গরিবের মেয়ের বিয়ে দেবে রাজ্য সরকার!

1

পশ্চিমবঙ্গ সরকার এবার গরিব মানুষের মেয়েকে বিয়ে দেবে। ১৮ বছর হলেই বিয়ে দেওয়ার জন্যে কন্যা সন্তান পিছু ২৫ হাজার টাকা দেওয়ার কথা ঘোষণা হল রাজ্য বাজেটে। দেড় হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ হয়েছে রাজ্য সরকারের এই রূপশ্রী নামের প্রকল্পে। যে সব পরিবারের বার্ষিক আয় দেড় লাখের নীচে, তাদের জন্য রাজ্য সরকারের এই নয়া প্রকল্প। মুখ্যমন্ত্রী অত্যন্ত খুশি। কন্যাশ্রী প্রকল্পের সাফল্যের রেশ টেনে মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন এক সময় রূপশ্রী প্রকল্পও রাজ্যের গর্ব হবে। বাজেট ভাষণে রাজ্যের অর্থমন্ত্রী অমিত মিত্র এই প্রকল্পকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্বপ্নের প্রকল্প বলে উল্লেখ করেছেন। এই ঘোষণায় খুশিতে ডগমগ গ্রামবাংলা। উল্লসিত রাজ্য মহিলা কমিশনও। মহিলা কমিশনের চেয়ারপার্সন লীনা গঙ্গোপাধ্যায় মনে করেন এই প্রকল্প নাবালিকা মেয়েদের বিয়ে আটকে দেবে। ওই টাকার লোভ বাবা মাকে মেয়ের বয়স ১৮ পর্যন্ত পৌঁছতে বাধ্য করবে। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরোর মতে রাজ্য নারীপাচার এবং নাবালিকা বিয়ের পরিসংখ্যানে সব থেকে এগিয়ে। এবার এই সংখ্যাটা কমবে বলে মনে করেন সমাজবিদরা। পাশাপাশি মেয়ের বিয়ে দেওয়ার খরচও অনেক। সেদিক থেকে রাজ্য সরকারের এই উপহার সাগ্রহে নিতে রাজি থাকবেন বাংলার মানুষ। উপকৃত হবে প্রায় ছয় লাখ পরিবার।

কেননা এটা তো একটা সামাজিক সমস্যা বটেই, দিন আনি দিন খাই পরিবারে মেয়ের বিয়ে দেওয়া যে কী ঝক্কি তা মেয়ের পরিবারের লোকজন সম্যক টের পান। এখনও পণ প্রথার মত কুপ্রথা বাংলা থেকে যায়নি। এখনও আত্মীয়স্বজন বন্ধু বান্ধবদের পাত পেড়ে না খাওয়ালে সামাজিক বিয়ে হয় না। এখনও মেয়ে বড় হলে বিয়েটা দিতে হয় বাবা মাকেই। সম্বন্ধ দেখে গায়ের রং রোদে কেমন, টিউব লাইটে কেমন, হেঁটে দেখাও তো! গোছের আবদার ঠেলে, চুলের গোছ দেখে, কুষ্ঠি বিচার ক'রে, রাজযোটক না মাঙ্গলিক এই নিয়ে তুমুল দরকষাকষির পর স্থির হয় কানে-হাতে-গলায় কত কী সোনা দেবে পরিবার। ছেলের হাতের আঙটি, একটা ঘড়ি, একটা বাইক। আগে একসময় ট্রানজিস্টারও চাওয়া হত। খাট-আলমারি-ড্রেসিং টেবিল। বাসনপত্র। মিনিমাম একটা বড় পেতলের কলসি, থালা গ্লাস বাটি... তালিকা লম্বা হতে হতে থামে নগদ টাকায়। তারপর বরযাত্রীর দাবি দাওয়া। খাবার পদ কী থাকবে সে নিয়েও লক্ষ কথা না হলে বিয়েই হত না। এই তো সামাজিক বিয়ের মৌলিক কাঠামো। ক্ষমতার হেরফেরে তালিকা ছোট হয় বড় হয় শুধু। কিন্তু সামাজিক বিয়ে মানে এভাবেই বাবা মায়ের তিল তিল করে জমানো টাকা বাষ্প করে দিয়ে একটি মেয়েকে অন্য একটি পরিবারে পাঠানোই যে বাংলায় দস্তুর তার বিরুদ্ধেও সোচ্চার হচ্ছেন মানুষ। বিয়ে সফল হলে ভালো। সুখী হলে ঠিক আছে। কিন্তু তা না হলে সে এক দুর্বিষহ জীবন। একটি মেয়ের এই অনিশ্চয় যাত্রার ভাগীদার হতে চাইছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। মহিলা মুখ্যমন্ত্রী জানেন গরিব ঘরের মেয়েদের কান্না। নিজে নারী হিসেবে হয়তো টের পেয়েছেন বিয়ে দেওয়ার জন্যে বাবা মায়ের পাশে সরকারেরও দাঁড়ানো উচিত। পাশাপাশি এটাও খুব সত্যি এই ২৫ হাজার টাকাটায় বিয়ের মত একটি সামাজিক ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করার জন্যে ব্যয় হোক অনেকেই চান না। বিশেষ করে বাংলার উদ্যোগপতিদের একাংশ বলছে এই টাকা টা কি ওদের স্বাবলম্বী করার কাজে ব্যয় হতে পারত না! বিয়েটা তো কখনওই নিজের পায়ে দাঁড়ানো নয়! এই টাকাটাই মেয়েদের ১৮ বছর হলে ব্যবসা করার জন্য দেওয়া যেতে পারত। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গ্লোবাল আন্ত্রেপ্রেনিওরস অব বাংলার এক সদস্য রাজ্য বাজেটের পরই বাংলা ইওরস্টোরিকে জানান তাঁর প্রতিক্রিয়া। বক্তব্য স্পষ্ট, সরকারের উচিত ছিল ১৮ বছরের আগে থেকেই গরিব ঘরের মেয়েদের হাতের কাজ শিখতে উৎসাহিত করা। যার যেমন আগ্রহ তেমনি ব্যবসা করতে শেখানো। এবং ১৮ বছর হলে ব্যবসা শুরু করার জন্যে ওই টাকাটা বিনা সুদে ধার হিসেবে ব্যবহার করতে দেওয়া। সাফল্য পেলে টাকা ফেরত দিলে আবারও বিনা সুদে টাকা দেওয়া যেতেই পারে। তবে বর্তমান বরাদ্দ অনুযায়ী ওই দেড় হাজার কোটি টাকায় বাংলার লক্ষ লক্ষ গ্রামের শহরের মফঃস্বলের মেয়েদের নিজের পায়ে দাঁড় করানো গেলে তার প্রভাব দীর্ঘ মেয়াদি হতে পারত। এবং ওই পরিবারের প্রতি সত্যিকারের উপকার সাধিত হত।

