সম্পর্কের সেতুবন্ধন QuackQuack.in

0

বন্ধুত্বে বিপ্লব এনে দিয়েছিল অরকুট, ফেসবুক। দেশে-বিদেশে হাজারো বন্ধু। হারিয়ে যাওয়া কত বন্ধুরইতো হদিশ দিল অরকুট-ফেসবুকেরা। শুধু বন্ধুত্বে আটকে থাকেনি। বন্ধুত্বের চেয়ে আরও বেশি, বিশেষ বন্ধুত্বও যে কত হয়ে গেল তার কোনও ইয়ত্বা নেই। ফেসবুকে বন্ধুত্ব থেকে ডেটিং এখন আর নতুন কিছু নয়। স্যোশাল নেটওয়ার্কিং সাইটে অনলাইনে চুটিয়ে প্রেম তো হাইটেক ট্রেন্ড। হরদম চলছে চারদিকে। বলতে গেলে টিন এজারদের স্ট্যাটাস সিম্বল!

আর এই অনলাইন ডেটিং ট্রেন্ড ভারতে যে কতটা, তার একটা হিসেব দিয়েছে রাষ্ট্রসংঘ। তাদের হিসেবে, বিশ্বের মধ্যে ভারতেরই যুবসমাজের সবচেয়ে বড় অংশ অনলাইন ডেটিং এ অভ্যস্ত। এবং এটাকেই সুযোগের খনি হিসেবে দেখছে অনলাইন ডেটিং ইন্ডাস্ট্রি। অনলাইন ডেটিং নিয়ে ট্যাবু ছিল, সঙ্গী খোঁজার সাহসী চেষ্টা হিসেবে কত নিন্দে-মন্দ করা হত। আর এখন বিশ্বজুড়ে এটাই স্বাভাবিক!

টিম QuackQuack.in
টিম QuackQuack.in

আন্তর্জাতিক স্তরে প্রতিনিয়ত বৃদ্ধির সিঁড়িতে চড়ে ‘টিন্ডার’ এখন ১.৬ বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা। ভারতও এই সুযোগের বাজারে খুব একটা পিছিয়ে নেই। ২০১৫র মার্চে ভারতীয় অ্যাপ TrulyMadly বিনিয়োগের প্রথম দফাতেই ৩৫ কোটি টাকা তুলে নেয়। ২০১৫ র জুলাইয়ে আইডিজি ভেঞ্চার iCrushiFlush এ বিনিয়োগ করে, যার পরিমান এখনও গোপনই রয়ে গিয়েছে।

একই পদাঙ্ক অনুসরণ করেছে QuackQuack.in। রবি মিত্তল, এক তরুণ উদ্যোক্তার হাত ধরে ২০১০ (টিন্ডারের আগে) সালে এই ওয়েবসাইটের জন্ম। ইতিমধ্যে ১০ লক্ষ রেজিস্ট্রেশন ছাড়িয়ে গিয়েছে। বাবার ব্যাটারি তৈরির ব্যবসায় ১৬ বছর বয়সে হাতেখড়ি রবি মিত্তলের। একরকম বন্ধু-বান্ধবদের চাপাচাপিতে ‘বন্ধু খোঁজা’ বা ‘ডেট পাওয়া’র মত অনলাইন ওয়েবসাইট শুরু করেন ২০১০ এ। রবি অবাক হয়ে যান, সেই সময় ভারতীয়দের জন্য আলাদা কোনও ডেটিং প্ল্যাটফর্ম সেভাবে খুঁজে পাওয়া যেত না। চেনা-জানাদের মধ্যে বেশির ভাগই বিশেষ সঙ্গী পেতে এবং পরস্পরের সঙ্গে সময় কাটাতে Shaadi.com অথবা ফেসবুকে হামলে পড়ত।

