বড়দিনের পছন্দ কুক-ও-ক্রাফ্টের কেক চকোলেট

0

বড়দিন। সাজো সাজো পার্ক স্ট্রিট। একদিকে পিঠে-পুলি, আর একদিকে কেক-পেস্ট্রি। গন্ধে ম ম চারদিক। 

কলকাতায় এবার ক্রিসমাসে কেক-চকোলেটের নতুন ডেস্টিনেশন কুক-ও-ক্রাফ্ট। শহরের মহিলা উদ্যোগপতি জ্যোতি তাপারিয়ার নতুন স্টার্টআপ। বাড়িতে বানানো হরেক রকম ডিজাইনার কেক এবং চকোলেটের সম্ভার নিয়ে স্টার্টআপের জমি দখলে নেমে পড়েছেন কাঁকুরগাছির এই তরুণী। 

বরাবরই নতুন এবং সৃষ্টিশীল কিছু করতে ভালোবাসেন জ্যোতি। ক্রাফ্টওয়ার্ক, আর্টওয়ার্ক এবং নতুন নতুন ডিজাইন বানানোয় তাঁর জুড়ি মেলা ভার। পাশাপাশি, বাবা ব্যবসায়ী হওয়ায় ছোট্টবেলা থেকে বাড়িতে সেই পরিবেশও পেয়েছেন। নিজের সৃষ্টিশীলতাকে কাজে লাগিয়েই তাই নিজের কিছু করার ইচ্ছে জ্য়োতির। ইউটিউবে কেক, চকোলেট বানানোর পদ্ধতি দেখে দেখে প্রায়ই বাড়িতে সেগুলো নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করতেন। ব্যস্, গতবছর এভাবেই একদিন ক্লিক করে গেল আইডিয়া। 

জ্যোতি বললেন, "দাদা আমার আগ্রহ সম্পর্কে জানত। তাই কেক এবং চকোলেট ডিজাইনিং নিয়ে দাদার সঙ্গে একদিন কথা বলতে বলতেই ঠিক করে ফেললাম, আমার স্টার্টআপ হবে এই নিয়েই। সৃজনশীলতাই যে আমাকে সকলের চেয়ে আলাদা হতে সাহায্য করবে সেই বিশ্বাস ছিল। এভাবেই জন্ম নিল কুক-ও-ক্রাফ্ট।"

এবছর ৩০জুলাই কাজ শুরু করেছে কুক-ও-ক্রাফ্ট। ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে তাঁদের কেকের ফ্যান। সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইট বিশেষত ফেসবুক এবং ফোনের মাধ্যমেই অর্ডার নিচ্ছেন ওরা। তবে পুরো কর্মকাণ্ডে সর্বক্ষণ জ্যোতি তাপারিয়ার সঙ্গে রয়েছেন তাঁর পরিবারের সদস্যরা। জ্যোতি বলেন, "এমন বাবা,মা এবং পরিবার পাওয়া সত্যিই সৌভ্যাগ্যের বিষয়। আমি ঈশ্বরের থেকেও ওঁদেরই বেশি ধন্যবাদ দেব।" ছোট্ট একটা ভাবনাকে এতটা বড় করে গড়ে তুলতে সবরকম সাহায্য করেছে ওঁঁর পরিবার। তিনি জানেন তিনি একা নন। পরিবারের প্রত্যেকে সঙ্গে রয়েছে। বাবা সবসময় উৎসাহ জুগিয়েছেন। মা হোমমেকার। তিনিও নিজের মতো করে সর্বক্ষণ সাহায্য করে চলেছেন। কাজের ক্ষেত্রে বিশেষ করে জ্যোতির সঙ্গে রয়েছেন তাঁর বড় ভাই প্রকাশ তাপারিয়া। সংস্থার সৃষ্টিশীল বিষয়টা যেমন সামলান জ্যোতি, মার্কেটিং এবং নেটওয়ার্কিংয়ের পুরো দায়িত্ব প্রকাশের। 

প্রচারের প্রয়োজনীয়তা তাঁরা ভালোই বোঝেন। তাই বিভিন্ন ইভেন্টে অংশ নিচ্ছেন। ব্যাঙ্কোয়েট হলে স্টল দিচ্ছেন। ৩০জুলাই প্রথমবার নিজের সংস্থাকে জনসমক্ষে নিয়ে আসার দিনটি এখনও ভোলেননি জ্যোতি। সেদিন অঝোরে বৃষ্টি পড়ছিল। আমরা কুক-ও-ক্রাফ্ট লঞ্চ করার জন্য একটা ব্যাঙ্কোয়েট হলে স্ট্যান্ড বুক করেছিলাম। খালি প্রার্থনা করছিলাম যাতে অন্তত কিছু মানুষ আমার কেক, চকোলেট পছন্দ করেন। একজন মহিলা এলেন। আমার বানানো জিনিস তাঁর এতো পছন্দ হল যে তিনি সবটাই কিনে নিলেন।" এরপর থেকেই সকলের মুখে মুখে ঘুরতে শুরু করেছে কুক-ও-ক্রাফ্টের নাম। কাজ শুরু করার মাত্র দু'মাসের মধ্যে কুক-ও-ক্রাফ্টের ফেসবুক পেজে লাইক-এর সংখ্যা হাজার ছাড়িয়েছে।

