বিহার ভোট থেকে স্টার্ট-আপদের শিক্ষণীয় ৭টি বিষয় (লিখছেন অতিথি প্রবন্ধকার ললিত বিজয়)

0

বরাবরই দেখে আসছি, বিহার ভোট মানেই ভরপুর নাটক আর টানটান উত্তেজনা। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। বরং আগের চেয়ে কিছুটা অংশে বেশিই ছিল। কারও জন্য লড়াইটা ছিল সম্মানের, কেউ আবার ফিরে আসার মরিয়া চেষ্টায় 'কামব্যাক'-এর লড়াই করছিলেন, কারও কারও কাছে ছিল শুধুই টিকে থাকার লড়াই। এক মাস ব্যাপী এই 'ভোট উৎসব'-এর সঙ্গে কুম্ভমেলার খুব একটা কিছু তফাত চোখে পড়েনি। আর আমার উৎসাহটা ছিল ঘন ঘন বদলাতে থাকা স্ট্র্যাটেজি আর তার ফলাফলের জন্য। এবারের বিহার নির্বাচন কিন্তু শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ছিল একেবারে 'unpredictable'। রেজাল্টের দিন যে আসলে কী হবে কেউ বুঝতে পারছিল না। এক একজনের মনে হচ্ছিল এক এক দল জিতবে। যাই হোক, সে সব এখন অতীত। সব জল্পনার অবসান ঘটিয়ে ফল ঘোষণা হয়ে গিয়েছে। এবার পালা পুরো বিষয়টার চুলচেরা বিশ্লেষণের। কী কী শিখতে পারলাম আমরা, সেটাই আসল। আজকের প্রবন্ধে আলোচনা করব এমনই সাতটি বিষয় নিয়ে, যা বিহার ভোট থেকে স্টার্ট আপগুলির শেখা উচিত।

১. স্বপ্ন দেখুন...সফল হতে বাধ্য

যেকোনও লক্ষ্যে পৌঁছনোর এটাই প্রথম শর্ত। আপনি কিছু পেতে চাইলে সেই ছবিটা কল্পনা করতে হবে। স্বপ্ন দেখা এবং সেই স্বপ্নের উপর বিশ্বাস রাখা - সেটাই আপনাকে স্বপ্নপূরণে সাহায্য করবে। যদিও স্বপ্ন দেখলেই কোনও কিছু বাস্তবে পরিণত হয় না। কিন্তু এর থেকে আপনি ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জগুলোর মুখোমুখি হওয়ার মানসিক শক্তি পাবেন। এবার ভোটের মহাজোট দেখিয়ে দিয়েছে যে তাঁরা নিজেদের স্বপ্নের উপর কতটা ভরসা করেছিলেন। গণনা শুরুর অনেক আগেই লালুপ্রসাদ যাদব ঘোষণা করে দিয়েছিলেন, তাঁরা প্রায় ১৯০টি আসন পাবেন। যদিও তাঁকে কেউ বিশ্বাস করেনি। এগজিট পোলেও সেরকম কোনও লক্ষণ দেখা যায়নি। যদিও সেই সব হিসেবকে ভুল প্রমাণিত করেছেন লালু-নীতিশ। অর্থাৎ আপনি যদি কঠোর পরিশ্রম করেন এবং আপনার চোখে বড় স্বপ্ন থাকে, তা সফল হবেই।

২. মানুষের কাছে থাকুন...হেডলাইনে নয়

খবরের শিরোনামে থাকতে সকলেই ভালোবাসেন। আমাদের অত্যন্ত প্রিয় স্টার্ট আপ দুনিয়াও তার ব্যতিক্রম নয়। এখনকার দিনে তো উদ্যোগপতিরা সর্বদা সকলের নজরে পড়তে চান। ব্লগ, সংবাদপত্র বা যেকোনও সংবাদমাধ্যমের খবরে উঠে আসতে চান। এতে কোনও ভুল নেই। কিন্তু সমস্যা তখন দেখা দেয় যখন আমাদের বুনিয়াদ শক্ত থাকে না। শুধুমাত্র শিরোনামে উঠে আসার জন্য আমরা নিজেদের ক্ষমতার থেকেও বেশি কিছু করার কথা ভাবতে শুরু করি। মিডিয়ার নজর কাড়তে পারলে আমাদের সমস্যার সমাধান হবে না। সেটা আমরা বিহারের নির্বাচনে স্পষ্ট দেখতে পেয়েছি। এবার বিহার ভোটে সংবাদমাধ্যমের প্রচারের আলোর পুরোভাগে ছিল এনডিএ। চারিদিকে তাদের বড় বড় হোর্ডিং, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী তাঁদের প্রচারের মুখ্য ভূমিকায় - কিন্তু এসবের ফল হল ইঙ্গিতপূর্ণ 'হার'। কেন? কারণ তাদের গোড়ায় গলদ ছিল। আপনাকে অন্য সব কিছুর চেয়ে আপনার কাজের পরিধিটা সবার আগে বুঝতে হবে। আপনাকে সেই জায়গাটা ধরতে হবে যা আপনার ক্রেতাদের উৎসাহ যোগাবে। তাঁদের সংস্পর্শে থাকুন। ঠিক যেমনটা লালু, নীতিশ করেছেন।

