'পিঠে বিলাসী' নবনীতার 'পাকামি' করে উন্নতি

5

পিঠে খেলে পেটে সয়। পকেটও বিদ্রোহ করে না। আর জিভ আহ্লাদে আটখানা হয়ে আরও বেশি লালায়িত থাকে। এমনই পিঠে বানান বারাসাতের রন্ধন পটীয়সী বৌমা নবনীতা চ্যাটার্জি চক্রবর্তী। কথায় কথায় হেসে গড়িয়ে পড়েন। মুখে হাসি লেগেই রয়েছে। দুটো কান পর্যন্ত চওড়া সেই হাসির ভিতর লুকিয়ে রয়েছে এক আপাত ভীতু অথচ ইস্পাতের মত দৃঢ়প্রতিজ্ঞ মহিলা উদ্যোগপতির আত্মবিশ্বাস। নবনীতা বলছিলেন তার লড়াইয়ের গল্প। কিভাবে পিঠে বিলাসী তৈরি হল সেই গল্প।

বিনয়ের সঙ্গে বলছিলেন বিয়ের আগে রান্না জানতেন না। ভাতের হাঁড়ি উপুড় করাও শিখেছেন শাশুড়ি মার কাছ থেকে। শাশুড়ির নয়নের মণি। বৌমা তাকে 'নতুন মা' বলে ডাকেন। ছোটো বৌ। বাড়িরও ছোটো মেয়ে। আহ্লাদে বড় হয়েছেন। বাবা ধন্বন্তরি ডাক্তার অমরেন্দ্র চ্যাটার্জি। এক ডাকে গোটা দমদম ক্যান্টনমেন্ট চেনে। মা ছিলেন স্কুল শিক্ষিকা। তল্লাটে এতই ওদের নামডাক যে চিরকাল সেলেব্রিটি ট্রিটমেন্ট পেয়ে এসেছেন নবনীতা। ক্রাইস্ট চার্চ গার্লস হাইস্কুলে পড়েছেন ছোটবেলায়। মিশনারি স্কুল। ইংলিশ মিডিয়াম। পড়াশুনোয় ভালো। আর ভালো লেখালিখিতে। ছোটবেলা থেকেই গল্প কবিতা লিখতেন। বাংলায় দখল আছে। উচ্চমাধ্যমিকের পর ভর্তি হন ক্যালকাটা টেকনিকাল স্কুলে। ইলেকট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেন। এরই ফাঁকে মেধাবী তরুণ মলয়ের সঙ্গে দেখা। মলয় ওঁকে অঙ্ক শেখাতে আসতেন। মলয় মানে মলয় চক্রবর্তী ওর স্বামী। নবনীতার বাড়ির লোকেদের দারুণ পছন্দের পাত্র। মলয়ও নবনীতাকে পদে পদে সামলেছেন। অকারণ ভয় পেতে বারণ করেছেন। সাহসী করেছেন। সব সময় ওর ভিতর সাহস আর আত্মবিশ্বাস পুরে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। আর নবনীতাও মুগ্ধ হয়েছেন মলয়ের মানবিক গুণে, ওর উদারতায়। স্বাভাবিক পরিণতি হিসেবে বিয়ে হয় দুজনের। নবনীতার আনন্দ এক লহমায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। আরও এক সেট বাবা মা পেয়ে যান নবনীতা। তারাও ওকে নিয়ে সমান খুশি। শ্বশুরবাড়ি বলতে যৌথ পরিবার। ভাসুর জা তাদের ছেলেমেয়ে এমনকি খুড়তুতো ভাসুর, মামাতো দেওর সবাইকে নিয়ে এক বিশাল সংসার। দু বাড়ি মিলিয়ে নবনীতাকে উৎসাহ দেওয়ার লোকের অভাব নেই।

