লিখুন, ছাপান প্রকাশকদের দরজা খোলা

1

একটি প্রেম পত্র লিখতে গিয়ে ঘেমে নেয়ে একসা হয়েছিলেন যে পল্টু কাকু, সেদিন আমাদের দিয়ে গেলেন একটা কবিতার বই। লিখেছেন তিনি। ছাপিয়েওছেন। আর এখন বিলি বন্দবস্ত করছে তাঁর প্রকাশনা সংস্থা। বলছিলেন এই বইয়ের পাবলিশার অনেক সাহায্য করেছে। নাম করব না। কারণ নামটা জরুরি নয়। বরং মনের কথা মনের ভাষায় লিখে ফেলা এবং তা প্রকাশ করার এই কৌশলটাই সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ এই গল্পটায়। বলছিলেন, প্রেমপত্রটি নির্দিষ্ট সেই নারীকে দিয়ে উঠতে পারেননি সেদিন। এখন পুস্তকাকারে প্রকাশিত তাঁর অভিব্যক্তির উপাখ্যান আরও অনেককে পৌঁছে দিতে পেরেছেন। এর জন্যে ধন্যবাদ দিচ্ছেন কলকাতার প্রকাশনা সংস্থাগুলির নতুন উদ্যোগকে। 

সাহিত্যের বিচার বিশ্লেষণ সচরাচর করেন যারা তাদের রক্তচক্ষু, তাঁদের বৈদগ্ধ এবং তাঁদের পছন্দ অপছন্দের যে কষ্টিপাথর যা একজন কবিকে প্রকাশিত কবি হতে দেয় না, একজন কাহিনিকারকে হ্যাঁটা করে তার থেকে মুক্তির স্বাদ পেয়েছেন এই পল্টু কাকুদের মত লেখকেরা। তাই পল্টু কাকুরা বই লিখুন, ছাপান, তুরন্ত পৌঁছে যান পাঠকের কাছে। জেটযুগে নিজের লেখা প্রকাশের এমনই সহজ উপায় যখন আছেই হাতের কাছে। বিভিন্ন সেলফ পাবলিশিং এজেন্সি দীর্ঘদিন ধরেই এই কাজটি করে আসছে। এতদিন দিল্লি এবং চেন্নাইতে নিজের বই নিজে প্রকাশের চল ছিল। যেমন ধরুন ফাইভ পয়েন্টস সামওয়ান। বই পড়া যাদের নেশা চেতন ভগতের লেখা এই বইটি পড়েননি তেমন লোক বোধহয় খুঁজে পাওয়া যাবে না। বইটির একটা বিশেষত্ব এটি স্বপ্রকাশিত বই। অর্থাৎ নিজের প্রথম লেখা উপন্যাস নিজেই প্রকাশ করেছিলেন চেতন ভগত। ২০০৪ সালে প্রথম দিল্লিতে শুরু হয় সেলফ পাবলিকেশন। এরপর পেরিয়ে গিয়েছে ১৩টি বছর। বিদেশেও এটা রমরমিয়ে চলা একটি ব্যবসা। কলকাতাই বা বাদ যায় কেন। এতদিন এই কাজটা কলকাতার কলেজ স্ট্রিট পাড়া, টেমার লেনে লুকিয়ে চুরিয়ে হত। যেসব প্রকাশনা সংস্থা নতুন লেখকদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে বই ছাপাত তাদের দিকে অন্য সংস্থাগুলো তির্যক ভাবে দেখত। নাক সিটকতও। ২০১৭ সালে শহর কলকাতা দেখতে চলেছে স্বপ্রকাশনার মুখ। এখন এটা খুল্লাম খুল্লা। কলকাতাতে সদর্পে চলছে এরকম প্রকাশনার বন্দোবস্ত। বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থা খুলে দিচ্ছে স্বপ্রকাশনার দরজা। উঠতি কবি, লেখকদের কাছে বাড়তি সাহস, বাড়তি অনুপ্রেরণাও। বিভিন্ন আর্থিক প্যাকেজের মাধ্যমে সহজেই পাঠকের দরবারে পৌঁছে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে। পত্রভারতী, দেজের মতো নামী সংস্থাও এগিয়ে এসেছে সেলফ পাবলিকেশনে।

‘অনেক লেখক নিজের লেখা ছাপানোর সুযোগ পেতেন না। এতে ভালো হল। আরও ভালো হল বড় বড় প্রকাশনা সংস্থাগুলি এগিয়ে আসায়। ঠগ জোচ্চোরের পাল্লায় পড়তে হবে না লেখকদের। আবার লেখার বিচারও হয়ে গেল’, বলেন পত্রভারতীর প্রকাশক ত্রিদিব চট্টোপাধ্যায়। ‘ফেল কড়ি, বই বাজারে। জুতোর সুকতলা ক্ষইয়ে প্রকাশকের দাক্ষিণ্যের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে না কোনও লেখককে। এরফলে বাজারে তরুণ লেখকের সংখ্যা বাড়বে। আর নানা ধরনের বই পড়ার সুযোগও পাবেন পাঠক’, বলছিলেন দে’জ পাবলিশিংয়ের কর্ণধার সুধাংশুশেখর দে।

নোশন প্রেস, টাইগার বুকস, হোয়াইট ফ্যালকন, পেঙ্গুইন, জাতীয় স্তরের এমনই হাজারও প্রকাশনা সংস্থা এনে দিয়েছে সেলফ পাবলিকেশনের সুযোগ। এছাড়া শহরে বর্তমানে বি বুকস নামে নতুন একটি সংস্থা রীতিমত সাফল্যের সঙ্গেই স্বপ্রকাশনার কাজ করে চলেছে। ‘বেঙ্গল বুকসের অধীনে নেকটার পাবলিশিং বলে আলাদা ইউনিট রেখেছি শুধু সেলফ পাবলিশিংয়ের জন্যে। মাসে ২০টি পাণ্ডুলিপি পাই। এতটা পড়া সম্ভব নয়। লেখদের বলে দিই নিজের টাকায় ছাপিয়ে নিন’, অভিজ্ঞতা থেকে বললেন বি বুকসের প্রকাশক এষা চট্টোপাধ্যায়।

স্বপ্রকাশনার জন্য ২৫ হাজারের কিং প্যাকেজ থেকে শুরু। রয়েছে ৫০ হাজার বা তারও বেশি অঙ্কের কুইন প্যাকেজ। যার মাধ্যমে নিজের লেখা নিজেই প্রকাশ করা সম্ভব।

এতদিন হৃদয়, শ্রম দিয়ে সৃষ্টির পরও প্রকাশকের অপেক্ষায় বসে থাকতে হত লেখক, কবি, ঔপন্যাসিকদের। কিন্তু এবার পাণ্ডুলিপি তৈরি থাকলেই দরজা খোলা। প্রকাশ করতে পারবেন নিজের লেখা। তার প্রচার থেকে শুরু করে বাজারে ছড়িয়ে দিয়ে বিক্রিবাট্টা, সবটাই সংশ্লিষ্ট সংস্থার দায়িত্বে। বাংলা সাহিত্যের কাছে এ এক বড় পাওনাই বটে।