রূপশ্রী ছাড়াও রাজ্য বাজেটের মূল সুর ছিল সামাজিক উন্নয়ন। ফসলের অভাবী বিক্রি ঠেকাতে রাজ্য সরকার একশ কোটি টাকার তহবিল তৈরি করেছে। বার্ধক্য ভাতা মাসিক ৭৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে হাজার টাকা করা হয়েছে। এছাড়া কন্যাশ্রী প্রকল্পে যেমন বছরে ৭৫০ টাকা দেওয়া হত সেই টাকাটাও এবারে বাজেটে বাড়ানো হয়েছে। বছরে এবার এক হাজার টাকা করে দেওয়া হবে।

বিধানসভায় ২০১৮-১৯ অর্থবর্ষের জন্য রাজ্য বাজেট পেশ করতে গিয়ে অর্থমন্ত্রী অমিত মিত্র শারীরিক দিক থেকে বিশেষভাবে সক্ষমদের জন্য 'মানবিক' নামে আরও একটি নতুন প্রকল্পের কথাও ঘোষণা করলেন যার মাধ্যমে বিশেষভাবে সক্ষমরা রাজ্য সরকারের কাছ থেকে বিশেষ ভাতা পাবেন বলে জানানো হয়েছে। শারীরিক দিক থেকে বিশেষভাবে সক্ষমদের জন্য রাজ্য সরকারের বিশেষ প্রকল্প 'মানবিক'। এই প্রকল্পে ২ লাখ সুবিধাভোগীকে মাসে ১০০০ টাকা পেনশন দেওয়া হবে। ৫০ শতাংশের বেশি প্রতিবন্ধকতা রয়েছে এমন সব ব্যক্তিরাই এই সুবিধা পাবেন। 'মানবিক' প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ ২৫০ কোটি টাকা। ২০১৮-১৯ অর্থবর্ষের জন্য মোট বাজেট বরাদ্দ ২ লাখ ১৪ হাজার ৯৫৮.৭৫ কোটি টাকা ধার্য করা হয়েছে। গত অর্থবছরে ৮ লক্ষ কর্মসংস্থান হয়েছে। এবার আরও বেশি কর্মসংস্থানে জোর দেওয়া হবে। গৃহনির্মাণ শিল্পে গ্রামাঞ্চল ও শহরে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত মূল্যের সম্পত্তি ক্রয়ে স্ট্যাম্প ডিউটিতে ১ শতাংশ ছাড় দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন অর্থমন্ত্রী। এতদিন ৪০ লক্ষ টাকা থেকে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত সম্পত্তির উপর গ্রামাঞ্চলে স্ট্যাম্প ডিউটি ছিল ৬ শতাংশ আর শহরাঞ্চলে ছিল ৭ শতাংশ। এবার থেকে তা হবে যথাক্রমে ৫ শতাংশ এবং ৬ শতাংশ। কৃষকদের আর্থিক সহায়তা দেওয়ার লক্ষ্যে এবার থেকে চাষের জন্য জমি কিনলে আর মিউটেশন ফি দিতে হবে না। শুধু তাই নয় কৃষকদের সামাজিক সুরক্ষা দেওয়ার প্রশ্নেও রাজ্য সরকার বিশেষভাবে বাজেট বরাদ্দ করেছে। বৃদ্ধ কৃষকদের মাসিক ভাতা দেওয়ার যে প্রকল্প চলছে সেই প্রকল্পকে আর বিস্তৃত করার কথা ঘোষণা করলেন অর্থমন্ত্রী। প্রথমত মাসে সাড়ে সাতশ টাকা থেকে বাড়িয়ে হাজার টাকা করা হয়েছে ভাতার পরিমাণ। পাশাপাশি ভাতার আওতায় আনা হবে এক লক্ষ কৃষককে। এই খাতে ১২০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। পাশাপাশি কৃষকরা কোনও ফসল ফলানোর পর যদি ক্ষতির সম্মুখীন হন তবে পাশে পাবেন রাজ্য সরকারকে। অভাবী বিক্রি বন্ধ করতে ১০০ কোটির বিশেষ তহবিল তৈরি করছে রাজ্য সরকার। নজর দেওয়া হয়েছে চা বাগানেও। চা বাগানগুলির কৃষি আয়করে ১০০ শতাংশ ছাড় দেওয়ার কথা ঘোষণা করলেন অর্থমন্ত্রী। চা পাতা উৎপাদনের উপর শিক্ষা সেস ও গ্রামীণ কর্মসংস্থান সেস আর নেওয়া হবে না ২০১৮-১৯ অর্থবর্ষে।