাদের জন্য লুনা কিছুই না, কিন্তু তার কাছে বিরাট ব্যাপার, নতুন জীবন পাওয়ার মতো। যখন তাকে বললাম বিয়ের পোশাক বানিয়েছি, সে আমাকে বলল, ‘আপনি শৌখিন পোশাক বানান!’ বললাম শৌখিনদের জন্য নয়, অল্প কয়েক জনের জন্য বানিয়েছি। সে বলল, ‘যদি ঐশ্বরিয়া আমাদের পোশাক পড়েন ভাবতে পারেন কত ভালো লাগবে আমাদের? আমরা ঐশ্বরিয়ার একটা কাটআউট রেখে দেব কারখানায়’। বুঝতে পারলাম আমার মাধ্যমে গ্ল্যামার জগতে পা বাড়াতে চায় সে’।

মাইক্রোস্পিনের কর্মী
মাইক্রোস্পিনের কর্মী

‘বাজারে বড় বড় সব খেলোয়াড়রা রয়েছে, তাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এখনই বড় প্রোডাকশনে যাওয়ার কোনও মানে হয় না। বুলধানায় তৈরি ফেব্রিকে উৎসবের পোশাক বানানোর সিদ্ধান্ত নিই। সরাসরি চাষিদের কাছ থেকে সুতো কিনি। ‘জারিয়া’য় যা বিক্রি হয় তার লভ্যাংশের ১০শতাংশ যায় ‘মাইক্রোস্পিন’ এ। এই সবকিছুর একটাই কারণ, তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং ভরসা তৈরি করা’। আর এভাবেই ‘ফার্ম টু ফ্যাশন’-নিশার ক্যাম্পেইনিং শুরু হয়। ‘চাষিরা সুতো বুনে যে কাপড় বানায় সেটা দিয়ে ডিজাইনার পোশাক তৈরি করি। ব্যবসায়ীদের মধ্যে একটা ধারণা চালু আছে-সুতি হলেই লাভজনক। কিন্তু আমি আরেকটা ফ্যাবইন্ডিয়া বা ওয়েস্টসাইড বানাতে চাই না’। বেঙ্গালুরুর ফ্যাশন উইকে নিশার ব্র্যান্ড ‘জারিয়া’র আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়। তরুণ উদ্যোক্তার এই যাত্রা ছিল দারুণ এক্সাইটিং। ‘নতুন হিসেবে নিরাপত্তাহীনতা ছিলই। যখন হোটেলে কাজ করতাম বুঝতে পারতাম কলেজে যা শিখেছি কিছুই কাজে আসবে না। এবং আমার মনে হয়, সব ক্ষেত্রই একই অবস্থা। মনে মনে ভাবতাম ফ্যাশন ডিজাইনে আমার কোনও ডিগ্রি নেই, অভিজ্ঞতা নেই। বড় বড় ডিগ্রিধারী, বছর বছরের অভিজ্ঞতা সম্পন্নদের সঙ্গে লড়াইয়ে টিকে থাকতে পারব তো? যখন শুরু করি, আস্তে আস্তে প্যাটার্ন তৈরি করা, সেলাই, চাষ, সুতো তৈরি, কাপড় বোনা সবটাই বুঝতে পারি। একেবারে সামনে থেকে দেখে দেখে সব শিখেছি। কখনও বলছি না আমি একেবারে পেশাদার। কিন্তু যেহেতু আমার উৎসাহ আছে, হাতে কলমে শিক্ষা আছে, এবার আমি আমার ব্র্যান্ড লঞ্চের জন্য তৈরি’, বলেন নয়া উদ্যোক্তা নিশা।

নিশা এবার ওয়েবসাইটে অনলাইনে ব্যাবসা ছড়িয়ে দিতে চান। সঙ্গে খুচরো ব্যবসাও চলবে। স্বপ্ন রয়েছে ব্রিক অ্যান্ড মর্টার শপ (একটা বিল্ডিংয়েই কারখানা,দোকান একসঙ্গে) করার। কিন্তু আগামী কয়েক বছরে তিনি আরও বাস্তব দিক নিয়ে ভাবতে চান। ‘প্রথম লক্ষ্য ব্র্যান্ড লঞ্চ করা। চাই প্রতি তিন মাসে এক একটা কালেকশনের ৩০-৪০ ‌টা ডিজাইন যেন বিক্রি হয়। বিনিয়োগকারী খুঁজছি। কিন্তু বেশিরভাগই সন্দেহপ্রবণ। কেউ কেউ বলছেন সুতির জিনিসের এত দাম কেন। আসলে মানুষের শ্রমের কোনও দামই কিন্তু দেওয়া হচ্ছে না। চাষ থেকে বোনা, কঠিন কাজ। যে কাপড় তৈরি হয় স্বাভাবিকভাবে সেটিও মূল্যবান। ফলে সুতি হলেই দাম কম, এই ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে’।

