আবর্জনায় হীরে খুঁজে পেলেন ট্যাংরার সঞ্জয়

0

দোলন,পায়েল,দুষ্টু,অমিত,পাপ্পু,লালন- মাথা উঁচু করে বাঁচতে চায়। বাঁচতে চায় মানুষের মত। ওদের বাঁচার সঞ্জীবনী সুধা- সঞ্জয়। দোলন, পায়েল, দুষ্টু, অমিত , পাপ্পু – এরা কারা ? কে এই সঞ্জয় ? আজ এদের কথা হঠাৎ করে এল কেন? সব বলব। আগে বলি, ওদের মিল কোথায় ?? ..... ওরা সকলেই ট্যাংরার বস্তিতে দিন কাটায়। খুন, হানাহানি, হিংসা, অপরাধ জগতের বাতাবরনেই ওদের বেড়ে ওঠা। বস্তির স্কুলে ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত পড়া কিংবা তার আগেই খাবারের সন্ধানে জুতো পরিষ্কার, ময়লা ফেলা, চায়ের দোকান কিংবা চামড়া কারখানায় অনুপ্রবেশ। এ এক অন্য জীবন ওদের। যা শহুরে সমাজ থেকে আলাদা করে রেখেছে। আবার ওরাই একসঙ্গে ফেলে দেওয়া জলের ড্রাম, পুরোনো থালা, বাটি, রঙের টিন দিয়ে তৈরি করে ঐকতান, প্রচলিত লোক গানের ভেলায় আপনাকে সম্মোহিত করে। সেই সুর ওদের পরিচিতি দেয় ইন্ডিয়া গট ট্যালেন্টের মঞ্চে। Being Human র চ্যারিটি শো-তে। বাঁচতে শেখায় মানুষের মতো করে, মাথা উঁচু করে, সম্মানের সঙ্গে- একটু ভালো ভাবে। ট্যাংরার অন্ধকার অলি গলি থেকে শহরের রাজপথে নিয়ন আলোয় উদ্ভাসিত আজ ওরা।

অন্ধকার থেকে আলোয় ফেরা-সহজ ছিল না। বড়ই বন্ধুর সে পথ। দুর্গম সেই যাত্রাপথের গল্পই আজ বলব। সঞ্জয় মন্ডল। বয়স ৩৫। জন্ম, বেড়ে ওঠা ওই ট্যাংরার বস্তিতে। উচ্চমাধ্যমিকের পর আর পড়াশোনা করা হয়ে ওঠেনি। বস্তিতে থাকতে থাকতে আর পাঁচ জনের মতোই সঞ্জয়ও সেই চামড়া কারখানা থেকে জুতো পরিষ্কার সবই করেছে একদিন। ছোট বেলায় বস্তির কালীপুজোয কীর্তনের শব্দব্রহ্ম় ওর কানে বাজতো। আর শ্রী খোলের প্রতি এক অমোঘ আকর্ষন ছিল। কিন্তু সমাজের নিচু তলার মানুষ তাই পুজোর সময় কীর্তনীয়ারা সেই খোলে হাত দিতে দিতেন না সঞ্জয়কে। কেনার মত সামর্থ্যও ছিল না। অগত্যা জলের ড্রামেই খোলের বোল তুলত সঞ্জয়। বন্ধুদের মাঝে, মহল্লায় শ্যামাসঙ্গীত থেকে প্রচলিত লোকগানে দিব্যি বাজাত সে। কিন্তু খোলের বোল তো জানতো না। নিমতার দীপক কুমার সাহার সৌজন্যে সঞ্জয়ের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হল। রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের মিউজিকের শিক্ষক দীপকবাবুই সঞ্জয়ের শ্রীখোলের গুরু।২০০৫ সালে কেন্দ্র সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রকের জাতীয় স্কলারশিপ পেয়ে গেলেন সঞ্জয় বিশ্বাস। স্বপ্ন বাস্তবায়িত হলেও সঞ্জয় ভোলেনি শেকড়ের টান। ট্যাংরার বস্তিতে আজও ছেলে মেয়েরা ফোর ফাইভ পর্যন্ত পড়ার পর সেই বাসন মাজা, জুতো পরিষ্কার, নোংরা পরিষ্কার কিংবা চামড়া কারখানায় যায় কাজ করতে। কিংবা পারিপার্শ্বিক পরিবেশটেনে নিয়ে যায় অন্ধকার জগতের দিকে।এসবের মধ্যে থেকেই তো সঞ্জয় বার বার বেরিয়ে আসতে চেয়েছেন। সমাজে একটা স্বীকৃতি পেতে চেয়েছেন। মানুষ হতে চেয়েছেন ।ভালো ভাবে বাঁচতে চেয়েছেন। তাই নিজে বাঁচার পথ পেলেও ভোলেনি বস্তির কথা। বাকি শিশুদের বাঁচাতে চেয়েছেন। তাদেরও মানুষ করতে চেয়েছেন. অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে তাদের ঠেলে না দিয়ে এক অন্য পথের দিশারি করতে চেয়েছেন।

