সাফল্যের স্বাদই এগিয়ে দিয়েছে মৌমাকে

0

২০১৬ বিশ্ব টেবলটেনিসে ভারতীয় দলের সোনা জয়ের অন্যতম কারিগর মৌমা দাস। ৩২ বছরের এই প্যাডলারের সাফল্যের তালিকাটা বেশ লম্বা। কিন্তু সাম্প্রতিকতম সাফল্য তাঁকে যেন ক্লাউড নাইনে পৌছে দিয়েছে। ইওর স্টোরির পাঠকদের জন্য আনপ্লাগড মৌমা। কথা বললেন আমাদের প্রতিনিধি দেবলীনা দত্ত।

জয়ের পর জয়... তারপর ফের জয়ের প্রস্তুতি... এই জয়ী হওয়ার ধারাবাহিকতাটা আপনার আশৈশব অভ্যেসে পরিণত হয়ে গিয়েছে। মৌমা, আপনি আপনার কথা বলুন। কীভাবে শুরু করলেন এই জয়যাত্রা? জিততে জিততে কী কী শিখলেন, হারতেই বা কেমন লাগে কখনও অনুভব করেছেন? লড়াইয়ের মৌলিক শর্ত সব লড়াইয়েই এক তাই আমাদের পাঠকদের জন্যে আপনার অভিজ্ঞতা আমাদের ভীষণ জরুরি। 

দেখুন হেরে যাব একথা ভাবতেই খারাপ লাগে। আর ঠিকই বলেছেন অনেক জিতেছি। কিন্তু জয়গুলো একা আসেনি। অনেক পরাজয়ের সঙ্গে এসেছে। অনেক ভুল ডেলিভারির গ্লানির পর এসেছে। কিন্তু লড়াই যে করে সে জানে ভিতরে ভিতরে জেতার নেশা চেপে যায়। তখন নির্ভুল হওয়ারও আপ্রাণ চেষ্টা করতে হয়। সহজাত প্রতিবর্তের মতই আমার হাত যেন বলের গতির সঙ্গে লড়তে থাকে। এটা একা আমার নয়... সব টিটি প্লেয়ারেরই একই রকম হয়। সমস্ত শরীর জয়ের ছন্দে দুলতে থাকে। কেবল জয় ছাড়া আর কিছুই তখন তৃপ্ত করতে পারবে না যেন। ভালোই বলেছেন, আশৈশব অভ্যেস। হ্যাঁ... তাই। আমার ক্ষেত্রে অন্তত তাইই। এবং সত্যি কথা বলতে কি আমি এই খেলাটা ভালোবেসে ফেলেছিলাম কারণ আমি জেতার স্বাদ পেয়েছিলাম সেই ছোটোবেলা থেকেই। 

আসলে আমি শুনেছি আমি নাকি খুব দুষ্টু ছিলাম। বাবা মা চেয়েছিল দুষ্টু মেয়েটাকে বন্দি করতে। তাই টেবিল টেনিসে ভর্তি করে দিয়েছিল। ভেবেছিলো তাহলে ফিজিকাল অ্যাক্টিভিটি হবে, ক্যালোরি বার্ন হবে আর আমাকে একটু নিয়মানুবর্তী করা যাবে। নারকেলডাঙার যে ক্লাবটাতে আমাকে ভর্তি করানো হয়েছিল সেখানে কাকারও খুব দহরম মহরম ছিল। ফলে ফাঁকি দেওয়ারও উপায় ছিল না। ১৯৯৩ সালে জয়ন্ত পুশিলালের কাছে হাতে খড়ি হয়। যখন পারফর্ম করতে শুরু করেছিলাম, তখন আমার বয়স ছিল বড়জোড় আট-নয়। তাই টেনশন কী জিনিস তা নিয়ে কোনও ধারণাই ছিল না। তাই তখন পারফর্ম করাটা অনেক সহজও ছিল। জীবনের প্রথম টুর্ণামেন্ট রাইটার্স বিল্ডিং ট্রফি। পুরস্কার চকোলেট। খেলাচ্ছলে ‌যে খেলা শুরু করলাম তাই এখন জীবন। যদিও জয়ন্ত পুশিলালের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ছেড়ে ২০১৩ থেকে অভিজিত রায় চৌধুরীর কাছে শিখছি। যত বড় হয়েছি ততই দায়িত্ব, প্রত্যাশা বেড়েছে। 

ব্যক্তিগত কারণে দু বছর সার্কিটের বাইরে থাকতে হয়েছিল। কিন্তু এখন শুধুই এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছি। পিছনে আর ফিরে দেখা নয়। তাই জয়টা আমার দরকার। নিজেকে আরও সংহত আত্মবিশ্বাসী রাখতেই দরকার। পাশাপাশি বলব কোচিংটাও খুব জরুরি। দেশি বিদেশি সব কোচই তাঁদের মতো করে ভালো। তবে ২০১৪ সালে জার্মানির কোচের হাত ধরেই যেন টেবলটেনিসে পুর্ণজন্ম হয়েছিল আমার। সে বছর কমনওয়েলথ গেমসে খেলার সুযোগ পাইনি। ভারতের সেরা ষোল জনের কোচিংয়ের দায়িত্বে ছিলেন পিটার এঞ্জেল। তাঁর টিপস ‌যেন আমূল বদেল দিল। কিছু টিপস, পসচারে কিছু পরিবর্তন আনতেই বাড়ল স্পিড, অ্যাকিউরেসি। 

