ধৌলাগিরি জিতে রাজীবের তর্পন করলেন দীপঙ্কর

1

বিশ্বের সপ্তম সর্বোচ্চ শৃঙ্গ ধৌলাগিরি জয় করলেন পর্বতারোহী দীপঙ্কর ঘোষ। ২০ মে বিকেলে প্রথম বাঙালি হিসেবে এই শৃঙ্গে পা রাখেন হাওড়ার এই অভিযাত্রী। খবরটায় আনন্দ আছে। যেকোনও জয়েই যেমন থাকে কিন্তু তার থকেও বেশি আছে প্রতিস্পর্ধা। একটা অপারগতা, অসহায়তা আর পরাজয়ের গ্লানির মুখে ছাই ছিটিয়ে বিজয় কেতন উড়িয়ে আসার সাহস। এই সেই ধৌলাগিরি। ২০১৬-য় ২০ মে বেস ক্যাম্পে ফেরার সময় অক্সিজেনের ঘাটতিতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন এভারেস্টজয়ী পর্বতারোহী রাজীব ভট্টাচার্য। ধৌলাগিরি সামিট করতে পারেননি রাজীব। তাঁর সেই স্বপ্নই পূরণ করলেন দীপঙ্কর ঘোষ। রাজীবকে এভাবেই শ্রদ্ধা জানালেন দীপঙ্কর।

যখন যাচ্ছিলেন, তখনই তাঁর সিদ্ধান্ত নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন অনেকেই। যে শুনেছেন বারবার বলেছেন, ধৌলাগিরিই কেন? বিশেষ করে একবার যেখানে বিপদের মুখ থেকে ফিরে আসতে হয়েছিল বসন্ত সিংহরায় এবং দেবাশিস বিশ্বাসের মতো পর্বতারোহীদের। আর হারাতে হয়েছে রাজীব ভট্টাচার্যের মতো এভারেস্ট জয়ীকে। কিন্তু অভিযানে যাওয়ার আগে দীপঙ্কর স্থির করে নিয়েছিলেন লক্ষ্য। বলছিলেন, ২০১১ সালে রাজীবের সঙ্গে একসঙ্গে প্রথমবার আট হাজার মিটারের বেশি উচ্চতার মাউন্ট এভারেস্ট জয়ের স্বাদ পেয়েছিলাম। কিন্তু সেই রাজীব নেই। কিছুতেই তা মেনে নিতে পারছি না। তাই রাজীবের অধরা স্বপ্নকে পূরণ করতেই ধৌলাগিরিকে বেছে নিয়েছি। এ যেন ছিল তার অবাধ্য দুর্দমনীয় প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই। ২০ মে সেই লড়াইয়ে এক পর্বতারোহীর জয়ী হওয়ার দিন। ধৌলাগিরি শৃঙ্গে পা রেখে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন দীপঙ্কর। দীপঙ্করের এই সাফল্যে স্বাভাবিকভাবেই গর্বিত তাঁর পরিবার ও অভিযাত্রী বন্ধুরা। কাঠমাণ্ডু থেকেই এ বছর লোৎসে শৃঙ্গজয়ী দেবাশিস বিশ্বাস বলেন, এটা দারুণ জয়। ধৌলাগিরি গিয়ে মৃত্যুর মুখ থেকে ফেরা এভারেস্ট জয়ী পর্বতারোহী বসন্ত সিংহরায় বলেন, গত কয়েকদিন সকলে এই দিনটার দিকে অধীর আগ্রহে তাকিয়েছিলাম। সফল হবে বিশ্বাস ছিল। বাঙালির শৃঙ্গ জয়ের নতুন পালক জুড়ে দিল ছেলেটা। রীতিমতো উচ্ছ্বসিত বসন্ত বাবু।

এভারেস্ট, অন্নপূর্ণা বা কাঞ্চনজঙ্ঘার তুলনায় ধৌলাগিরি অভিযান কিছু অংশে কঠিন। অভিযাত্রীদের ভাষায়, ধৌলাগিরি হল মাউন্টেন অফ স্টর্ম বা ঝড়ের পাহাড়। প্রথমত, এর উপরের দিকের অংশে প্রচণ্ড হাওয়া বয়। দ্বিতীয়ত, ৮ হাজার মিটারের শৃঙ্গগুলির ক্ষেত্রে বেস ক্যাম্পের পর ৪টি করে ক্যাম্প তৈরি করা হয়। ধৌলাগিরিতে চতুর্থ ক্যাম্প করার জায়গা না থাকায় তিনটে মাত্র ক্যাম্প করা হয়। ফলে তৃতীয় ক্যাম্প থেকে শৃঙ্গ পর্যন্ত পৌঁছতে সময় লাগে অনেকটাই। তৃতীয়ত, এই রুটে অভিযাত্রী কম থাকায় খুব বেশি সাহায্য পাওয়া যায় না। দীপঙ্করের ধৌলাগিরি শৃঙ্গ আরোহণ শুধু তাঁর বা রাজীবের নয়, বাঙালির অধরা স্বপ্নকেই পূরণ করা।

২০১৩ সালে এই ধৌলাগিরি (৮১৬৭ মিটার) অভিযানে গিয়ে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছিলেন বসন্তবাবু এবং দেবাশিসবাবু। তারপরে ২০১৬ সালে রাজীব ভট্টাচার্যকে আর ধৌলাগিরি থেকে জীবিত অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। দীপঙ্করবাবুর সাফল্যে আনন্দিত বাঙালি পর্বতারোহীদের দাবি, ২০১০ সালে বসন্ত এবং দেবাশিসবাবুর হাত ধরে এক নতুন যুগের সূচনা হয়েছিল। এবার দীপঙ্করবাবুর সাফল্য এই পথকে আরও মসৃণ করবে।

দীপঙ্কর ঘোষ এখনও পর্যন্ত সফলভাবে এভারেস্ট, কাঞ্চনজঙ্ঘা, লোৎসে, মানাসলু শৃঙ্গ জয় করেছেন। এবার সেই তালিকায় সংযোজিত হল ধৌলাগিরি। এই নিয়ে আট হাজার মিটারের বেশি ৭টি শৃঙ্গ জয় করলেন দীপঙ্কর। এছাড়াও তিরিশটিরও বেশি শৃঙ্গজয়ের কৃতিত্ব আছে তাঁর। এজন্য ২০১৫ সালে হরিয়ানা সরকারের থেকে ভারত গৌরব সম্মান পান দীপঙ্কর। আর এবার তাঁর ধৌলাগিরি জয় বাঙালিকে নতুন করে গর্বিত করল।