বিমুদ্রাকরণের আড়ালে আছে যে রাজনীতি

লিখছেন আশুতোষ

0

৮০জনের বেশি মানুষ মরেছেন। সাধারণ মানুষের দুর্গতির অন্ত নেই। অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত, ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থা পঙ্গু হয়ে যাওয়ার উপক্রম। বিশেষজ্ঞরা ও অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, এভাবে কালো টাকা উদ্ধারের সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ। যেটুকু উদ্ধার হবে তা ধর্তব্যের ভিতর নয়। কিন্ত এ সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ক্ষমা চাইছেন না। বিমুদ্রাকরণের পদক্ষেপ থেকে সরে আসারও কোনও লক্ষণ তাঁর নেই।

মোদির এই সিদ্ধান্তটিও প্ররোচনামূলক সিদ্ধান্ত। যদি তাঁর আসল সিদ্ধান্ত এটাই হয় যে, কালো টাকার কারবারিদের তিনি ধ্বংস করতে চাইছেন, সে ব্যাপারে এখনও কোনও আশাও দেখা যায়নি। তাছাড়া, কেন বিমুদ্রাকরণের জন্যে মোদি এই সময়টিকে প্রায় বিনা প্রস্ততিতেই বেছে নিয়েছেন – এটাই সিদ্ধান্তটি প্ররোচণামূলক প্রমাণের পক্ষে যথেষ্ট।

আইডিয়া বাস্তবায়িত করতে মোদির প্রচুর প্রস্ততির দরকার ছিল। কিন্ত একমাস পরেও কারও পক্ষেই বলা সম্ভব হচ্ছে না, যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছে। বরং কাজটা ভাবনাচিন্তা করে করাই হয়নি।

হাওয়ায় এখন ষড়যন্ত্রের নানা তত্ত্ব ভাসছে। এর ভিতর একটি হল ইতিমধ্যে মোদি দুটি শিল্পগোষ্ঠীর কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এখন তাঁর শক্রদের পিছনে হঠাতে বিমুদ্রাকরণের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এটা করে মোদির গা থেকে কালো টাকার কলঙ্ক ধুয়ে ফেলার চেষ্টা করা হতে পারে বলে অনেকেই মনে করছেন। পাশাপাশি, এও বলা হচ্ছে, উত্তরপ্রদেশ লোকসভা নির্বাচনে ৭৩টি আসনে জয়ী হয়েছিলেন মোদি। এই ফলাফলও মোদির ভাবমূর্তিতে একরকম আঘাত হেনেছে। বিমুদ্রাকরণের সিদ্ধান্ত ওই রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনেও প্রভাব ফেলতে পারে।

অভিজ্ঞ মহল এও মনে করছে, মোদি নিজে জানেন নিজের দেওয়া অনেক প্রতিশ্রুতিই তিনি রক্ষা করতে পারেননি। মোদির ভাবমূর্তির এর জেরে যে ক্ষতি হয়েছে, তার ক্ষতিপূরণের চে্ষ্টায় বিমুদ্রাকরণ করা হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

মোদি কালো টাকা দেশে ফেরানোর কথা বলেছেন একাধিক নির্বাচনী বক্তৃতায়। কিন্তু গত আড়াই বছরে নিজের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত ‌করতে বিশ্বাসঅর্জন করবার মতো তেমন কোনও উদ্যোগই তিনি নেননি।

আর একটা তত্ত্ব হল, মোদি জানেন দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির হাল ভাল নয়। ২০১৯ সালে ফের লোকসভা নির্বাচন। দ্বিতীয় বারের জন্যে জয়লাভ করতে দেখানোর মতো লাভদায়ক কিছুই মোদির হাতে নেই। বিমুদ্রাকরণ সেক্ষেত্রে ভাল ফল দেবে বলে মনে করা হয়েছে। অন্যদিকে এও মনে করা হয়েছে, এভাবে মোটা টাকা রাজস্ব আদায় হবে। ভোটের সময় ভোট কিনতে সরাসরিভাবে যা কিনা ভোটারদের একাংশের ভিতর ছড়িয়ে দেওয়া হবে।

