গ্রামীন পড়ুয়াদের ক্যারিয়ার কল্পতরু অশ্বিথা

0

তামিলনাড়ুর তিরুনেলভেলি জেলার একটা ছোট গ্রামে আমি বড় হয়েছি। কাদায় মেখে খেলা করেছি, পেয়ারা পাড়তে গাছে পাথর ছুঁড়েছি, মাছ ধরেছি। তবু পুরুষশাসিত সমাজের প্রভাব আমাদের ওপরও পড়েছে। আমি খুব কম কথা বলতাম পুরুষদের সঙ্গে। বিশেষ করে বড়দের সামনে আমার গলা দিয়ে আওয়াজ বেড়তো না। যার কথা এগুলি, তিনি অশ্বিথা শেঠি ।আজ শহুরে হলেও গ্রামের মানুষদের শিক্ষা ও ক্যারিয়ারে উন্নতির জন্য তৈরি করেছেন বোধি ট্রি ফাউন্ডেশন।ঠিক যেন গ্রামীন পড়ুয়াদের শিক্ষার অশত্থ ছায়া অশ্বিথার বোধি ট্রি ফাউন্ডেশন।


মাত্র ১৩ বছর বয়স থেকে নিজের জীবনকে অন্য ভাবে নিয়ে গেছেন খাতে অশ্বিথা। তার ওপর প্রভাব ফেলেছিল হেলেন কেলারের আত্মজীবনী। বুঝেছিলেন, নিজের জীবনকে চালিত করার শক্তি আমাদের নিজেদের মধ্যেই রয়েছে, আর কারও মধ্যে নয়। পড়াশুনার প্রতি একটা আশ্চর্য রকমের ঝোঁক ছিল অশ্বিথার। কখনও বন্ধুদের পড়াতেন, আবার কখনও বাচ্চাদের টিউশন সেন্টার চালাতেন। সামান্য বিড়ি বাঁধার কাজ করতেন অশ্বিথার বাবা। বাবা-মা দুজনেই হবতো শিক্ষার আলো পাননি। কিন্তু বুঝেছিলেন মেয়ের মনের ইচ্ছে।


ইংরাজি ভাষাটাতে কিছুতেই স্বচ্ছন্দ হতে পারতেন না অশ্বিথা। কিন্তু তিনি তিরুনেলভেলির বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে গোল্ড মেডেলিস্ট ছিলেন। স্নাতকের অন্তিম বর্ষে একটি তামিল ম্যাগাজিনে ইয়ং ইন্ডিয়া ফেলোশিপ নিয়ে পড়েন। তবু দিল্লি যাওয়ার মত ক্ষমতা তাঁর ছিল না। কলেজের লাইব্রেরিয়ান তাঁর একটি ই-মেল আইডি খুলে দেন। বন্ধুর মোবাইলে প্রয়োজনীয় কথা সেড়ে ফেলতেন অশ্বিথা। ফাইনাল রাউন্ড ইন্টারভিউ স্কাইপে দেয় সে। সেই প্রথম ইংরাজিতে কথা বলা শুরু। এরপরেই ফেলোশিপের জন্য নির্বাচিত হয়ে দিল্লি চলে যান অশ্বিথা। কিন্তু প্রথম প্রথম বেশ অসুবিধাই হত। ইংরাজিতেই ক্লাসে সমস্ত বিষয় পড়ানো হত। দমে যায়নি সে।অধ্যাপকদের সঙ্গে বেশি করে পড়াশুনা নিয়ে আলোচনা করে সমস্যা মেটাতো সে।


ফেলোশিপের পর অশ্বিথা সুঘাভাঝভু হেলথকেয়ারে 'কমিউনিটি এনগেজমেন্ট ম্যানেজার' হিসেবে কাজ করতে শুরু করেন। যাঁরা গ্রামের মানুষদের স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করতেন। অশ্বিথা সেখানকার স্কুল এবং কলেজে অ্যানিমিয়া এবং কার্ডিও-ভাস্কুলার ডিসিজ নিয়ে বিভিন্ন প্রোগ্রাম পরিচালনা করতেন। কিন্তু পড়াশুনায় ভালো ফল বা একটা ভালো চাকরি, এটাই কি অশ্বিথার জীবনের লক্ষ্য ছিল? তাহলে সমাজে পরিবর্তনের জোয়ার আনবে কে? কেই বা গ্রামের ছেলেমেয়েদের ক্যারিয়ার গড়ার রাস্তা দেখাবে? এই চিন্তাভাবনা থেকেই জন্ম হয় বোধি ট্রি ফাউন্ডেশনের। তিরুনেলভেলির এই সংস্থা গ্রামের ছেলেমেয়েদের সরকারি বা বেসরকারি চাকরি, ফেলোশিপ, স্কলারশিপ ইত্যাদি নানা বিষয় নিয়ে প্রোগ্রাম পরিচালনা করে। আর্টস এবং সায়েন্সের ছাত্রছাত্রী কিংবা পলিটেকনিক বা ইঞ্জিনিয়ারিং-এর ছাত্রছাত্রীদের জন্যও আলাদা কোর্স পরিচালনা করা হয়। সেই সঙ্গে ইংরাজি ভাষাকে আলাদা মর্যাদা দেওয়া হয় এখানে। অশ্বিথা মনে করেন, গ্রামের ছেলেমেয়েদের যদি সঠিক পথ দেখানো যায়, তাহলে তাঁরাও সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে।


বোধি ট্রি ফাউন্ডেশনের সাফল্য আজ আকাশ ছোঁওয়া। ২৫০০ বেশি অ্যাওয়ারনেস প্রোগ্রাম, ৬০০ বেশি ছাত্রছাত্রী প্রফেশনাল ডেভেলপমেন্ট এবং পজিটিভ অ্যাটিটিউড, ২০-টির বেশি কলেজ বোধি ট্রি ফাউন্ডেশনের সঙ্গে যুক্ত। একটি লাইব্রেরিও রয়েছে তাদের। আপাতত অশ্বিথার লক্ষ্য বোধি ট্রি ফাউন্ডেশনের অর্থভাণ্ডার বাড়ানো। অশ্বিথা শেঠির মত মেয়ে, যিনি মাদার টেরেসা সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজ স্কলারশিপে ভূষিত হয়েছেন, তার কাছে এটা কি খুব কঠিন হবে?


লেখক-স্নিগ্ধা সিনহা

অনুলেখক-চন্দ্রশেখর চ্যাটার্জী