ঐতিহ্যের চাম্বালামায় শাশুড়ি বৌমার যুগলবন্দি

0

কলকাতায় যারা গয়না পরতে ভালোবাসেন তারা দুতিন মাসে একবার হলেও চাম্বা লামায় পা রাখেন। চাম্বা লামা। নামটা বাংলা নয়। কিন্তু এতদিনে বাংলার ঐতিহ্যের একটা অংশ হয়ে গিয়েছে। কলকাতার পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস লেখা হলে যদি শুধু রাজনীতি, নেতা মন্ত্রীর সালতামামি না লেখা হয় তাহলে অবশ্যই চাম্বালামার কথা থাকবে সেখানে। সাহেবিয়ানার নিউমার্কেটে পুরনো দোকান। মেটাল আর রূপোর সারি সারি গয়না। ঘর সাজানোর সরঞ্জামে ঠাসা আশি বছর ধরে কলকাতার সংস্কৃতির একটা নির্দিষ্ট ডাইমেনশন এই চাম্বালামা। এই গল্পে অন্য একটা জেন্ডার ডাইমেনশনও আছে। কীরকম?

৪০ এর দশকের কোনও এক শীতে বাবার হাত ধরে দার্জিলিং থেকে কলকাতায় রুজিরুটির সন্ধানেই এসেছিলেন চেন্তাংগ্যম শেরপা। তের বছরের একটি ছোট্ট মেয়ে। কলকাতায় প্রথমবার এসে চেন্তাংগ্যম এবং ওঁর বাবার মনে হয়েছিল এখানে ব্যবসা হবে। ব্রিটিশ কলকাতা। আদব কায়দা শিল্প সংস্কৃতি সবই তখন তুঙ্গে। কলকাতায় তখন সবই আছে কিন্তু তিব্বতি এই পরিবারের কাছে যা আছে তার কোনও নির্দিষ্ট ঠিকানা নেই। সেভাবে জুয়েলারি শপের ব্যবসা নেই। হোয়াইট মেটালেরও তেমন চল নেই। সেকালে কলকাতার মানুষ গয়না বলতে বুঝতেন ভারী ভারী সোনার গয়না, চাঁদি রুপো আর জড়োয়ার সেট, ম্যাক্সিমাম মিনের কাজ। ১৯৪৯ যখন চাম্বালামা তৈরি হল ততদিনে ওই একরত্তি মেয়ে বুঝে গিয়েছিলেন তাদের বাজার আছে। হোয়াইট মেটালের তিব্বতি গয়না আর পুরনো মূর্তি শুরু হল চেন্তাংগ্যমের যাত্রা। শীতের সময় বাবা মা থাকতেন কলকাতায়। তাঁকে সাহায্য করতেন। কিন্তু বাকি সময়টা এই বিশাল শহরে একাই চালিয়ে গেছেন ব্যবসা। বিয়ের পর স্বামীর সহযোগিতা পেয়েছেন ঠিকই তবু তিনিই ছিলেন চাম্বালামার প্রাইমাডোনা।

পাহাড়ের সংস্কৃতি নিজস্ব নিয়মেই বাংলার জলবায়ুতে খাপ খেয়ে গেল। কলকাতার হগ মার্কেট চত্বরে রমরমিয়ে চলল ব্যবসা চেন্তাংগ্যামের পরেই ব্যবসার হাল ধরলেন তাঁর মেয়ে জেরিং শেরপা। দার্জিলিং থেকে এসে প্রথমে ব্যবসা সামলাতে বেশ কিছুটা সময় লেগেছিল জেরিং-এর। নিজেই হাসিমুখে জানালেন, ‘ধর্মতলার মানুষ সবসময়ই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। কখনওই মনে হয়নি বাইরে থেকে এখানে এসে ব্যবসা করছি।'

জেরাং এর বয়স এখন ৬০ এর কোটায়। তাই এখন দোকানের দায়িত্ব নিতে তৈরি হচ্ছেন পুত্রবধূ নরকিলা শেরপা। নরকিলা বলছিলেন, ‘পরিবারের মহিলারা সাফল্যের সঙ্গে ব্যবসা সামলেছেন এবার আমার সেই সাফল্য বজায় রাখার পালা।' জেরাং আর নরকিলাই এখন দোকান চালান। ভিড় সামলান। সেলিব্রিটি ক্রেতার তো অভাব নেই। সুচিত্রা সেন থেকে শুরু করে অপর্ণা সেন কে আসেননি এদের দোকানে! এখনও আসেন রিয়া, রাইমা, টলিউড-বলিউডের নক্ষত্ররা। পাশাপাশি সাধারণ ক্রেতারাও ভিড় জমান রোজ। অনেকেই শুধু দেখতে আসেন। সকলের কাছেই হাসি মুখে হাজির শাশুড়ি বৌমা।

সোনা চুরি হওয়ার ভয়ে এখন অনেকেই সোনা কেনা ছেড়ে দিয়েছে । তাই সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় রূপোর গয়না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের রূপোর গয়নার ডিজাইনেও অনেক পরিবর্তন এনেছে চাম্বালামা। কানের দুল থেকে ভারি রূপোর গলার হার সবেতেই অনবদ্য ডিজাইন। আর আছে হোয়াইট মেটালের নানা সম্ভার । ২০০ টাকা থেকে শুরু করে ১০ কিংবা ১৫ হাজারের গহনা রয়েছে এই দোকানে। শুধু গয়না নয় আছে পেতল কিংবা হোয়াইট মেটালের নানা দেবদেবীর মূর্তিও। বিশাল সম্ভারের এই খোঁজ পেতেই বিদেশী কিংবা প্রবাসী বাঙ্গালীরাও ভিড় জমান। যেমনটা এসেছিলেন অস্ট্রেলিয়ার প্রবাসী বাঙ্গালী অনুসূয়া গুহ। বলছিলেন , ‘এখানে আসি রূপোর দুল কিনতে। পাশাপাশি গলার হার কিংবা হাতের নানা অলংকারে এই দোকানের জুড়ি মেলা ভার’। বিদেশী ক্রেতাদের কথা চিন্তা করেই চাম্বালামার রয়েছে একটি ফেসবুক পেজ। দেখভাল করেন নরকিলাই। কলকাতার এই মহিলাতান্ত্রিক ব্যবসা নিউমার্কেটের ছোট্ট পরিসরে টেনে আনছে গোটা দুনিয়াকে।

Related Stories