তবে নির্দিষ্ট কোনও উত্তর এখনও নেই। তবে একটি্ বিষয় নিশ্চিত যে, রাজনীতিতে এবং সরকারে থাকাকালীন ইন্দিরা গান্ধী যা করে গিয়েছেন, মোদিও সেই ধরনেই চলছেন। ইন্দিরার মতো ম্যাকভেলিয়ান রাজনীতির কৌশল বেছে নিয়েছে‌ন তিনিও। ইন্দিরা যখন কংগ্রেসের তরফে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হলেন, সেইসময় তাঁকে গুঙ্গি গুডিয়া হিসাবে অভিহিত করা হত। বিরোধী নেতাদের ভিতর রামমনোহর লোহিয়ার মতো নেতা তাঁকে গুঙ্গি গুডিয়া হিসাবে আখ্যা দিয়েছিলেন। সেইসঙ্গে আমলাদের একাংশ এবং ইন্দিরার নিজের দলের প্রবীণ নেতাদের একাংশও ইন্দিরাকে এটা বলতেন। সেইসময় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর প্রিন্সিপ্যাল সেক্রেটারি হিসাবে দায়িত্বে থাকা আমলা এ কে ঝা ইন্দিরা সম্পর্কে এই তথ্য জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ইন্দিরা ছিলেন অন্যান্য সাংসদদের চেয়ে অনেকটাই আলাদা ধরনের। সাংসদীয় দলের নেত্রী হিসাবে ইন্দিরাকে নির্বাচিত করার একমাত্র কারণ এই নয় যে তিনি নেহেরু পরিবারের সদস্য। বরং আঞ্চলিকভভাবে তৈরি হওয়া একটি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রিত করছিল তাঁকে।

মোদিকে এইসব সমস্যা পোহাতে হয়নি। মোদি গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন সময় থেকেই নেতা হিসাবে নিজের অধিকারকে সর্বাধিকার দিয়েছেন। নিজের দলের একশ্রেণির নেতা ও আরএসএসের একাংশ মোদির প্রধানমন্ত্রিত্ব নিয়ে তাঁদের রক্ষণশীল মনোভাব দে্খিয়েছেন। এটা মোদি নিজেও মনে করেন। সেইসময় তিনিও গুঙ্গি গুডিয়া হিসাবে অভিহিত হয়েছেন। তবে মোদি বরাবরের একজন শক্তিশালী নেতা। প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে ভালোবাসেন। এক সময় পশ্চিমি কয়েকটি দেশ মোদিকে একজন ভিলেনমার্কা ভারতীয় রাজনীতিক বানিয়ে তাঁকে ভিসা দিতে অস্বীকার করেছে। এ সত্ত্বেও জনতার সমর্থন নিয়ে নিজেকে উন্নয়নের কাণ্ডারী দেখিয়ে মোদি নিজের জায়গা তৈরি করে নিয়েছিলেন।

কিন্তু এরপর মোদির প্রধানমন্ত্রীত্বের আমলে যা কিছু ঘটেছে, তাতে তাঁকে দ্বিতীয়বার ক্ষমতাভিষিক্ত করার পক্ষে যথেষ্ট যুক্তি নেই। এখানেই তাঁর ভিতর ইন্দিরা ছায়া দেখা যাচ্ছে। ভবিষ্যতে সমস্যায় পড়তে পারেন এটা আঁচ করে মোদিও খানিক জুয়া খেললেন।

ষাটের দশকের শেষাশেষি ইন্দিরা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন, যদি নীলম সঞ্জীবা রেড্ডি দেশের রাষ্ট্রপতি হন, তাহলে তাঁর পক্ষে প্রধানমন্ত্রী হিসাবে কাজ চালাতে হোঁচট খেতে হবে। সেইসময় ইন্দিরাও জুয়া খেলেছি্লেন। কংগ্রেসের নির্বাচিত সতীর্থদের সেই সময় ইন্দিরা ভি ভি গিরিকে সমর্থন করতে নির্দেশ দেন। ভি ভি গিরি রাষ্ট্রপতি পদে একজন স্বাধীন প্রার্থী হিসাবে দাঁড়িয়েছিলেন। এই পদক্ষেপটি নিজের দল ও দলীয় নেতৃত্বের প্রতি ইন্দিরার ঘুরে দাঁড়ানোর একটি নমুনা। ইন্দিরার এই পদক্ষেপ স্মরণে রাখার মতো একটি রাজনৈতিক পদক্ষেপও।