রবি মিত্তল, কর্নধার,QuackQuack.in
রবি মিত্তল, কর্নধার,QuackQuack.in

রবি তখন ইউরেকা মোমেন্টে। নিজের সমস্ত শ্রম ভারতের সিঙ্গেলসদের (‌যারা এখনও সঙ্গী বাছাই করে উঠতে পারেননি)জন্য মঞ্চ বা প্ল্যাটফর্ম তৈরিতে ঢেলে দিলেন। দু কামরার একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নেন। নিজের টিম তৈরি করেন। নিজের উদ্যোগ এবং টিমের ভরসায় গড়ে ফেললেন QuackQuack.in। QuackQuack.in শুরু আগে এই ধরনের উদ্যোগের জন্য বাজার কতটা তৈরি দেখতে গুগুল অ্যাড ও ফেসবুকে ডামি বিজ্ঞাপন ছাড়েন রবি। বিস্মিত রবি দেখেন প্রতি ১০০ ক্লিকে অন্তত ২০ জন সাইনআপ করছেন। যা বুঝিয়ে দিয়েছিল কেমন বাজার পেতে চলেছেন তরুণ উদ্যোগপতি।

বর্তমানে ডেভেলপার, ডিজাইনার, দক্ষ UI / UX, মডারেটর, ডিজিটাল মার্কেটিং নিয়ে ১৫ সদস্যের একটা দল QuackQuack.in এ প্রাণ সঞ্চার করে। বাজারে দারুণ সাড়া পেয়েছে এই ভেঞ্চার। গত এক বছরে QuackQuack.in ৫ লক্ষ ইউজার যোগ করেছে। এবং এখন থেকে আগামী ৩ বছরে ইউজারের সংখ্যা ৫০ লক্ষে নিয়ে যাওয়ার টার্গেট রয়েছে টিম QuackQuack.in এর।

কীভাবে উৎসাহিত হন রবি? QuackQuack.in এর থিংকট্যাঙ্কের উত্তর, ‘গ্রাহকদের ইন্টারনেটে জায়গা করে নিতে কিছু একটা তৈরির ব্যাপারে আমি সবসময় উৎসাহিত ছিলাম। ডেটিংয়ের আইডিয়াটা বেশ লাগে। বিশেষ করে যখন দেখলাম ইউজার আমাদের অ্যাপের মাধ্যমে সত্যি ডেট করছে। আরও ভালো লাগে যখন ইউসারদের কাছ থেকে ধন্যবাদ জানিয়ে এসএমএস আসে, সঙ্গী খুঁজে পাওয়ার কথা জানান। সেটাই আমাদের মুখে হাসি ফোটায়, এগিয়ে যাওয়ার সাহস যোগায়’।

QuackQuack.in এ যারা প্রিমিয়াম সদস্য তাঁরাই ভেঞ্চারের মূল আয়ের উৎস। নতুন ইউসার বিনামূল্যে সাইনআপ করতে পারেন এবং অন্য ইউসারের প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করতে পারেন। কিন্তু মেসেজ করতে পারবেন না। মেসেজ করতে হলে ইউসারকে কোনও একটা সাবসক্রিপশনে আসতে হবে যেখানে নানা অফার থাকে। নানা ধাপে নানান রকম চার্জ রয়েছে। একমাসের জন্য ১০০০ টাকা, তিন মাসের জন্য ২৫০০ টাকা, ৬ মাসের জন্য ৪৪০০ টাকা, এক বছরেরজন্য ৬,৪০০ টাকা-এমন অনেকগুলি ধাপ থাকে। ১৫ থেকে ২০ শতাংশ ইউসার সদস্যপদ নবীকরণ করেন। QuackQuack.in দাবি করে ২০১৩-১৪য় তাদের ৯১ লক্ষ টাকা আয় হয়েছে। ২০১৪-১৫য় সেটা দাঁড়িয়েছে ১.৮১ কোটিতে।