শিশুদের বাঁচার পথ দেখাতে সঞ্জয় পাশে পেলেন ইন্ডিয়ান মাইন থিয়েটার। সুস্থ ভাবে বাঁচার পথ দেখালো ওরা। আর ২০১০ এ তৈরি হল কলকাতা ক্রিয়েটিভ ওয়েস্ট আর্ট সেন্টার। বস্তির শিশুরা সবাই স্কুলে যায় না। পড়তে ওদের ভালো লাগে না। তবে কিছু শুনতে সেটা বেশ মনে থাকে। বিষয়টা মাথায় ছিল সঞ্জয়ের। তাই হাট্টি-মা-টিম কিংবা সুকুমার রায়ের ছড়ার সঙ্গে একটু ছন্দ আর সঙ্গে মিউজিক জুড়ে দিলেন। সেগুলো কিন্তু দিব্যি গানের মত শোনাচ্ছে। আকৃষ্ট হচ্ছে শিশু মন। একবার সঞ্জয় খেয়াল করেন, চার বছরের একটা বাচ্চা মায়ের কোলে তাঁকে দেখে বলে ওঠে ... হাট্টি-মা-টিম-টিম তারা মাঠে পারে ডিম। আর সেটাই যেন ম্যাজিকের মত কাজ করে। বস্তির সব বাচ্চাদের তো আর বাদ্যযন্ত্র কিনে দেওয়ার সামর্থ্য নেই। তাই বিকল্প ভাবনা। জলের ড্রাম, পুরোনো থালা, ফুটো বাটি, গামলা, রঙের টিন, ইলেকট্রিক ওয়েরিং-র পাইপ, কাচের চুড়ি, পুরোনো জ্যামিতি বক্স নিয়ে শুরু হল সঙ্গীত চর্চা। নিজেদের কোনও গান নেই প্রচলিত লোক গানকেই তাদের মত করে ওই সব ফেলে দেওয়া জিনিস বাজিয়েই এক অন্য সুরে সামনে এল সঞ্জয়ের সেই ব্যান্ড। আজ সেই ব্যান্ডের সাফল্য শুনলে আপনি অবাক হয়ে যাবেন। NDTV তে বিশ্ব পরিবেশ দিবসে এক অনুষ্ঠানে পারফর্ম থেকে , Colors Tv র ইন্ডিয়া গট ট্যালেন্ট শোয়ের সেমিফাইনালিস্ট সঞ্জয় ও তার শিশুসঙ্গীরা। গত চার বছর ধরে দুর্গাপুজোয় আর কলকাতায় থাকা হয় না. দিল্লি-মুম্বইয়ে অনুষ্ঠান থাকে ওদের। শিলাজিৎ, পরমব্রত, থেকে ভূমি –র সুরজিৎ, সৌমিত্র ওদের গানের প্রশংসা করেন। পাশে আছেন। এই সাফল্যের মুকুটে নতুন সংযোজন বাংলা ছবি ‘বাবার নাম গান্ধীজি’ র ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক ওদের ব্যান্ডের।সঙ্গে গানও। আর ওদের গানের দলের ছেলের অভিনয়। নিজেদের সাফল্যের কথা বলতে বলতেই সঞ্জয় বাবুর একটাই কথা বাঁচতে চাই,একটু ভালো করে। সম্মান নিয়ে। বস্তির বাইরেও আমাদের পরিচয় আছে। ফেলে দেওয়া জিনিস দিয়ে সুর তুলে গান করি বটে, কিন্তু আমরাও ফেলনা নই। ২০১৫ তে এবেলার অনন্য সম্মানও পেয়েছেন সঞ্জয় মন্ডল। সাফল্য, স্বীকৃতির মাঝেই জীবনের চরম বাস্তবকে সঙ্গে নিয়ে বাঁচার পথ আজও খুঁজে চলেছে দোলন, পায়েল, দুষ্টু, অমিত, পাপ্পু, লালনরা- ওদের জিওনকাঠি সঞ্জয় মন্ডল।