স্কুলে শিশুর গতিবিধি জানাবে লোকাস

0

আপনার শিশু সন্তানকে সকাল-সকাল স্কুলে পাঠিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু ঘরে না ফেরা পর্যন্ত যেন শান্তি নেই। সব ঠিক আছে তো? এই উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা নিয়েই কাটান সব বাবা-মা। এই উদ্বেগের কারণও রয়েছে। মাঝে মধ্যেই এমন সব ঘটনা ঘটে যেখানে শারীরিক বা মানসিক অত্যাচারের শিকার হয় শিশুরা। মূলত সফ্‌ট টার্গেট হিসাবেই বেছে নেওয়া হয় তাদের। এমনকী পারিবারিক কোনও শত্রুতার জেরে শিশু অপহরণ, অত্যাচার বা হত্যাও বাদ যায় না। অভিভাবক হিসাবে এখন কী করবেন আপনি? আপনার সন্তানকে তাহলে কি স্কুল বা বাইরে পাঠাবেন না?

এমন একটি জরুরি প্রয়োজনবোধের জায়গা থেকেই বিষয়টি নিয়ে নাড়াচাড়া শুরু করেন দুই পিতা। রীতেশ পান্ডিয়া এবং বিশ্বনাথ ভি বালুর। তাঁরা তৈরি করেছেন এমন এক ডিভাইস যা সর্বক্ষণ আপনার শিশুর গতিবিধি সম্পর্কে আপনাকে অবহিত রাখবে। এই যন্ত্রের তাঁরা নাম দিয়েছেন লোকাস (Locus)। এমন এক যন্ত্র যার সঙ্গে মিশেছে হার্ডওয়্যার আর মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন। কেউ-কেউ বলতে পারেন মোবাইল ফোনের মাধ্যমেও তো শিশুর গতিবিধি সম্পর্কে খোঁজখবর রাখা যেতে পারে। হ্যাঁ, নিশ্চয়ই পারে। কিন্তু মোবাইল ফোনের বেশকিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সেই তুলনায় লোকাস অনেক বেশি কার্যকরী বলেই নির্মাতাদের দাবি। কীভাবে? রীতেশের কথায়,"আমরা দেখে থাকি শিশুদের কী করা উচিত বা কী করা উচিত নয়, সেটাই শিখিয়ে থাকেন অভিভাবকরা। কোন-কোন জিনিসে হাত দেওয়া উচিত নয়, সেটাও তাঁরা শেখান। বাচ্চাদেরকে সেলফোনও দিয়ে থাকেন তাঁরা। যাতে জরুরি প্রয়োজনে চটজলদি খবর পাওয়া যায়। কিন্তু স্কুলে সাধারণত মোবাইল ফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ।এই অবস্থায় বাচ্চাদের সর্বক্ষণের গতিবিধি জানার জন্য আমাদের যন্ত্র অনেক বেশি কার্যকরী"।


লোকাসের সূচনা

২০১২ সালের ২ মে শক্তিশালী বোমা বিস্ফোরণে কেঁপে উঠেছিল আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুল। ঘটনাচক্রে সেই সময় বিস্ফোরণস্থলের কাছেই ছিলেন রীতেশ। সেই তালিবান হামলায় প্রাণ হারান বেশ কয়েকজন। বিস্ফোরণস্থলের পাশেই ছিল একটি স্কুল। বিস্ফোরণের জের গিয়ে পৌঁছয় সেখানেও। কান্নাকাটি, হইচই শুরু হয়ে যায়। বারুদের গন্ধ, রক্তাক্ত দেহ, নিরাপত্তারক্ষীদের উপস্থিতির মধ্যে জ্ঞানশূন্য হয়ে দৌড়তে দেখা যায় ছাত্রছাত্রী, স্কুল কর্মীদের। বাচ্চাদের সন্ধান না মেলা পর্যন্ত উদভ্রান্তের মতো ঘুরতে দেখা যায় অভিভাবকদের। সন্তানকে অক্ষত দেখার পরে তবেই শান্তি। চোখের সামনে দেখা এই ঘটনা নাড়িয়ে দিয়ে যায় রীতেশকে। জরুরি অবস্থার সময় বাচ্চাদের কীভাবে খোঁজ মিলবে এর সমাধান খুঁজতেই হবে। এই আইডিয়াকে মাথায় রেখেই একজন প্রযুক্তিবিদের সন্ধান শুরু করে দেন রীতেশ। চলে আসেন ভারতে। যোগ দেন Onmobile Global নামে একটি সংস্থায়। সেখানেই তাঁর সঙ্গে আলাপ হয় পেশায় ইঞ্জিনিয়ার বিশ্বনাথের। একদিন লাঞ্চের সময় বিশ্বনাথের সঙ্গে তাঁর আইডিয়া নিয়ে আলোচনা করেন রীতেশ।আইডিয়ায় বাস্তবতা রয়েছে বলেই মেনে নেন বিশ্বনাথ। এমন সময় বেঙ্গালুরুর একটি স্কুল ক্যাম্পাসের মধ্যেই যৌন হেনস্থার শিকার হয় একটি শিশু। লোকাস থাকলে যা হয়তো এড়ানো যেত। এরপর আর সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করেননি রীতেশ-বিশ্বনাথ। ছেড়ে দিলেন চাকরি। তৈরি করলেন তাঁদের নিজের সংস্থা Tatya Tech Pvt Ltd.