ওয়েবসাইটের কর্নধার জানান, সদস্যদের দেওয়া নিজের সম্পর্কে তথ্য এবং সেটাকে ক্রমশ আপডেট করা, এইসব বিষয়ে QuackQuack.in যথেষ্ট কড়া। ‘ইউসার যে তথ্য দিচ্ছেন দুই শিফটে ৪ সদস্যের একটা দল তার দিকে কড়া নজর রাখছে। বেশিরভাগ সময় দেখা যায়, ইউসার হয়ত দাবি করল তার বয়স ২৬ বছর। কিন্তু দেখতে আরও বয়স্ক। কেউ কেউ তো আবার এমন সব তথ্য দেন যেগুলির কোনও মানেই দাঁড়ায় না। সেক্ষেত্রে আমরা কনটেন্টগুলি বন্ধ করে দিই। লক্ষ্য হল, ইউসারের সময় নষ্ট না করে তাদের আরও ভালো পরিষেবা দেওয়া’, বলেন রবি। রেজিস্টারের সময় প্রত্যেক ইউসারের প্রোফাইল ভালোভাবে যাচাই করে নেওয়া হয়। খরাপ মানের ছবি এবং তথ্য বাতিল করে দেওয়া হয়। স্প্যাম বা আপত্তিজনক বিষয় এড়াতে এই সাইটে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা রয়েছে। শুধু তাই নয়, তেমন কিছু নজরে এলে সঙ্গে সঙ্গে ইউসারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। সাইটে ছেলে এবং মেয়ে ইউসারের অনুপাত ঠিক রাখতে QuackQuack.in মহিলা ইউসার টানার নানা চেষ্টা চরিত্র চালিয়ে যাচ্ছে। অনুপাতে এই মুহূর্তে ভারসাম্য নেই বললেই চলে। সাইটে ৩০ জন মহিলার অনুপাতে পুরুষের সংখ্যা ৭০।

প্রতি মাসে লক্ষ লক্ষ ইউসার QuackQuack.in এর ওয়েবসাইটে ঢোকে এবং কয়েক লক্ষ ইউসার অ্যাপে কথা বলে। ইউসারদের গড় বয়স ২৭। প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ মিনিট ওয়েবসাইটে কাটায় তারা। মূলত দিল্লি, বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদ, এবং মুম্বয়ের ইউসারই বেশি। দ্বিতীয় শ্রেণির বাজারে আহমেদাবাদ, চণ্ডীগড়, জয়পুর এবং লখনউ এর মত শহরগুলিতে QuackQuack.in এর মঞ্চ দারুণ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

আরও বড় লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে QuackQuack.in। প্রতিনিয়ত পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকেও বদলাতে থাকে QuackQuack.in। ইউসারের বদলে যাওয়া চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে তাদের আচার আচরণের দিকে কড়া নজর রাখা হয়। এর ফলে ইউসারের ব্যাক্তিত্বের ওপর নির্ভর করে ঠিক ম্যাচ খুঁজে দেওয়া বা প্রোফাইল সাজেস্ট করে দেয় এই সাইট। পরিষেবা এবং ইউসার আরও বাড়াতে QuackQuack.in উন্নত iOS ভার্সানের অ্যাপ লঞ্চ করছে। যারা ইতিমধ্য ম্যাচ বা সঙ্গী খুঁজে পেয়েছেন তাদের জন্য in-app calling ফিচার লঞ্চ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

রবি বলেন, ‘এখনও পর্যন্ত এই ক্ষেত্রে তাঁর অভিজ্ঞতা ভারি মজাদার। তিনি আমাদের জানান, সবচেয়ে কঠিন হল বড়দের বোঝানো যে তিনি কী কাজ করেন’। রবি শেষ করলেন হেঁয়ালি রেখেই। বলেন, ‘সাধারণত, বড়দের কাছে আমার জবাব হয়, আমাদের পোর্টাল বিয়ে সংক্রান্ত আবার ঠিক বিয়ে নয়’।