ফলে আপনি ট্যালেন্টেড হতেই  পারেন কিন্তু ভুলবেন না আপনারও গ্রুমিংয়ের প্রয়োজন। আপনারও সাপোর্ট সিস্টেম দরকার। অনেক খুঁটিনাটি বিষয় থাকে যা আপনার মেন্টর আপনার থেকে দুকদম এগিয়ে দেখতে পান। ফলে তাঁর অভিজ্ঞতা আপনাকে স্পিড. অ্যাকিউরেসি তো দেবেই তার সঙ্গে ফাউ পাবেন আপনার ভুল শুধরে নেওয়ার টিপস। যা আপনাকে সাফল্য এনে দেবে। বিশ্বাস করুন জয়ী হওয়ার আনন্দই অন্যরকম।

বিদেশি খেলওয়াড়দের সঙ্গে আমাদের দেশের খেলওয়াড়দের মৌলিক পার্থক্য আমরা যাঁরা খেলাটা দেখি তাদেরই চোখে পড়ে। আপনি দুধরণের প্রতিপক্ষকেই মোকাবিলা করেছেন। আপনার কী মনে হয়েছে? পার্থক্য আছে? থাকলে কোথায়?

এটা ভালো প্রশ্ন। কারণ মুখে যাই বলি আমি জানি আমাদের মনোসংযোগ আর ওদের অধ্যবসয় দুটো যেন দুখাতে বইছে। বিশ্বাস করবেন না ওঁদের ধ্যানজ্ঞান সবই শুধুই খেলা। মানে ‌যে যেটা করে শুধুমাত্র সেটাতেই তাঁরা ফোকাস করে থাকে। কোরিয়া-চিনে প্যাডলাররা সব বোর্ডিংয়ে থাকে। সারা দিনে বিভিন্ন সময়ে শুধুই অনুশীলন করে। যেন জীবনের মূলমন্ত্র- প্র্যাকটিশ। অনেকগুলো কারণ এর সঙ্গে যুক্ত। খেলওয়াড়দের আর কিছু করার কথা ভাবতেই হয় না। রুটিরুজির ব্যবস্থা হয় সরকার নয় স্পনসর করেই দেয়। ফলে পুরো মনটা খেলায় দিতে পারেন ওঁরা। ছোটোবেলা থেকেই সেভাবেই তাই তৈরিও হতে পারেন উন্নত বিশ্বের খেলওয়াড়রা। 

কিন্তু এখানে, যাঁর খেলাটা প্যাশান তাঁকেও লড়তে হয় দুবেলা দুমুঠোর জন্যে তারপর খেলা। এখানেই পার্থক্যটা তৈরি হয়ে যায়। এই সব কিন্তু পরন্তু শর্ত না থাকলে একই মানের পারফরমেন্স দিতে পারতাম আমরাও। ফলে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার এত অভাব আমাদের দেশে যে আমরা অনেকটা পিছিয়ে থেকেই লড়াইয়ের ময়দানে নামি। আর জিততে পারলে দ্বিগুণ আনন্দ পাই। 

বিয়ের পর খেলছেন। সচরাচর বাঙালি মেয়েদের বিয়ের পর সব থমকে যায়। কাউকে কাউকে চাকরি ছাড়তে হয়। পড়াশুনোয় ইতি পরে। পুরুষের এই প্রাধান্যের সমাজে নারীকে সবার আগে সব যেন ছাড়তে হবে এটাই নিয়তি। সেখানে দাঁড়িয়ে আপনি খেলছেন। ডর্টমুন্ড, প্যারিস, শউ ঝাউ, কুয়ালামপুর ঘুরে বেড়াচ্ছেন। রহস্যটা কী?

বাঙালি মেয়েদের সমস্যাটা আমি বুঝি। অনেক ক্ষেত্রেই এটা দেখেছি। কিন্তু আমি সৌভাগ্যবতী। ২০১২ তে বিয়ে হয়েছ, তাও অ্যারেঞ্জড ম্যারেজ কিন্তু আমার দুই পরিবার যেন আমার দুই হাত। অসম্ভব সার্পোটিভ। নাহলে দুবছর ব্রেকের পর এই প‌র্যায়ে এভাবে ফিরে আসা জাস্ট সম্ভব ছিল না। আমার শ্বশুরবাড়ির সবাই আমাকে প্রেরণাই দিয়েছে। কখনও বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। ওরা বিশ্বাস করে আমি জিততে পারব। আমি হেরে গেলেও ওরা সাহস দেয়। আর কী চাই বলুন তো!

তাহলে পরবর্তী লক্ষ্য কী?

জেতার জন্যে খেলব। হারলেও ভেঙে পড়ব না। কিন্তু আরও একবার অলিম্পিকে খেলার সুযোগ চাই। কমনওয়েলথে টিটিতে ভারতসেরা হয়েছি। কিন্তু চাই অলিম্পিকে আরও একবার ঝলসে উঠতে। তাই এপ্রিলের হংকংয়ের টুর্নামেন্টের দিকেই তাকিয়ে আছি।