এরপর গিরি যখন প্রথম রাউন্ডে জিততে পারলেন না এবং এর ফলে খানিকটা বিমর্ষ হয়ে পড়েছিলেন, সেইসময় ইন্দিরা তাঁর বন্ধুদের কাউকে কাউকে বলেছেন, উদ্বেগের কোনও কারণ নেই। এই পরিস্থিতিতে আমাদের কঠিন লড়াই করতে হবে। সে জন্য আমি তৈরিই আছি।

শেষপর্যন্ত গিরি জয়লাভ করেছিলেন। এর জেরে পরে কংগ্রেসের ভিতর ভাগাভাগি হয়। ইন্দিরাকে প্রধানমন্ত্রিত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ারও চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু ইন্দিরা জয়লাভ করেছিলেন গরিষ্ঠ স্ংখ্যক দলীয় সাংসদের ভোটে। ইন্দিরা নিজেকে যতটুকু ভেবেছিলেন তার চেয়ে বেশি্ শক্তির পরিচয় দিয়েছিলেন ইন্দিরা।

ইন্দিরা নিজে তাঁর এই লড়াইকে একটা আদর্শগত রূপ দিয়েছিলেন। সিন্ডিকেটের বেশিরভাগ সদস্য ছিলেন দক্ষিণপন্থী। মোরারজি দেশাই, এস নিজলিনগাপ্পা, কে কামরাজ, এস কে পাটিল, অতুল্য ঘোষ একসময় প্রতাপশালী ছিলেন। কিন্তু সে অতীতে।

ইন্দিরা সেইসময় স্বকীয়তা সৃষ্টি করেন। তিনি জানতেন, জওহরলাল নেহে্রুর কন্যা হিসাবে তাঁর প্রতি বামপন্থীরা সহানুভূতিশীল। সেটা ছিল ঠাণ্ডা যুদ্ধের যুগ। বিশ্ব সেইসময় আদর্শগতভাবে দুটি শিবিরে বিভক্ত। এ দেশের বামপন্থীরা সোভিযেটের প্রভাবে চলছেন। সোভিয়েট তখন ক্ষমতাশালী। ইন্দিরা তখন সমাজতন্ত্রের পথ বেছে নিলেন। ইন্দিরা তখন দুটি ক্ষেত্রে কাজ করতে থাকলেন – ব্যাঙ্ক রাষ্ট্রায়ত্তকরণ ও ব্যক্তিগত সম্পত্তির বিলোপসাধন।

পরে যখন এর জেরে ইন্দিরাকে সরানোর জন্যে ষড়যন্ত্র শুরু হয়, সেইসময় ইন্দিরা সংসদে তাঁর মেয়াদ ফুরানো পর্যন্ত অপেক্ষা করেননি। বরং, নির্বাচনে গিয়েছিলেন। যার ফলাফলে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যা গরিষ্ঠতা নিয়ে জয়লাভ করেন। ইন্দিরার স্লোগান ছিল, ওঁরা আমাকে সরাতে চাইছে। আর আমি চাইছি দারিদ্র হঠাতে। এরপর অনিশ্চয়তার যুগের অবসান হল। লক্ষ্য পূরণের ক্ষেত্রে ইন্দিরা নিজেই নিজের শিক্ষিকা হয়ে উঠলেন।

মোদিও এখন একই কৌশল নিয়েছেন। তিনি চেষ্টা করছেন কালো টাকার বিরুদ্ধে তাঁর যুদ্ধটি জনসমক্ষে আনতে। মোদি এও দেখাতে চাইছেন, তাঁর এই প্রয়াস সত্ত্বেও বিরোধীরা তাঁর সঙ্গে তিনি দুর্নীতি দূর করতে চান। এদিকে বিরোধীরা তাঁকে সরিয়ে দিতে চাইছেন। মোদির সৌভাগ্য যে, নিজের দলকে পাশে পেয়েছেন। দলীয় স্তরে তাঁর বিরুদ্ধে কেউ মুখও খুলছেন না। এমনকি কোনও ফিসফিসানিও নেই।