রীতেশ পান্ডিয়া
রীতেশ পান্ডিয়া

সদাসতর্ক প্রহরী লোকাস

লোকাস আসলে GPS ও GPRS প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে তৈরি একটি স্কুল আইডেন্টিটি কার্ড। যা সহজেই বাচ্চাদের পরিয়ে দেওয়া যায়। এর ফলে শিশু যেখানেই যাক না কেন তার প্রতিটি পদক্ষেপ সঙ্গে-সঙ্গে (রিয়েল টাইম বেসিস) বাবা-মা'এর মোবাইলে পৌঁছে যাবে। বাচ্চা স্কুলে আছে, না স্কুলের বাইরে তা তাঁরা জানতে পারবেন। অ্যাপ্লিকেশনটিতে শিশু স্কুলে থাকাকালীন সেফ জোন ও নন-সেফ জোনের মতো দুটি বিভাগ রাখা হয়েছে। বাচ্চা নন-সেফ জোনে পা রাখলেই তা অভিভাবকদের কাছে মেসেজ হিসাবে পৌঁছে যাবে।বাচ্চার ফোনের ব্যাটারি চার্জ কমে গেলে বা শাট ডাউন হয়ে গেলে তারও খবর মিলবে। স্কুলবাস নির্দিষ্ট গতিবেগের থেকে জোরে চললে তাও জানতে পারবেন তাঁরা। আর শিশুদের জন্য রয়েছে একটি প্যানিক ব্যাটন। কোনও কারণে বাচ্চা ভয় পেলে সেই ব্যাটনে চাপ দিলেই হবে। অভিভাবকরা সেইমতো ব্যবস্থা নিতে পারবেন।


বিশ্বনাথ
বিশ্বনাথ

সাড়া মিলল স্কুলে

রীতেশ-বিশ্বনাথের লোকাস-কাণ্ড বছরখানেক চলছে। সময়ের প্রেক্ষিতে খুব বেশিদিন বলা চলে না। কিন্তু যেটুকু সাড়া পেয়েছেন তা ইতিবাচক বলাই যায়। ইতিমধ্যেই বেঙ্গালুরুতে ৪০টি স্কুল এবং প্রায় সাতশোর মতো অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলেছেন তাঁরা। এমন একটি মুশকিল আসানের কথা জানতে পেরে অভিভাবকরাও বেশ খুশি। এখনও পর্যন্ত চারটি স্কুলের সঙ্গে লোকাস ব্যবহারের চুক্তি(যেহেতু এরসঙ্গে পরিচয়পত্র বহনেরও একটি ব্যাপার আছে) সারা হয়ে গিয়েছে রীতেশদের। তাঁদের ইচ্ছে, আগামী এক বছরের মধ্যে তা অন্তত ২৫টি স্কুলের আওতায় নিয়ে আসা। এই অ্যাপ বাণিজ্যিকভাবে গুগল প্লে'তেও মিলবে। তবে পরিচয়পত্র সম্পর্কিত আইডি কার্ডটি বাজার থেকে কিনতে হবে।

চড়াই-উৎরাই নিয়ে পথ চলা

স্টার্টআপ আর চ্যালেঞ্জ থাকবে না?

লোকাসের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। এখন রীতেশ-বিশ্বনাথকে ধরে আটজনের দল। এরমধ্যে বিশ্বনাথ-সহ পাঁচজন সামলান টেকনিক্যাল দিকটি। আর রীতেশের নেতৃত্বে বাকি দু'জন দেখেন মার্কেটিং। রীতেশ বললেন," আমাদের একটা সময় খুবই খারাপ গিয়েছে। নিজেদের টাকা ঢেলে কাজে নেমেছিলাম। সেইসময় আমরা যন্ত্রটাকে ডেভেলপ করার চেষ্টা করছি। ফলে রোজগার বলতে কিছুই ছিল না। কর্মীরাও হতাশ হয়ে পড়ছিল। আমার কাজই ছিল তাদের হতাশ হতে না দেওয়া। তাদের উৎসাহ জাগিয়ে রাখা। সেটাই ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ"। তবে এখন সেই মেঘ কেটে গিয়েছে। রোজগার হচ্ছে, কর্মীদের মুখেও হাসি ফিরেছে। আগামীদিনে ব্যবসাকে আরও এগিয়ে যেতে প্রয়োজন লগ্নির। এজন্য তাঁরা তাকিয়ে রয়েছেন এক যথার্থ লগ্নিকারীর। যিনি শুধু টাকা নয়, প্রযুক্তির সুফলটাও বুঝবেন।