শ্বশুরবাড়ির সকলেরই প্রিয় বৌমা নবনীতা। রান্নাবান্নার কথা যদি বলেন, ছোটবেলা থেকে উনুন মুখো হননি। মা ভালো রাঁধতেন। বাবার আদি বাড়ি যশোরে। মার দেশ খুলনা, শ্বশুরবাড়ির দেশ ঢাকায়, শাশুড়ির বাপের বাড়ি পাবনায়। ফলে বাংলাদেশি রান্নার একটা ঘরানা তিনি চেখে দেখার সুযোগ পেয়েছেন। কিন্তু জিহ্বা ও উদর দিয়ে পরিজনের হৃদয়ে পৌঁছনর সুড়ঙ্গ পথটি ওকে শিখিয়েছেন ওর নতুন মা। যে বৌ সামান্য ভাতের হাঁড়ি উপুড় করতে জানতেন না তিনি শাশুড়ি মার কাছ থেকে দ্রুত শিখে নিয়েছেন ঝাল ঝোল অম্বলে ফোড়নের রহস্য। কিন্তু রান্নার সময় নানান কারুকাজ করতেও ছাড়তেন না। নানান এক্সপেরিমেন্ট। এটা সেটা দিয়ে নিজের বুদ্ধি খাটিয়ে রান্না করতে করতে মন জয় করে ফেললেন পরিবারের সকলের।

২০১২ সালে বিয়ে। ২০১৩ তেই বাড়ির লোকেরা জোর করে পাড়ায় রান্নার প্রতিযোগিতায় নাম দিয়ে দেন ওঁর। পৈলান পোটো কুকিং কম্পিটিশন। মজার খেলা। পাড়ার বৌমারা রান্না করবেন সেই রান্না চেখে দেখবেন নামজাদা সেফেরা। তখন ওদের পাড়ায় দারুণ সব রাঁধুনি বৌমাদের নাম ডাক। প্রতিযোগিতা তাই হাড্ডা-হাড্ডি হওয়ার কথা। সেখানে নবনীতা তো নস্যি। তবুও শ্বশুর মশাই দারুণ উত্তেজিত ছিলেন। দেখা গেল প্রতিযোগিতায় সব বৌমাদের গোল দিয়ে জিতে গেলেন চক্কোত্তি বাড়ি ছোটবউ। 

কী রেঁধেছিলেন সেদিন! জিজ্ঞেস করতেই হেসে গড়িয়ে পড়লেন নবনীতা। বললেন কিচ্ছু না... এক ধরণের পিঠে। নাম দিয়েছিলেন 'পিঠে পাকামি'। যেমন পিঠে হয় তেমনি, কিন্তু রহস্য যত, সব ছিল পুরে। রীতিমত আলু দিয়ে আর চকোলেট দিয়ে পুর দিয়েছিলেন ওই পিঠেতে। এমন পিঠে জম্মে কেউ কোনও কালে খায়নি। 

ফলে আর যায় কই! জিতে গেলেন রান্নার কুস্তি। মজাও পেলেন ঢের। আহ্লাদিত শ্বশুর মশাই। এমন আরও রান্নার প্রতিযোগিতায় নাম দিতে উৎসাহ দিলেন তিনিই। শ্বশুর মশাইয়ের কথা বলতে গিয়ে একটু আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলেন নবনীতা। বলছিলেন তিনি আজ আর নেই কিন্তু আমার সঙ্গে তিনি সব সময় আছেন। বললেন যে সে লোক ছিলেন না ওর নতুন বাব। নামকরা ইঞ্জিনিয়ার রবীন্দ্রনাথ চক্রবর্তী। চক্রবর্তী কনস্ট্রাকশনের কর্ণধার ছিলেন। আর ছিলেন অনেকের অনুপ্রেরণা। পরিবারের সকলেই স্ব স্ব ক্ষেত্রে দুর্দান্ত প্রতিষ্ঠিত। তাই ওর নতুন বাবাও চাইতেন ও কিছু করে দেখাক। নবনীতা তখন একটি বহুজাতিক সংস্থায় কাজ করতেন। সৃজনশীল মেয়ে নবনীতা। লেখালেখি, ছবি আঁকা, কবিতা গানের উৎসাহের পাশাপাশি রান্নার এক্সপেরিমেন্টেও মজা পেতে শুরু করে দিয়েছিলেন। এদিকে ওই বছরই আরও একটি রান্নার প্রতিযোগিতায় নাম দেন। সেটা বিগবাজার আয়োজিত বিগবাজার কিচেন স্মার্ট কনটেস্ট। হাজার হাজার প্রতিযোগী। ভেবেছিলেন পারবেন না। তবু শখ। কিন্তু দেখা গেল সেখানেও জিতে গেলেন নবনীতা। হেলথ-টেস্ট-গার্নিসিং সবকটি বিভাগেই তিনিই ছিলেন সেরা। সেখানেও পিঠেই বানিয়েছিলেন। সেটাই ছিল টার্নিং পয়েন্ট।