নিশার পুরনো সিল্ক কালেকশানের বেশিরভাগটাই বিক্রি হয়ে গিয়েছে। এবার সুতি নিয়ে তাঁর এক্সপেরিমেন্ট একটু খরচ সাপেক্ষ। ‘হাজার মিটারের অর্ডার একসঙ্গে পেলে কারিগরকে দশগুন খাটিয়ে হ্যান্ডলুমে (হস্ত চালিত তাঁত) কাজ করানোর কোনও মানে হয় না, তার চাইতে পাওয়ারলুম অনেক বেশি কার্যকর’। এর ফলে নিশার মতো সুক্ষ প্রডাক্ট তৈরির সুযোগ পাওয়া যায়। ‘হাতে বোনা ফেব্রিকের তফাৎ বোঝা যায়। আমি ওই ফেব্রিকেই কাজ করতে ভালোবাসি। হাতের বুননের পোশাক কিনতে একটা বড় অংশের ক্রেতা মুখিয়ে থাকেন’।

উদ্যোক্তা হিসেবে নিশার বড় চ্যলেঞ্জ কারিগর সামলানো। এটা তাঁর সবচেয়ে বড় শিক্ষা, অনেক উদ্যোক্তা বছরের পর বছর নিয়ে নেন শেখার জন্য। ‘তাদের কাজের আনা বেশ কঠিন’, স্বীকার করেন নিশা। ‘নতুন সন্তান এলে বহু দূরে বাড়িতে যেতেই হবে, পুজো হোক বা অন্য কোনও উৎসব, আমার কাজের গুরুত্ব তাদের বোঝনো দায়। তারা বলেন, ‘এটাই তাঁদের জীবন, এটাই তাদের প্রাধান্য’’। নিশার প্রথম দরজি বেঙ্গালুরু ছেড়ে মাইসোরে ফিরে যান। দুমাসের জন্য তাঁর কোনও পাত্তা পাওয়া যায়নি। পরে নিশা তাঁর সন্তানের জন্মের খবর পান। ‘বললাম সন্তান, স্ত্রীর জন্য জায়গা করে দেব। বিনিময়ে কারিগরের উত্তর ছিল, ছোট বাচ্চা আর বউ নিয়ে অত দূরে নতুন শহরে তাঁর পক্ষে থাকা সম্ভব নয়’। এটা কখনই বাস্তব হতে পারে না। ‘এই সমস্যাগুলি আমাকে সামলাতে হয়েছে। এটাই তাদের রেওয়াজ। শেষ পর্যন্ত একটা টিম তৈরি করি, যাদের সঙ্গে কাজ করছি। সেই একই সমস্যা এখনও রয়ে গিয়েছে’। নিশা বুঝতে পারেন, কখনও সংগঠিত ক্ষেত্র কাজ করার অভিজ্ঞতা নেই যাদের, শিক্ষা নেই, গরিব গ্রামের লোকদের কাছ থেক তিনি যেভাবে ব্যবসা চালাবেন সেভাবে তারা কাজ করবে তা আশা করতে পারেন না। ‘তার চাইতে কারিগররা যেভাবে অভ্যস্ত তাতে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া ভালো’, বুঝতে পারেন নিশা। আরও আছে। এখনও অনেক কারিগর আছেন মহিলাদের আদেশ মানতে রাজি নন। অন্যান্য কারুশিল্পের মতো এটাও একেবারেই পুরুষ শাসিত সেক্টর। ‘স্ত্রীদের কাজে নিয়ে আসার ব্যাপারটা তারা মানতে পারেন না’, হাসেন নিশা। ‘তাই অন্য মহিলারা কাজে এলে তারা ঠিক মেনে নিতে পারেন না। তাদের বক্তব্য, অনেক বছর ধরে তাদের মতো করে এই কাজ করে আসছেন। মানুষ পছন্দ করছে, কিনছেও’। পুরনো ধারণা নিয়ে পুরনো অনুন্নত যন্ত্রে কাজ চালিয়ে যেতে তারা বেশি স্বচ্ছন্দ্য।

‘আমার বয়েস কম। আমি চাই যেভাবে আমি ভাবি সেভাবে তারা কাজ করবে। কখনও কখনও তারা আমাকে গুরুত্ব দেয় না বটে, তার জন্য কড়া হতে হয়। আমি জানি কোথায় সীমারেখা টানতে হয়, কীভাবে পা ফেলতে হবে’।

ব্যবসা শুরু করায় সবচেয়ে বড় বাধা কী? ‘আলসেমি’। হেসে বলেন নিশা। ‘সবকিছু সহজ করে নেওয়ার একটা প্রবণতা থাকে, সবই আমার-এই ভেবে। কিন্তু ডেডলাইন আছে, ক্লায়েন্টকে জবাব দিতে হবে। নিজের জন্য কাজ করা সবচাইতে কঠিন, কারণ আরও অনেকের জীবন নির্ভর করছে তোমার ওপর’। কিন্তু এটাই নিশা পছন্দ করেন। এই কাজটাই তাঁর মধ্যে বিশ্বাস আনে, যারা তাঁর খদ্দেরদের কাপড় যোগান দিচ্ছেন তাঁরা তাদের মূল্য পাবেন।