৩. কেউ অপরাজেয় নয়

বড় প্রতিযোগীতায় ভয় সবসময় ছিল, থাকবে। কিন্তু ভয় দিয়ে কোনওদিন কিছু জয় করা যায় না। ২০১৪-র সাধারণ নির্বাচনে বিশাল জয়ের পর বিজেপি ভারতের রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে উঠেছিল। তারা যেকোনও প্রতিযোগীতায় ছিল সবার চেয়ে এগিয়ে, অন্য যেকোনও দলের চেয়ে তারা ছিল অনেক বেশি আকর্ষণীয়, পুঁজি এবং ক্ষমতা - তাদের দুই-ই বেশি, নরেন্দ্র মোদির মতো একজন দুর্ধর্ষ সেনাপতি, অমিত শাহের মতো তীক্ষ্ণ বুদ্ধির স্ট্র্যাটেজিস্ট, এত জনসমর্থন - এসব তাদের মনে ধারণা করে দিয়েছিল যে তাদের কেউ হারাতে পারবে না। কিন্তু দিল্লি এবং বিহার চোখে আঙুল দিয়ে সেই ধারণা ভ্রান্ত প্রমাণ করে দিল।

৪. মৌলিক বিষয়গুলিতে জোর দিন

প্রাথমিক বা মৌলিক বিষয় নিয়ে বারবার কথা হচ্ছে। কিন্তু জিনিসটা আসলে কী? আপনার মনে হতে পারে মার্কটিংয়ের বাজেট , একটা ভালো সেল্‌স টিম বা সম্ভাব্য গ্রাহক কারা হতে পারেন - এই বিষয়গুলো বুঝতে পারাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমার বিশ্বাস, এর কোনওটাই ঠিক নয়। বিহার ভোটে তো এনডিএ-র মধ্যে এর সবকটাই ছিল। একজন দক্ষ নেতা, চারিদিকে লক্ষ লক্ষ পোস্টার, প্রচুর মানুষের সমর্থন, সুপরিকল্পিতভাবে ডিজিটাল এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার, প্রচারসভায় বিপুল জনসমাগম। এত কিছু থাকা সত্ত্বেও ভরাডুবি আটকানো যায়নি। আমাদের বুঝতে হবে, গ্রাহকদের প্রতি নজর দেওয়াটাই সবচেয়ে জরুরি। ক্রেতা বা গ্রাহকদের চাহিদা, ব্যবহার বুঝতে হবে। বুঝতে হবে তাদের প্রয়োজন-অপ্রয়োজন। সেই অনুযায়ী কাজে লাগবে এমন প্রোডাক্ট তৈরী করতে হবে, শুধু দেখতে আকর্ষণীয় জিনিস তৈরী করলেই চলবে না। ঠিক এই কাজটাই করেছে মহাজোট। ভোটারদের আগাপাশতলা খুঁটিয়ে বোঝার চেষ্টা করেছে তারা। যার ফল মিলেছে হাতেনাতে।

৫. হাল ছাড়বেন না

সকলেই জানেন, নতুন কিছু শুরু করা কতটা কঠিন। সেই উদ্যোগে ক্ষতির সম্মুখীন হলে তা সামলে ওঠা আরও বেশি কঠিন। কিন্তু একজন সত্যিকারের বিজেতা কখনও হেরে গিয়ে মুখ লুকিয়ে থাকেন না। তাঁরা নিজেদের স্বাচ্ছন্দ্যের জায়গা থেকে বেরিয়ে আসতে জানেন। নতুন এবং আরও ভালো পরিকল্পনার সঙ্গে নতুন করে শুরু করতে জানেন। সুযোগ আসলে তা কাজে লাগাতে জানেন। কারণ, তাঁরা নিজেদের হার থেকে শিক্ষা নিতে পারেন। ভুল শুধরে নিতে জানেন। লালু যাদব ঠিক এই জিনিসটাই আমাদের শিখিয়েছেন। এক দশকের হারের পর, যখন সকলে ধরে নিয়েছিল তাঁর রাজনৈতিক কেরিয়ার শেষ হয়ে গিয়েছে, যখন তাঁর আশপাশের সকলে ধরেই নিয়েছে তিনি আর জিততে পারবেন না, ঠিক তখনই সব 'না'-কে 'হ্যাঁ' করে দিয়ে ফিরে এলেন তিনি। সকলের সব জল্পনাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক আসন নিয়ে বিধানসভার দখল নিয়ে চিনি বুঝিয়ে দিলেন, "এভাবেও ফিরে আসা যায়।" কাজেই সাময়িক ব্যর্থতায় মুষড়ে না পড়ে আগামীর কথা ভাবুন। ভয় না পেয়ে এগিয়ে যান।

