দিওয়ালির বাজিবাজার চম্পাহাটিতে চনমনে

0

দীপাবলি মানেই বাজির উৎসব। আকাশে আলোর আলপনা আঁকার প্রতিযোগিতা। সারা বছর যার যেটুকু রোজগারই হোক না কেন, উৎসবের দিনগুলোয় বাজি পুড়িয়ে মজা করতে পিছিয়ে থাকে না কোনও শ্রেণির মানুষই।

কার্তিকপুজো, ভাইফোঁটা, জগদ্ধাত্রী পুজোয় ঠাসা নভেম্বরের ক্যালেন্ডারের দিকেই তাকালে মন ভালো হয়ে যায় দক্ষিণ ২৪ পরগনার চম্পাহাটির মানুষদের। তার ওপর বিয়েও পড়েছে বেশ কয়েকটা। বাজি বানিয়ে বাজি মাত করেছে এই এলাকার মানুষ। । আলোর উৎসব আরও রঙিন করতে এখানকার বাজির খ্যাতি আছে।০০ বৈশিষ্ট্য দামে সস্তা। আর রং-এ বাহারি। আতসবাজির হাত ধরে চম্পাহাটির হাড়াল ও অন্যান্য গ্রামগুলির প্রায় তিরিশ হাজার মানুষ বাঁচার পথ খুঁজে পেয়েছেন।

দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের ৯০ ডেসিবে্লের খাঁড়া ঝুলছে মাথার ওপর। বারুদের বিপদ তো নিত্যসঙ্গী। এইসব ঝঞ্ঝাট নিয়েই আলোর যুদ্ধে রং ছড়াতে চান ওঁরা। প্রথম থেকেই চম্পাহাটির হাড়াল গ্রামে কুটির শিল্প বাজি বানানো। আশপাশের কমলপুর, কাটাখাল, বেগমপুর, হালদারপাড়া, কুলবেড়িয়া, সোলঘড়িয়ার মতো গ্রামগুলিতেও এখন বাজি ব্যবসাই রুটি-রুজির পথ। সরাসরিভাবে বাজি তৈরির সঙ্গে যুক্ত এই সব এলাকার প্রায় ৩০ হাজার মানুষ। এর মধ্যে অন্তত কয়েকশো পরিবার আবার সারা বছর বাজি ব্যবসা করেন। যাদের লাইসেন্স আছে। শুধু পুজো, পার্বণ নয়। বিয়ে, জন্মদিন বা অন্নপ্রাশনেও প্রচুর বাজির অর্ডার পায় এই এলাকার ব্যবসায়ীরা।

রং-এর উৎসবে জিততে এবার হাড়াল তৈরি নানারকম ফানুস আর রকেট নিয়ে। যার জন্য কেউ বানিয়েছেন ‘স্কাই অ্যান্টেনা’। লন্ঠনের মতো দেখতে আতসবাজি। আকাশে ওঠে রং ছড়ায়। যতক্ষণ লন্ঠণ জ্বল‌ে ততক্ষণ আলোর বান ডাকে আকাশে।দাম মাত্র তিরিশ টাকা থেকে শুরু। ‘স্কাই অ্যান্টেনা’-কে টক্কর দিতে তৈরি ‘গোল্ডেন ডে লাইট’। দিনের মতো আলো বেরোবে। গোল্ডেন ডে মোটামুটি কুড়ি টাকাতেই পাওয়া যায়। 

সাবেকি চরকি, রং মশাল, আনারকলি, তুবড়ির মতো বাজিরও এবার দারুণ চাহিদা‌। হাড়ালের এক ব্যবসায়ী অখিল সরকার বলেন, ‘‘এবছর প্রায় ১০০ কোটি টাকার ব্যবসা হবে। বাজি কিনতে রাজ্যের নানা জায়গা থেকে মানুষ আসেন।" বৃদ্ধের আফসোস, "তবে কেউ কেউ বেশি লাভের জন্য মানের সঙ্গে সমঝোতাও করছেন আজকাল এর জন্য আমাদের সুনাম নষ্ট হচ্ছে।’’

বাজি ব্যবসায়ীদের বক্তব্য শব্দবাজির থেকে আতসবাজি বানানোর খরচ বেশি। পাঁচটা তুবড়ি বানাতে যা পড়ে, ওই টাকায় অন্তত ১০০টা চকোলেট বোমা তৈরি করা যায়। সরকারি বিধিনিষেধের কারণে আতসবাজিতে জোর দিলেও, ঠিকঠাক প্রশিক্ষণের অভাবে চম্পাহাটির বাজি নির্মাতারা কিছুটা হলেও পিছিয়ে পড়ছেন। এই ব্যাপারে সেভাবে প্রশাসনিক উদ্যোগ নেই। 

বাজি ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ তামিলনাড়ুর শিবকাশির বাজিশিল্পীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। শিবকাশি থেকে কয়েকজন প্রশিক্ষক কয়েক বছর ধরে চম্পাহাটির বাজি নির্মাতাদের এই ব্যাপারে প্রশিক্ষণ দেন। সম্প্রতি ভারত সরকারের ক্লাস্টার ডেভলপমেন্ট ট্রেনিং-এর মাধ্যমেও বাজির নানান কারুকার্য শেখানো শুরু হয়েছে। যার ফলে বদলাচ্ছে বাজির মোড়ক থেকে রং-এর বাহার। তবে এবার বাজি থেকে কোনওরকম দুর্ঘটনা না ঘটায় হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে প্রশাসন।

এবার বাজি তৈরির শুরুর দিকে বৃষ্টির লম্বা ইনিংস কিছুটা সমস্যায় ফেলেছিল বাজি নির্মাতাদের। প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করার অভ্যাস অবশ্য‌ তারা ছোট থেকেই পেয়েছেন। ছেলে-বউ সবাই বাজির কাজে হাত লাগায়। আর বাজির সুবাদেই কাঁচা বাড়ি এখন পাকা হয়েছে। বাড়িতে কালার টিভির বদলে এসেছে এলইডি। সাইকেল ছেড়ে অনেকেই ঘুরছেন মোটরবাইকে। মরশুমি থেকে বাজির বছরভর ব্যবসার জন্য চম্পাহাটিতে সমবায় ব্যাঙ্ক হয়েছে। একাধিক রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক তাদের শাখা খুলেছে। আর এভাবেই গ্রামীণ অর্থনীতির চেহারাটা বদলাচ্ছে।

তবে চম্পাহাটিতেও নাকি মেক ইন ইন্ডিয়ার সিংহকে ভয় দেখাচ্ছে চাইনিজ সার্পেন্ট। এখানেও চিনের জিনিসপত্র ঢুকছে। চিনের সোরা, গন্ধক দিয়ে এবার অনেক জায়গাতেই বাজি তৈরি হয়েছে। বাজি নির্মাতাদের বক্তব্য এই ধরনের কাঁচামাল দিয়ে যেমন অনেক কম দামে বাজি বানানো যাচ্ছে, তেমন এর ফিনিশিংও ভালো। আকাশ দখলের আলোর লড়াইয়ে বাংলার প্রত্যন্ত গ্রামেও অবলীলায় চিনা অনুপ্রবেশ! কী বিষ্ময়কর বিশ্বায়ন!

Related Stories