বিমুদ্রাকরণের জেরে মোদি ইতিমধ্যেই বিরোধীদের প্রচারে হেনস্থা হয়েছেন। সংসদের ভিতর ও বাইরে – দুটি ক্ষেত্রেই এই পরিস্থিতি। তবে তাঁর দলের প্রবীণ নেতারা তাঁর পক্ষে রক্ষণাত্মকভাবে কথা বলছেন। সেক্ষেত্রে মোদির এসবে পাত্তা না দিলেও চলে। কিন্ত যে কোনও কারণেই হোক না কেন, মোদির কৌশল কাজ করছে না। মোদি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ৫০দিনের ভিতর যা করণীয় তা তিনি করবেন। জাতীয় স্বার্থে পুনর্গঠনের কথাও বলেছেন তিনি। সেইসঙ্গে বিমুদ্রাকরণে্র জেরে যে দুর্গতি সইতে হচ্ছে, তাঁর সঙ্গে জাতীয়তাবাদী গর্ববোধের যোগসূত্র তৈরি করছেন মোদি।

এদিকে দুর্গতির কোনও অন্ত নেই। ৫০ দিন অনেক দূরের। সরকার প্রতিদিনই তাদের নির্দেশাবলী ও লক্ষ্যের বদল ঘটাচ্ছে। আর মোদি এখন ক্যাশলেস সোসাইটি নিয়ে বলতে আরম্ভ করেছেন। আর একটি স্বপ্ন বেচছেন তিনি।

আসলে মোদি যেটা বুঝতে পারেননি সেটা হল, স্বপ্ন বেচা যায় তখনই যদি ওই স্বপ্নের কোনও সদর্থক সাহস থেকে থাকে। অথবা উদ্দেশ্যের ভিতর থাকে সততা। বিমুদ্রাকরণ ব্যর্থ হয়েছে। এটা অন্য একটি সমান্তরাল ব্যবস্থা ইতিমধ্যে সৃষ্টি করেছে। একশ্রেণির দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যাঙ্ক অফিসার ও দালাল শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিক এবং তাঁদের সাকরেদরাও চাঙ্গা হয়েছে। এঁরা তাঁদের কালো টাকা প্রকাশ্যেই সাদা টাকায় রূপান্তরিত করছেন। সরকার সবমিলিয়ে অসহায়। অথচ, মোদি নিজেকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে একজন যোদ্ধা হিসাবে দেখাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এও দুর্ভাগ্যজনক যে, তাঁর নিজের দলও দেশের শীর্ষ আদালতের নির্দেশ সত্ত্বেও দলীয় তহবিলের ৮০ শতাংশ টাকার হিসাব দিতে এ পর্যন্ত নারাজ।

তাছাড়া, মোদি নিজেও লোকপাল নিয়োগে নারাজ। শীর্ষ আদালত এখন এব্যাপারে প্রশ্ন তুলছে। মোদি সংসদে মুখোমুখি হওয়ার মতো সাহসও দেখাতে পারে‌ননি। তিনি কেবলমাত্র সংসদের বাইরে যা কিছু কথাবার্তা বলছেন। আর তাঁর সমর্থকেরা সেইসব সাধারণ মানুষকে নিয়ে মস্করা করছেন, য়াঁরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে ব্যাঙ্কের লাইনে ঠায় দাঁড়িয়ে আছেন।

ইন্দিরা শেষপর্যন্ত জয়ী হয়েছিলেন। কেননা দেশের সাধারণ মানুষের বিশ্বাস ও আস্থা তিনি অর্জন করতে পেরেছিলেন। মোদি তা পারেননি। বরং তিনি অবিশ্বাস অর্জনের মতো কাজ করেছেন।

(Disclaimer: The views and opinions expressed in this article are those of the author and do not necessarily reflect the views of YourStory)