অক্টোবরে শুধুই বিভিন্ন প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছেন তাঁরা। রয়্যাল বেঙ্গল ব্যাঙ্কোয়েট (সিটি সেন্টার, সল্ট লেক), স্যাফায়ার ব্যাঙ্কোয়েট-এর মতো জায়গায় প্রদর্শনীর পাশাপাশি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেও স্পনসর করেছেন জেটি- কেক ও চকোলেট। সম্প্রতি গায়ক শান-এর কর্মজীবনের ২৫বছর পূর্তি হিসেবে একটি বেসরকারি চ্যানেলের আয়োজিত অনুষ্ঠানে শানের জন্য বিশেষ পিয়ানো থিম কেক ডিজাইন করেছে কুক-ও-ক্রাফ্ট।

জ্যোতি বিশ্বাস করেন তাঁর কেক এবং চকোলেট স্বাদে, ডিজাইনে অন্য সকলের চেয়ে আলাদা। এখনও পর্যন্ত কেক-এর দাম ৮০০-৯৫০ টাকা। এবং চকোলেটের দাম ১৫০-১৫০০ টাকার মধ্যে। তাঁর মতে ক্রেতাদের কাছে এই নতুন স্বাদ এবং ডিজাইনকে গ্রহণযোগ্য করে তোলাই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। তবে একবার বানানো প্রোডাক্টের চাহিদা টিকিয়ে রাখা এবং গুণগত মান এক রেখে তা বানানো এবং বিক্রি করতে পারাই জ্যোতির মতে পরবর্তী বড় হার্ডল। নিজের সংস্থার গুণগত মানের সঙ্গে কোনওভাবেই আপোস করতে রাজি নন এই খুঁতখুঁতে উদ্যোগপতি।

নির্দিষ্ট হারে অর্থের জোগান পাওয়া মুশকিল; পার্টি বা ইভেন্ট থাকলে যে রোজগার হয়, অন্য সময় তা হয় না। শীঘ্রই হোম ডেলিভারি পরিষেবাও শুরু করতে চান জ্যোতি। তার জন্য সঠিক সংস্থাকেই সহযোগী হিসেবে বাছতে চান ওঁরা।

পরের পরিকল্পনা কী ?

যাঁরা একবার কুক-ও-ক্রাফ্টের কেকের স্বাদ পেয়েছেন তাঁদের অনেকেই আর অন্য কোথাও কেক কিনতে রাজি নন। জ্যোতিও তাঁর এই সাফল্য ধরে রাখতে বদ্ধপরিকর। "আমার এখন একটাই লক্ষ্য, নিজের সংস্থাকে এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত করা যাতে হোমমেড কেক এবং চকোলেটের কথা বললে সকলের চোখের সামনে একটাই নাম ভেসে ওঠে, 'কুক-ও-ক্রাফ্ট।'" তবে এরই পাশাপাশি বেকারি প্রোডাক্ট তৈরীর প্রশিক্ষণ দেওয়ার ভাবনাচিন্তাও করছেন জ্যোতি। নিজের ব্যবসাকে তিনি রিটেল এবং অনলাইন, দুই ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে চান।

নিজের এবং বাবার সঞ্চিত অর্থ দিয়েই স্টার্ট আপ-এর পথে হেঁটেছিলেন জ্যোতি তাপারিয়া। ইতিমধ্যেই কিছু সংস্থা এবং অ্যাঞ্জেল ইনভেস্টর তাঁদের উদ্যোগে বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছেন। যদিও এধরণের কোনও পদক্ষেপ খুব ভেবেচিন্তেই নিতে চান তিনি। আগে যেখানে তাঁরা মাসে ৩-৪টি অর্ডার পাচ্ছিলেন, এখন সেই জায়গায় অন্তত ১০টি বড় অর্ডার আসছে। খুব অল্পদিনের মধ্যেই ব্রেক ইভনে পৌঁছেছেন। গত তিন-চার মাসে অন্তত ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পয়েছে তাঁদের ব্যবসা। এই জায়গাটা ধরে রাখতে চান জ্যোতি। আর সেই কারণেই কোনও বড় পদক্ষেপের আগে সাথপাছ ভাবতে চান। তাঁর পাশে সবসময় থাকার জন্য দাদা প্রকাশ আর বন্ধু সঞ্জয় মাহাতো এবং পরামর্শদাতা গুলরেজ আলম-এর কাছে তিনি কৃতজ্ঞ।

গত কয়েক মাসের অভিজ্ঞতা জ্যোতিকে অনেক কিছু শিখিয়েছে। আর সেই কারণেই তরুণ উদ্যোগপতিদের উদ্দেশ্যে তাঁর বার্তা: "আপনি যদি জনসমক্ষে কোনও বার্তা পৌঁছতে চান, তাহলে নির্ভীকভাবে এগিয়ে আসুন। কারণ নতুন ভাবনা সবসময় প্রশংসনীয় এবং মানুষের কাছে তা পৌঁছনো অত্যন্ত জরুরি।"