আত্মবিশ্বাস পেয়ে গিয়েছেন ততক্ষণে। পিঠে বানানো নিয়ে এবার একটু একটু করে সিরিয়াস হচ্ছিলেন। তরুণ সঙ্ঘের দুর্গাপুজোয় স্টল দিয়েছিলেন। পাঁচ রাত জেগে পিঠে বেচেছেন নবনীতা। প্রথম থেকেই শাশুড়ি মা, স্বামী, এবং গোটা পরিবার ওর পাশে ছিল। কিন্তু প্রতিবেশী সমাজ আর বন্ধুবান্ধবদের একাংশ কম নাক শিঁটকোয়নি। ওরকম সম্ভ্রান্ত পরিবারের বৌমা রাস্তায় দাঁড়িয়ে পিঠে বেচছে দেখে যারপরনাই কানাঘুষো করেছে। ওর ব্যবসায়িক লড়াই দেখে দু ঘটি জল বেশিই খেয়েছে পরম প্রিয় পড়শিকুল। তবু দমানো যায়নি নবনীতাকে। বহুজাতিক সংস্থার চাকরি ছেড়ে ততদিনে ও ফুলটাইম পিঠে বিক্রেতা। দাঁতে দাঁত চিপে সব অপমান সহ্য করেছেন। ওকে সবসময় মোটিভেট করেছেন মলয়। তিনি নিজেও দামী নামি চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন শুধু নবনীতার পাশে দাঁড়াবেন বলে। ২০১৩ সালেই হস্তশিল্প মেলায় দোকান দিয়েছিলেন। তারপর আর ফিরে তাকাতে হয়নি। বলছিলেন কোনও বারই হস্তশিল্প মেলায় চাহিদা পূরণ করতে পারেননি। রীতিমত লাইন দিয়ে পিঠে কিনেছেন ক্রেতারা। এ পিঠে তো সাধারণ পিঠে নয়। পরিচিত পিঠের ভিতর মাছের পুর মাংসের কোরমা। চিংড়ির মালাইকারি। গন্ধরাজের গন্ধে মম করা অনাস্বাদিতপূর্ব চিকেন দিয়ে তৈরি পিঠের দারুণ প্রিপারেশন। ইনোভেশনের অভাব নেই। পুরস্কারও পেয়েছেন অনেক। সরকারি আনুকূল্যও পেয়েছেন। প্রথম আউটলেটটি খোলেন ইকোপার্কে। তারপর নলবনে পিঠে বিলাসীর রেস্তোরাঁ। এবার খুলছেন কালীঘাট মেট্রোর কাছে। রাজ্য সরকারের সৌজন্যে মহাকরণের উল্টোদিকে 'দেখো রে' তেও স্টল পেয়েছে নবনীতার পিঠে বিলাসী। এখন আর একা একা লড়া নয় নবনীতা বলছিলেন ওঁর ভাসুর, জা সবাই ওর সঙ্গে এই ব্যবসায় জড়িয়ে রয়েছেন। স্বামী শাশুড়ি তো আছেনই। পিঠে বানানোই ওদের এখন পারিবারিক ব্যবসা। গত পাঁচ বছরে চারটে ঠিকানা হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে দশটা আউটলেটের স্বপ্ন দেখেন নবনীতা। বিদেশে এর আগে ওর বানানো আনন্দনাড়ু গিয়েছে। কিন্তু এবার বিদেশেও ব্যবসা ছড়িয়ে দিতে চান। 

স্বপ্ন দেখেন বাঙালি তার প্রিয়জনের জন্মদিনে কেক অর্ডার না করে ওর বানানো রকমারি পায়েস অর্ডার করবে। চকলেট ফ্যাক্টরির চার্লির মতোই বললেন নোনতা মিষ্টি নানান স্বাদের আমিষ নিরামিষ পিঠের একটি জগত তৈরি করার স্বপ্ন দেখেন তিনি। সেটা হবে পিঠের জগত। যে পিঠে খেলে পেটে সয়। পকেটও বিদ্রোহ করে না আর জিভ আহ্লাদে আটখানা হয়ে যায়।