শিক্ষায় পরিবর্তন আনতে সীমা কাম্বলের লড়াই

0

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ডিগ্রি দেয়, প্রকৃত শিক্ষা দেয় না। শিক্ষা কোনও মহান ব্রতও নয়, এটাও আসলে একটা প্রফেশন। যাঁদের আর কিছু করার নেই, তাঁরাই শিক্ষক হন!আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে কটাক্ষের সুরে অনেকে এমনই সব মত পোষণ করেন। এ ব্যাপারে উল্টো মতও রয়েছে। কিন্তু ছাত্রছাত্রীরা কী ভাবছে, তারা কী চাইছে তা অনেকক্ষেত্রেই অবহেলিত থেকে যায়। 

মুম্বইয়ের সীমা কাম্বলের কথা আজ আপনাদের সামনে তুলে ধরব। প্রথমেই সীমার সঙ্গে আলাপ করান যাক। এক নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা সীমা তাঁর স্কুল জীবনে ভালোমন্দ বিভিন্ন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে এগিয়েছেন। সীমা মেধাবি ছিলেন এমনটা নয়। তবে জেদ ছিল। প্রতিকূল পরিবেশ ও পারিবারিক অস্বচ্ছলতার মধ্যেও সীমা হার মানেননি। আর এখন জীবনের লক্ষ্য হিসাবে বেছে নিয়েছেন শিক্ষাকেই। বছর পঁচিশের সীমা এখন নিজেই শিক্ষয়ত্রীর ভূমিকায়।


ভালবাসার বন্ধনে সীমা কাম্বলে
ভালবাসার বন্ধনে সীমা কাম্বলে

নিজের অভিজ্ঞতা ইয়োর স্টোরির কাছে জানিয়েছেন সীমা। তাঁর নিজের মুখেই শোনা যাক তাঁর কথা -"প্রাথমিক স্কুল পর্যায়ে সেই সব দিনের কথা এখনও খুব মনে পড়ে। প্রথমে একটা প্রাইভেট স্কুলে পড়তাম।সেখান থেকে পরে ভর্তি করা হয় পৌরসভা পরিচালিত একটি স্কুলে। কী করে ছেলেমেয়েদের একটু-আধটু লিখতে শেখান যায় সেটাই যেন সেই স্কুলের একমাত্র লক্ষ্য ছিল। পড়ুয়ারা শেখার আনন্দ পাচ্ছে কি না তা দেখার কেউ ছিল না। এর সঙ্গে ছিল দৈহিক শাস্তি! সেই প্রথম শিক্ষার অসাম্যের দিকটি আমার চোখে ধরা পড়ে। আমি যেখানে থাকতাম তার পরিবেশও ভালো ছিল না। দিনরাত চিৎকার আর শব্দের আওয়াজে পড়াশোনায় মন বসাতেই পারতাম না। পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় বসবাস উঠিয়ে আমরা ওরলিতে গেলাম। ক্লাশ সিক্সে পড়ার সময় ওরলির নেহরু প্ল্যানেটোরিয়ামে একটা লার্নিং সেন্টার চালু করল আকাঙ্খা ফাউন্ডেশন। ভাবলাম এটা হয়তো বাচ্চাদের বিনামূল্যে পড়ানোর কোনও কেন্দ্র হবে বোধহয়। কিন্তু আমার ভুল ভাঙল যখন দেখলাম সেখানে মূল্যবোধের শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে।ছাত্রছাত্রীরা যে যেমনই হোক না কেন প্রত্যেককে যত্নের সঙ্গে শেখান হচ্ছে। আমি সেখানে নাম লেখালাম। সেখানে শিক্ষিকা হিসাবে পেলাম রাজশ্রী দিদিকে।শিক্ষাকে অন্যভাবে দেখতে শেখালেন তিনি। উৎকর্ষতা অর্জনের দিকে ঠেলতে লাগলেন আমাকে।মহারাষ্ট্রে পৌরসভা পরিচালিত স্কুলগুলো ক্লাশ সেভেন পর্যন্ত ইংলিশ মিডিয়াম।ফলে অষ্টম শ্রেণিতে উঠে আমাকে ফের একটি প্রাইভেট স্কুলে ভর্তি হতে হল। প্রাইভেট এই স্কুলে পড়ার মান উন্নত। ফলে তাল মেলাতে না পেরে হতাশায় ভুগতে লাগলাম আমি।সেই সময় রাজশ্রী দিদির সাহায্য কিছুতেই ভুলতে পারব না। আকাঙ্খা ফাউন্ডেশনে তখন সেভাবে যেতে পারতাম না। রাজশ্রীদিদি কিন্তু আমাকে টেনে টেনে নিয়ে যেতেন। বলতে পারেন তাঁর জন্যই খারাপ সময়টা পার হতে পেরেছিলাম " ।

