ডিজাইনার সব্যসাচী চান বাংলার শিল্প মর্যাদা পাক

0

বাবা-মা চেয়েছিলেন ছেলে ইঞ্জিনিয়ার হোক। তাই NIFTতে পড়ার ইচ্ছেটা গুরুত্বই দেননি বাড়ির কেউ। কিন্তু অদম্য সব্যসাচীর কাছে পাখির চোখ ছিল ফ্যাশন ডিজাইনিং। নিজের বই বিক্রি করে অ্যাডমিশন ফি ভরেছিলেন ছেলেটা। তারপর আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। ১৯৯৯ সালে গ্রাজুয়েশন। তারপর ওয়ার্কশপ। ২০০১ এ ফেমিনার তরফ থেকে মোস্ট আউটস্ট্যান্ডিং ডিজাইনারের সম্মান।

ব্যক্তির নিজস্ব স্বাভাবিকতাই তার পোশাকে প্রতিফলিত হওয়া উচিত বলে বিশ্বাস করেন সব্যসাচী।

হাজরা রোডের সেই ছোট্ট ওয়ার্কশপ থেকে এখন তোপসিয়ার বহুতলে সব্যসাচী মুখার্জি একটি ব্র্যান্ড। এই মুহূর্তে দেশের সেলেব্রিটি ডিজাইনারদের এক জন কলকাতার এই এই ছেলে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে তার ব্র্যান্ড শো করেছে। ২০০৪ এ মিলান ফ্যাশন উইকের ব়্যাম্প মাতিয়েছেন। গোটা দুনিয়া তাঁর ফ্যাশন ফিলসফি 'ব্যক্তিগত স্বাভাবিকতার সৌন্দর্য'-এ মুগ্ধ। আন্তর্জাতিক স্তরে তাবড় সমালোচকদের কাছে ভূয়সী প্রশংসা পেয়েছে তাঁর কাজ। লাক্সের বিজ্ঞাপনে দীপিকা পাড়ুকনের পরনের শাড়িটাও সব্যসাচীর ক্রিয়েশন। আজকের এই খোলা আকাশের তলায় একটা জ্বলজ্বল করা তারা হয়ে ওঠার আগে কঠিন সময়ও কম দেখেননি। লড়াই করেছেন দীর্ঘদিন। কিন্তু সেই সময়গুলো থেকে শিক্ষা নিয়েছেন ফ্যাশন টেকনোলজির কৃতী ছাত্র। একটা সময় টিফিন বক্সে করে গয়না বিক্রি করেছেন একটা সময়। রাস্তায় আলাপ হয়েছে বিপাশা বাসু, কোয়না মিত্রর সঙ্গে। এরা সকলেই ওর ডিজাইনের ফ্যান। ফ্যানদের তালিকা বেশ লম্বা আর সেলেব্রিটিতে ঠাসা। সব্যসাচী বলিউডে ভীষণ পছন্দের একটি নাম। ফ্যাশন দুনিয়ায় রীতিমত রাজত্ব করছেন। ব়্যাম্প মাতিয়েছেন। এবার মন দিয়েছেন গয়নায়।

আপনি যদি তোপসিয়ায় যান দেখতে পাবেন ওর কালেকশন। চোখ ধাঁধানো গয়নার জেল্লা। কীভাবে গয়না নিয়ে মাতলেন জানতে চাইলেই একগাল দাড়ির আড়াল থেকে উঁকি মারে হাসির ঝিলিক। মা। মায়ের গয়না দেখে দেখে গয়নার মোহে পড়া। দাদুও শৌখিন মানুষ ছিলেন। পুরনো কলকাতার হেন কোনও বেনে নেই যার কাছ থেকে গয়না গড়াননি দাদু। আর দাদুর প্রিয় নাতির সঙ্গেই গয়নাগাটির ডিজাইন নিয়ে চলত নানান শলা পরামর্শ। কেমন হলে কেমন হয় গোছের। এসব দেখে দেখে, ভেবে ভেবেই বড় হয়েছেন। আর সৌন্দর্য শিল্প কারুকার্যের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছেন। ফলে বাবা মা চাইলেই তো আর হল না। সব্যসাচী চেয়েছিলেন ফ্যাশন ডিজাইনার হতে। ভালো ডিজাইনের জন্যে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছুটেছেন সব্যসাচী। কখনও ফ্লোরেন্সে, কখনও মধ্যপ্রাচ্যের অলি গলি, কখনও উপজাতি অধ্যুষিত এলাকায়।

গয়না ডিজাইন করার কাজ যখন শুরু করেন সেই সময় ‘গাজা’র সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধেছিলেন। তারপর ‘কৃষ্ণদাস অ্যান্ড কোং জুয়েলার্স’ এর সঙ্গে। কিন্তু সন্তুষ্টি বলতে যা বোঝায় সেটা তিনি সেভাবে পাননি। তাই একাই কাজ শুরু করেন। নান্দনিক প্রয়োজনে কোনও কার্পণ্য সহ্য করেন না এই ডিজাইনার। কারও কোনও খবরদারি সইতে পারেন না। লক্ষ্যে অটল। এবার হীরে নিয়েও কারিকুরি শুরু করেছেন। হাতে শুধু দেশের সেরা কারিগরই নয় বিশ্বের সেরা ব্র্যান্ডও আছে। রীতিমত তাঁর সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে কাজ করছে ওই সব ব্র্যান্ড। সোনা, হিরে এসব নিয়ে কাজ না করলে গয়নার ব্যবসা করাটা উপভোগ্যই নয় বলছিলেন তরুণ এই উদ্যোগপতি।

ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতার মেলবন্ধন খুঁজে পাওয়া যাবে ওর কাজে। লাহোরি চাঁদবালি, অমৃতসরি টিকা, কিছু কিছু কালেকশন এসেছে চেত্তিনাদ থেকে, কোনওটা আবার চেন্নাই, মহারাষ্ট্র, বিকানের, যোধপুরের। আছে বাংলার কারিগরদের বানানো কাজও। বাংলাকে নিয়ে বিশেষ স্বপ্ন দেখেন সব্যসাচী। সেই মতো পরিকল্পনাও করে ফেলেছেন। তিনি মনে করেন বাংলার কারিগরদের আরও মর্যাদা পাওয়া উচিত ছিল। সেই প্রাপ্য মর্যাদা ফিরিয়ে দিতে চান সব্যসাচী। ফলে একা এগোনো লক্ষ্য নয়। সমষ্টিকে নিয়ে ভাবছেন এই ডিজাইনার।