৬. ইতিবাচক কথা ভাবুন

আমরা জানি পজিটিভ ভাবনাচিন্তা সাফল্যের ক্ষেত্রে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু জটিল সময়ে সেকথা ভুলে যাই। যুদ্ধক্ষেত্রে যখন নেমেই পড়েছেন, তখন প্রতিপক্ষের দুর্বলতা এবং নেতিবাচক বিষয়গুলিতে ফোকাস কম করে বরং নিজের ইতিবাচক দিকগুলিতে জোর দিন। শুধুমাত্র প্রতিপক্ষের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে আঘাত করলে চলবে না। নিজের ভালো দিকগুলিকেও কাজে লাগাতে হবে। বিহারের বিধানসভা নির্বাচনে এটাই সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। প্রত্যেকটি দল নিজেদের ভালো দিকগুলি তুল ধরার চেয়ে অন্য দলগুলিকে খারাপ প্রমাণ করতে মরিয়া হয়ে গিয়েছিল। প্রচার কর্মসূচিতে কোথাও উন্নয়ন বা বৃদ্ধির কথা উঠে আসেনি। সকলেই গোমাংস, সংরক্ষণ এবং জাতপাতের নোংরা রাজনীতিতে নেমে এসেছিলেন। নেতিবাচক প্রচার কিন্তু আপনার প্রতিযোগীদের চেয়ে আপনারই বেশি ক্ষতি করবে। অন্যকে দুর্বল না ভেবে বরং নিজেকে সবল ভাবুন। নিজের দক্ষতার উপর জোর দিন। কারণ ভালো কাজের বিকল্প হয় না।

৭. নিজের শক্তিবৃদ্ধিতে নজর দিন

সকলেরই কিছু শক্তি এবং কিছু দুর্বলতা রয়েছে। প্রত্যেকেই নিজেদের শক্তি সম্পর্কে কথা বলতেই পছন্দ করেন। কিন্তু শুধুমাত্র কথা বললেই হবে না। সেই বিষয়ে জোর দিতে হবে। অন্যের চেয়ে আলাদা হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে আপনাকে যে বিষয়গুলি সাহায্য করবে, সেগুলি কী করে আরও ভালো করা যায় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। এর উপরই আপনার সাফল্য নির্ভর করবে। লালুপ্রসাদ যাদব এবং নীতিশ কুমার দুজনেই এবার নির্বাচনের আগে সেই বিষয়টি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। সেই কারণে ভোট টানতে তাঁদের লক্ষ্যই ছিল জাতি-নির্ভর ভোট। বিহারি ভোটব্যাঙ্কের একটি ভোটও যাতে হাতছাড়া না হয়, তা নিশ্চিত করেছিলেন তাঁরা। নীতিশ কুমারের প্রচারের উদ্দেশ্যই ছিল নিজেকে স্থানীয় মানুষের উন্নয়নে নিয়োজিত একজন বিহারি নেতা হিসেবে সফলভাবে প্রতিষ্ঠা করা। নীতিশ কুমার নয়, সাধারণ মানুষের কাছে তিনি নিজের পুরনো পরিচয় অর্থাৎ 'সুহাসনবাবু' হিসেবেই পৌঁছেছেন। একইভাবে লালুপ্রসাদের লক্ষ্য ছিল নিজের এলাকার জমি শক্ত করে ধরে রাখা। নিজের মজার বাচনভঙ্গীকে তিনি সাধারণ মানুষের আরও কাছে পৌঁছতে কাজে লাগিয়েছেন। তিনি জানতেন মানুষের কাছে পৌঁছতে তাঁর কথা বলার স্টাইলই হয়ে উঠবে তাঁর হাতিয়ার। আরজেডি কিন্তু একবারের জন্যও বিজেপির মতো সোশ্যাল মিডিয়ায় অ্যাক্টিভ ছিল না। কিন্তু তা সত্ত্বেও তারা বাজিমাত করতে পেরেছে।

জীবনের প্রতিটা ক্ষেত্রই স্টার্ট আপ ব্যবসার মতো। শুধুমাত্র টেক কোম্পানি বা নতুন প্রজন্মের জন্য নয়। সাফল্যের প্রাথমিক শর্তগুলি সকলের জন্যই সমান। এবং সব ক্ষেত্রেই বিজয়ী একজনই হন। আমি আমার চারপাশের প্রত্যেকটি ঘটনা থেকেই কিছু না কিছু শেখার চেষ্টা করি । প্রত্যেকটি অভিজ্ঞতাকেই আমার পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় কাজে লাগানোর চেষ্টা করি। শেষ পযর্ন্ত আমরা সকলেই তো চাই নতুন কিছু শিখতে এবং সেই শিক্ষাকে কাজে লাগাতে, তাই নয় কি?