প্রবীণ নাগরিকদের বন্ধু Support Elders

1

বয়স যত বাড়ে, শরীরের কুঞ্চন হয় আর মনের কুঞ্চন সে দেখা যায় না। কিন্তু হয়। মানুষের মন বয়সের সাথে সাথে ভারাক্রান্ত হয়ে যায়। এত স্মৃতি, এত নস্টালজিয়া, এত সাফল্য কাউকে কাউকে জীবনের প্রতি প্রগাঢ় তৃপ্তি দেয়, নিশ্চয়ই। আবার যেসব সাফল্য কখনও ছোঁয়া যাবে না, সেই সব নিয়ে গভীর হতাশাও থাকে। অক্ষম প্রতিস্পর্ধা, বিরক্তি, আর মিথ্যে অহমিকা মিলে মিশে এমন জটিল রাসায়নিক ক্রিয়া ঘটায় যা মনকে অসুস্থ করে। শরীরে তার প্রভাব পড়ে। এর নাম বয়স। চিন্তা তখন শতধা। সকলের জন্যে একা একা ভেবে মরার নাম বয়স। অথচ গোটা পরিবার নিজের মত করে পল্লবিত। নিজের মত করে ভালো থাকে। একটা অন্ধকার টানেলের ভিতর দিয়ে অনিশ্চয়তার দিকে এগিয়ে যাওয়া, যত এগিয়ে যাচ্ছেন ততই অন্ধকার টানেল আরও বড় দৈত্য হয়ে আপনাকে ভয় দেখাচ্ছে। পিছনে একবার ঘুরে তাকানোর ইচ্ছে করছে না। কী অসামান্য আলো এতদিন ধরে জ্বালিয়ে এসেছেন আপনি। কেউ আপনার হাত ধরছে না আপনি কেবলই একা হয়ে যাচ্ছেন। এবং চারদিক থেকে অপরিচিত মানুষের কলরব শুনতে পাচ্ছেন। কাউকে চেনেন না। শুধু মন টনটন করছে যার জন্য সে দূরে থাকে। এই কোটি কোটি মানুষের ভিড়ে আপনার কি কোনও বন্ধু নেই। সেদিন পার্কেও যে লোকটার সঙ্গে বসে কথা বলছিলেন সে গতকাল সন্ধ্যায় আপনাকে গুডবাই বলে চলে গেছে। শোক সেও এক অঙ্গাঙ্গী বিষয়। এখন... আপনি কি আর কারও সঙ্গে কথা বলতে পারবেন না...! এরকম অনেক দুর্ভাবনা আপনাকে যদি ঘিরে ধরে তবে অপ্রতিমের কথা শুনুন। অপ্রতিম চট্টোপাধ্যায়। একটি সংস্থা চালান। কলকাতায়। Support Elders এমন একটি সংস্থা যা এই শহরের বয়স্ক নাগরিকদের আক্ষরিক অর্থেই সঙ্গ দেয়। গল্ফগ্রিনে অফিস। কিন্তু গোটা শহরের যেকোনও প্রান্তে পৌঁছে যেতে পনের থেকে কুড়ি মিনিট সময় নেন ওঁরা। শুধু আপনার পাশে থাকার জন্যে ওঁরা ২৪ ঘণ্টা মুখিয়ে রয়েছেন। পঞ্চাশের পর থেকে যেকোনও বয়সের মানুষ চাইলেই নাম নথিভুক্ত করতে পারেন। আর পেয়ে যেতে পারেন বিপদে আপদে একগুচ্ছ বন্ধুকে।

অপ্রতিম বলছিলেন ওদের সংস্থার কার্যপদ্ধতি। কেউ নথিভুক্ত হতে চাইলে অনলাইনে কিংবা অফলাইনে নাম রেজিস্টার করতে পারেন। তাহলেই ওরা আপনাকে হাত ঘড়ির মত দেখতে একটি ডিভাইস উপহার দেবেন। সময় দেখা যাবে আর পাশাপাশি আপনার সর্বক্ষণের এক বন্ধুর কাজও করবে ওই ডিভাইস। আপনি চাইলে ওই ডিভাইস থেকে বিনেপয়সায় কথা বলতে পারবেন অপ্রতিমদের সাপোর্ট টিমের সঙ্গে। কোনও অসুবিধে হল জানাতে পারবেন ওঁদের। একটি বোতাম টিপে দিলেই ওরা সতর্ক হয়ে যাবেন। বুঝে যাবেন যে আপনার ওদের সহযোগিতা দরকার। পৌঁছে যাবে টিম। রাতদিন সাতদিন সজাগ টিম। নিয়মিত আপনার সঙ্গে ফোনে কথা বলবেন ওঁরা। কেমন আছেন, কী করছেন জানতে চাইবেন। পাশাপাশি সপ্তাহে একদিন এসে দেখেও যাবেন আপনাকে। ওরা মানে একদল অবসরপ্রাপ্ত ফৌজি। ব্রিগেডিয়ার সত্যেশ নাথ ভাদুড়ীর নেতৃত্বে বয়স্ক নাগরিকদের প্রতি সহানুভূতির হাত পৌঁছে দেওয়াটাও যুদ্ধ কালীন তৎপরতায় সারেন ব্রিগেডিয়ার ভাদুড়ী ও তাঁর জাঁবাজ সেপাইরা।