এভাবেই একসময় কলেজে গিয়ে পৌঁছলেন সীমা। এরপর? সীমা বলে চলেন, "ভাবলাম আমার মতোই যারা এখন বড় হয়ে উঠছে, তাদের জন্য কিছু করতে হবে। কলেজে পড়ার পাশাপাশি আকাঙ্কা ফাউন্ডেশনে স্বেচ্ছাসেবক হিসাবে শিক্ষিকার ভূমিকা নিলাম। এর ফলে পরিশ্রম বেড়ে গেল কয়েকগুণ। সকালে ফাউন্ডেশনে পড়াতে যেতাম, সেখান থেকে কলেজ, কলেজের পরে এক্সট্রা ক্লাশ। আমার তখন দম ফেলার সময় নেই। বাড়ি ফিরতে রোজই রাত দশটা বেজে যেত। কিন্তু এত ব্যস্ততার মধ্যেও এত তৃপ্তি পেতাম যে কী বলব।আমি তখন একটা জিনিসই ভাবতাম। আমারই মতো নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা এইসব শিশুদের জন্য কিছু করতেই হবে।একসময় আকাঙ্খাতে পূর্ণ সময়ের চাকরি হিসাবে জনসংযোগ ও মার্কেটিংয়ে যোগ দিলাম। কিন্তু তখন আবার অন্য একটা জিনিস আমাকে টানছে।পরিবারে আর্থিক স্বচ্ছলতা আনার জন্য এমবিএ করব ঠিক করলাম। আবার ২০০৯ সালেই TFI প্রথমবারের জন্য একটা ফেলোশিপ প্রোগ্র্যাম নিয়ে এল। শাহিন দিদি (আকাঙ্খা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা শাহিন মিস্ত্রি)আমাকে সেখানে আবেদন করতে বললেন। কিন্তু আমি মনস্থির করতে পারছিলাম না। ২০১০ সালে শেষপর্যন্ত শাহিন দিদির উৎসাহেই ফেলোশিপের জন্য আবেদন করলাম। যদিও ভয়-ভয় করছিল। সেই ভয় কাটল যখন দেখলাম মুম্বইয়ের ওয়েলিঙ্কার ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্টে ১০০ শতাংশ স্কলারশিপ নিয়ে এমবিএ'তে ভর্তির সুযোগ পেলাম।ফেলোশিপ নিয়ে কাজ করতে গেলাম পুনেতে। সেখানে মিউনিসিপাল স্কুলে আমার শিক্ষাদানের দক্ষতা নিয়ে কেউ-কেউ প্রশ্ন তুললেন।কিন্তু একসময় স্কুলের প্রিন্সিপালও আমার প্রশংসা করতে বাধ্য হলেন।ফেলোশিপের শেষ পর্যায়ে ছোট-ছোট ছেলেমেয়েদের নিয়ে যে মিউজিক্যাল শো করেছিলাম সেটা সকলের নজর কাড়ল। এমনকী সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত সরকারি অফিসাররাও আমার কাজের প্রশংসা করলেন।আসলে আমার নিজের ওপর ভরসা ছিল। আমি জানতাম এইসব ছেলেমেয়েদের নিয়েও কিছু করে দেখান সম্ভব, শুধু তাদের সঙ্গে মিশতে হবে, ভালোবাসতে হবে"।


কচিকাঁচাদের সঙ্গে সীমা
কচিকাঁচাদের সঙ্গে সীমা

সীমার কাহিনি কিন্তু এখানেই শেষ নয়। সমাজকে কিছু ফিরিয়ে দেওয়ার তাগিদ সবসময় অনুভব করেছেন সীমা। এবার সেই গল্পই শোনা যাক সীমার কাছে। সীমা জানালেন,"টিএফআইতে ফেলোশিপ করার সময় সেখানে আমার বন্ধু ছিল গৌরব। সেই গৌরব একদিন বলেছিল, যদি সে কোনওদিন স্কুল প্রতিষ্ঠা করে সেখানে শিক্ষিকা হিসাবে আমাকে যোগ দিতেই হবে। সেই গৌরব একদিন সত্যিই গড়ে তুলল 3.2.1 স্কুল। ২০১২ সালে আমি তখন টিএফআই'তে প্লেসমেন্টের জন্য একটা আবেদন করেছি। এমন সময় শুনলাম 3.2.1 স্কুলে কিন্ডারগার্টেন টিচারের একটা পদ খালি রয়েছে। সে সময় রোগভোগের কারণে আমার শরীরটাও ভালো ছিল না। ফলে পূর্ণ সময়ের শিক্ষিকার দায়িত্ব নিতে দ্বিধায় ছিলাম। কিন্তু গৌরব আমাকে একপ্রকার রাজি করিয়ে ফেলল এবং আমিও সিদ্ধান্ত নিলাম স্কুলে পড়ানোর। দুটো বছর সেখানেই পড়ালাম। হয়ে গেলাম গ্রেড লিডার। এখন আমি হেড অব অ্যাকাডেমিকস। আমার ভূমিকা অনেকটাই প্রিন্সিপালের মতো"।

এই হল সীমার কথা। শিক্ষাকেই হাতিয়ার করে সমাজ বদলানোর লক্ষ্যে এগিয়ে চলা এক সাধারণ মেয়ের কাহিনি। পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায় থেকে আসা ছাত্রছাত্রীদের সমস্যা নিজে ভালোমতই জানেন। কোথায় ফারাক, সেই ফারাক কীভাবে মেটান যায় সেটাও বুঝেছেন। এখন একটু-একটু করে এগিয়ে চলা। একসময় রাজশ্রীদিদির দেখান পথ ধরেই।