মেঘার প্যাশন জুড়ে দিয়েছে নাইরোবিকে কলকাতার সঙ্গে

1

PWC র মতো সংস্থার কর্পোরেট কালচার, নিরাপদ চাকরি ছেড়ে হোটেল ব্যাবসায় নামার সাহস দেখিয়েছিলেন বছর আঠাশের মেয়েটা। মেঘা আগরওয়াল। শরৎ বোস রোডে ‘দ্যা কর্নার কোর্টইয়ার্ড’ নামে ছোট্ট বুটিক হোটেলের মালকিন।

জন্ম মুম্বাইয়ে হলেও মেঘা ও তাঁর পরিবার এখন কলকাতার বাসিন্দা। নানা শহরে চাকরি করেছেন মেঘা। শেষ পর্যন্ত কলকাতায় এসে মনে হল এবার দীর্ঘদিন মনের কোণে লুকিয়ে থাকা স্বপ্ন পূরণ করতে হবে। আগরওয়ালদের হোটেলের ব্যবসার ইচ্ছে বহুদিনের। মেয়ের হাত ধরে শুরু হল তার বাস্তব রূপায়ণ। কোথায় করা যায় হোটেলটি? শুরু হল জায়গা খোঁজা। ভবানীপুরে ১৯০৪ সালে তৈরি করা এক জমিদার বাংলো কিনে রেখেছিলেন মেঘার কাকা। ওই বাড়ি হোটেলের জন্য কেমন হয়? কাকার প্রস্তাব মন্দ নয়, মনে হল মেঘার। ‘অদ্ভুত সুন্দর জায়গা। অত বছরের পুরনো অথচ কী রোম্যান্টিক অ্যাম্বিয়ান্স! মেন রোড থেকে সহজে চোখে পড়বে না। বাড়িটা দেখা মাত্র কেমন যেন মনে হল এটাই সেই জায়গা যেটা খুঁজছিলেন। কেমন যেন একটা আবেদন আছে বাড়ির দেওয়ালে দেওয়ালে। ঠিক করা হল বাংলোটা যেমন আছে তেমনই থাকবে। শুধু আধুনিক ইন্টিরিয়রে সাজানো হবে অন্দরমহল। আর মেনুতে থাকবে বিশ্বমানের খাবার, শুরুর কথা মনে করছিলেন মেঘা। তরুণ উদ্যোক্তার মনে যেন ডানা লাগানো। ‘সচরাচর যা দেখা যায়, যা হওয়া উচিত আমার মন সেই সবের ধার ধারে না। মন আমার কল্পনায় ডানা মেলে যেখানে খুশি চলে যায়। খামখেয়ালি। অনেকটা জে কে রাওলিং বা এনিড ব্লিটনের গল্পের মতো’, খোলামেলা আড্ডায় নিজেকে মেলে ধরলেন তরুণ সফল মহিলা উদ্যোগপতি। মেঘার মনের সাতরঙা রামধণুর ছাপ পাওয়া যায় দ্য কর্নার কোর্টইয়ার্ডের ইন্টিরিয়রে। নানা রঙের ছড়াছড়ি। রঙ ভালোবাসেন। স্থাপত্যের কাজ তুলির টানে পূর্ণতা পায়। ও হোটেলটিকে এমনভাবে সাজাতে চেয়েছিলেন যার মধ্যেয গল্প খুঁজে পাবেন মানুষ। দেওয়াল জুড়ে তালাচাবি, ছাদ থেকে নবাবি ঝাড়লণ্ঠন—ইন্টিরিয়রে কোথাও বাড়তি মেদ বলে মনে হবে না। মেঘা মানেন, ‘একটা হোটেল খোলা সোজা কথা নয়। তবে মেয়ে বলে কখনও নিজেকে পিছিয়ে রাখেননি। হোটেল ব্যবসায় বহু মহিলা সফল হয়েছেন। বিশ্বাস করেন পুরুষ না মহিলা, বয়েস, প্রেক্ষাপট, গেঁথে যাওয়া ধারনা—এসব কোনওটাই বিচার্য নয়। শুধু ব্যবসা আর তার প্রতি প্যাশনটাই দিনের শেষে সাফল্য এনে দেবে।

মেয়ের এতবড় কর্মযজ্ঞে সবসময় পাশে ছিলেন বাবা—মা। ছোট বেলা থেকে দেদার স্বাধীনতা পেয়েছেন। ভুল থেকে ঠেকে শিখেছেন। অনেক ছোটবেলা থেকে একা একা ঘুরতেন। হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলে নিজেকে সামলানোর সাহস তৈরি হয়ে গিয়েছিল তখন থেকে, হঠাৎ ব্যবসায় নেমে পড়ার সাহস কীভাবে জোটালেন বলছিলেন মেঘা। কলকাতায় এটাই মেঘার প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবসা। তবে ছোটবেলা থেকে তাঁর মধ্যেে সফল ব্যথবসায়ী হয়ে ওঠার লক্ষণ ছিলই। বাড়ির একটা বাড়তি ঘরকে লাইব্রেরি বানিয়ে ফেলেছিলেন। নামমাত্র চার্জে বন্ধুদের বই ধার দিতেন। বাড়ির তৈরি খাবার নিয়ে বিক্রি করতেন নানা জায়গায়। চালু করেছিলেন অ্যাকটিভিটি সেন্টার যেখানে শেখানো হত গিটার। এমবিএ শেষ করে কনসালটেন্ট হিসেবে মেঘা চাকরি পান প্রাইসওয়াটার হাউস কুপারর্স ইন্ডিয়ায়। নানা ধরনের আইডিয়া মাথায় ঘোরে। একেবারে অস্থির। স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসতেন, কিউবিক্যালে বসে সারাদিন স্বপ্ন বুনতেন তাই। স্বপ্ন তাড়া করতে করতে এক সময় উত্তর—পূর্বের বুটিক হোটেলগুলোয় হাত পাকালেন কিছু দিন। তারপর এই কর্নার কোর্টইয়ার্ডের ইনিংস। পরের ইনিংসটা খুললেন নাইরোবিতে। নাম ফায়ারপ্লেস। সেটা একটা লেবানিজ রেস্তোরাঁ। পাওয়া যায় মেক্সিকান রান্নার বিপুল সম্ভার। আছে ভূমধ্যসাগরীয় কুইজিনও। ফলে মেঘার এই প্যাশন কর্নার কোর্টইয়ার্ডকে বিশ্বের আরেকটি মহাদেশেও সাফল্যের রাস্তা দেখাচ্ছে।

ভোক্তা, পণ্য আর লাভ—ব্যবসা করতে হলে এই ধারা অনুযায়ী চলতে হবে। প্রতিদিন শিখে শিখে নিজেকে উন্নত না করলে পিছিয়ে পড়বেন এই বোধ তার মাথার ভিতর সব সময় ঘুরে বেড়ায়। বিদেশে যেখানেই যান সেখানকার খাবার চেখে দেখেন। প্রতিদিনই শিখছেন এই উদ্যোগপতি। ব্যাবসা আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তার আগে অবশ্যই নিজের স্বপ্নের প্রথম ফসল দ্যা কর্নার কোর্টইয়ার্ডে আরও একটু জমিয়ে নিতে চান।