জীবনের যুদ্ধ। ভালোবাসার যুদ্ধ। জীবনের সীমান্ত আগলানোর কাজটাই কলকাতায় করে যাচ্ছেন জনা পনের অবসরপ্রাপ্ত ফৌজি। বয়স তাঁদের পঞ্চাশের কম। শারীরিক ক্ষমতায় কুড়ি জনকে কাবু করে দিতে পারেন এখনও। অসাধ্য সাধন করার রীতিমত হিম্মত রাখেন।

অপ্রতিম বলছিলেন, বয়স্ক মানুষের অনেক অসুবিধে। সবথেকে বড় অসুবিধে দিনের পর দিন শারীরিক ভাবে অপারগ হয়ে পরার মধ্যে দিয়ে আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলা। আর যদি বয়স্ক নাগরিকেরা একা হন তাহলে তো কথাই নেই, দুর্বলের ওপর পৌরুষ দেখাতে হাজির হওয়া লোকের তো এই সমাজে অভাব নেই। ফলে দেওয়ালে পীঠ ঠেকে যাওয়ার মত পরিস্থিতি তৈরি হয়। আমাদের সাপোর্ট টিমের অবসরপ্রাপ্ত ফৌজি সঙ্গীদের বন্ধু হিসেবে পেলেই আত্মবিশ্বাস নিমেষে ফিরে পান ওঁরা। তারওপর যখন শুরু হয় জীবনের যুদ্ধে ওদের সঙ্গে নিয়ে লড়াই করা তখন আমাদের মেম্বারেরা টের পান তাঁদের এখনও জীবন আছে। এবং বেঁচে থাকার মত সুন্দর আর কিছুই হয় না।

এবার একটু অপ্রতিমের কথা বলি। অপ্রতিম এই শহরেরই মানুষ। সামাজিক উদ্যোগপতি হওয়ার আগে বিভিন্ন সংস্থায় বিপণন বিভাগে কাজ করেছেন। ম্যানেজমেন্ট সামলেছেন। টেক মহিন্দ্রা, টাটা এআইজি, বেনেট কোলম্যান, আইসিআইসিআই ব্যাঙ্কে উঁচু-পদে কাজ করেছেন। কিন্তু ইচ্ছে ছিল উদ্যোগের দুনিয়ায় পা রাখার। তাও আবার যে সে উদ্যোগ নয়, এমন কোনও উদ্যোগ যাতে সমাজেরও কিছু ভালো হয়। সাত পাঁচ ভেবেচিন্তে শুরু করে দিলেন সাপোর্ট এল্ডার্সের কাজ। শুরু থেকেই সিড ফান্ড পেয়েছেন অপ্রতিম। পথ চলা শুরু করেছেন ২০১৫ সালে। ধীরে ধীরে এগোচ্ছেন তিনি, এই শহরে কয়েকশ মানুষ এখন অপ্রতিমদের সংস্থা সাপোর্ট এল্ডার্সের মেম্বার।

মেম্বার হতে নাম মাত্র কিছু টাকা প্রথমে দিতে হয়। তারপর প্রতি মাসে মাত্র দু হাজার টাকা মাসিক ফি। শুধু শারীরিক সমস্যা নয়, সামাজিক সমস্যা বা যেকোনও ধরণের সমস্যা যেমন এই সাপোর্ট এল্ডার্সের সহযোগিতা পাবেন তেমনি পাবেন প্রশিক্ষণও। কেননা সমীক্ষা বলছে বয়স্ক মানুষেরা যত বেশি ব্যস্ততার ভিতর থাকবেন ততই মনে স্ফূর্তি থাকবে, হতাশা গ্রস্ত হয়ে পরবেন না। আর তার ফলে শরীরও ভালো থাকবে। তাই কম্পিউটার যেমন শেখানোর ব্যবস্থা আছে তেমনি নিত্য নতুন প্রযুক্তি সম্পর্কে রীতিমত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। যাতে বয়স্ক নাগরিকেরা এই ওয়াই ফাই কলকাতায় নিজেকে পিছিয়ে থাকা দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় শ্রেণির মনে না করেন। এভাবেই সমাজের কাজ করে যাচ্ছেন উদ্যোগপতি অপ্রতিম। সঙ্গে পেয়েছেন আইকেপি নলেজ পার্কের চেয়ারম্যান দীপান্বিতা চট্টোপাধ্যায়কে।

ফলে আর ভীষণ একা লাগা নয়। ভীষণ নিরাপত্তাহীন বোধ করা নয়। এই মানুষের ভিড়ে নির্জন দ্বীপ হয়ে যাবেন না। আপনি খুঁজুন এমন কাউকে যে আপনার বিপদে আপদে পাশে থাকার জন্যে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। এমন একটি সংস্থা যে আপনার সব সময় খেয়াল রাখে এবং আপনার প্রিয়জনের সঙ্গে সব সময় যুক্ত রাখে আপনাকে। Support Elders এই কাজটা করতে চাইছে আপাতত কলকাতায়, খুব শিগগিরই দেশের অন্য শহরেও ছড়িয়ে যাবেন অপ্রতিম, দীপান্বিতারা।