‘মাইক্রো আর্টিস্ট’ অমিতের লক্ষ্য বিশ্বরেকর্ডে

0

ছেলেবেলায় ক্যানভাসই ছিল তাঁর জীবনের সব। একবার নিজের আঁকা ছবি নিয়ে প্রদর্শনী করে তেমন কল্কে পাননি। স্বপ্ন যেন কোথায় ঠোক্কর খেয়েছিল। ঠিক করেন ঝাঁকের কই হওয়া নয়, গতে বাঁধা পথ ছাড়তে হবে। নতুন সরণির খোঁজে এরপর সৃজনশীল মন তখন হন্যে হয়ে পড়েছে। এরই মধ্যে রাজ্যের এক হস্তশিল্প প্রদর্শনীতে দেখা হয়ে যায় এক শিল্পীর সঙ্গে। যিনিছ চোখে লেন্স ব্যবহার করে চালের মধ্যে বেশ কিছু নাম লিখেছিলেন। এতেই মনের খোরাক পেয়ে যাওয়া। তারপর শুরু চালের ওপর নিপুণভাবে নাম লেখা। এখন একটি দেরাদুন চালের দানায় ৪৩টি নাম লিখতে পারেন অমিত মজুমদার। চালেই আঁকেন নানারকম ছবি। তাঁর পরিচয় মাইক্রো আর্টিস্ট। কল্যাণীর সগুনার বাসিন্দার চোখ এই মুহূর্তে বিশ্বরেকর্ডের দিকে। একটি চালের ওপর ৫০টি নাম লিখে ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাতে চান বিশ্বভারতীর প্রাক্তনী।

মনে যার রঙ ভর্তি তাঁকে কি আর পেন্সিল, রং, তুলিতে আটকে রাখা যায়। তাই ক্যানভাসে ফুল ফোটানো শুরু হলেও, জীবনের পথ সেখানেই থেমে থাকেনি। ছোট্ট ছেলেটার এই খিদে দেখতে পেয়েছিলেন অধীর বিশ্বাস। নিজে হাতে করে আঁকা শেখান। তাঁরই প্রেরণায় আঁকার প্রতিযোগিতায় নাম লেখানো শুরু হয় অমিত মজুমদারের। প্রতিযোগিতার একটাই ফল। সবার আগে। ছোটখাটো কাজ করে কোনওরকমে সংসার চললেও অমিতের স্বপ্নে বাধা হয়ে দাঁড়াননি তাঁর বাবা। পরিবারের উত্সাহে বিশ্বভারতীতে ফাইন আর্টস নিয়ে মার্স্টার্স ডিগ্রির পর পুরোপুরি পোট্রেট শিল্পে মন দেন শিল্পী। রং, তুলির আঁচড়ে এগোলেও কোথাও যেন শিল্পভাবনা ঠিক প্রকাশ পাচ্ছিল না। অমিতের কথায়, ‘‘তখন মার্কেটিং-এর একটা লাইনের কথা মনে হয়েছিল। বিজয়ীরা একই কাজ ভিন্নভাবে করে।’’ সেই আলাদা কিছুর খোঁজ করতে করতে এক প্রদর্শনী একজন শিল্পীর সঙ্গে পরিচয় হয় অমিতের। চালের ওপর নিখুঁতভাবে নাম লিখে চলেছিলেন ওই শিল্পী। যা দেখে অমিতের কোথাও যেন মনে হয়েছিল এমন সৃষ্টি তাঁর ইচ্ছেপূরণের পথ খুঁজে দেবে।

এই নিটোল আত্মবিশ্বাস থেকেই শুরু স্বপ্নকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পালা। একবার দেখেই চালের ওপর কারুকার্য দেখানোর পালা। প্রদর্শনীর শিল্পী চোখে লেন্স বসিয়ে একটি চালের দানার ওপর দশটি শব্দ লিখেছিলেন। অমিত বলছেন, ‘‘ঠিক করি লেন্স নয় খালি চোখেই আঁকব। এভাবে আমি নিজেই নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠি। প্রথম দশটা লিখতে পারি, তারপর পনেরো, কুড়ি। তেতাল্লিশে গিয়ে মনে হল বিশ্বরেকর্ড আর দূরে নেই।’’ বছর আঠাশের এই শিল্পী জানতে পেরেছেন চালের ওপর পঞ্চাশটি শব্দ লিখতে পারলে মাইক্রো আর্টিস্ট হিসাবে ছাপিয়ে যাবেন তিনি। তাই এখন এটাই অমিতের ধ্যান-জ্ঞান। তাঁর নজির ছোঁয়ার এমন বাসনার নেপথ্যে রয়েছেন একজন স্বর্ণব্যবসায়ী।

চালের দানার মধ্যে প্রিয়জন কিংবা নিজের নাম, দেবদেবীর নাম অর্ডার দিলে কয়েক মিনিটের মধ্যে লিখে দেন অমিত। কিছু দিন আগে এক শুভানুধ্যায়ীর পরামর্শে চালের ওপর আঁকা শুরু করেন অমিত। রং, তুলির মতো পুরনো সঙ্গীরা আবার তাঁর হাতে ফিরে এসেছে। একটি চালের দানার ওপর কালী, গণেশ, দুর্গা বা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এমনকী রাজ্যের মানচিত্র এঁকে দেন কয়েক মুহূর্তের মধ্যে। যার জন্য সময় লাগে মাত্র ১০ মিনিট। দেরাদুন রাইসের ওপর অমিতের যত শাসন।

অমিতের এই শিল্পকর্ম মাইক্রো আর্ট নামে পরিচিত। কার্যত স্বশিক্ষিত এই শিল্পী নিজস্ব ভাবনার এই শিল্পকর্ম তুলে ধরার জন্য বেছে নিয়েছেন রাজ্যের বিভিন্ন মেলা, প্রদর্শনীকে। কোচবিহারের রাসমেলা কিংবা মিলনমেলা প্রাঙ্গনের রাজ্য হস্তশিল্প। সর্বত্রই তাঁর হাঁতযশের টের পেয়েছেন গুণমুগ্ধরা। এরই সুবাদে রোজগারটাও মন্দ হয় না অমিতের। অর্থযোগ যেমন আছে, তেমন তৃপ্তির ঝুলিটাও বেশ কিছুটা ভরেছে শিল্পীর। অমিত বলেন, ‘‘উত্তরবঙ্গের একটি মেলায় এক ভদ্রলোক আমার সঙ্গে ছবি তোলেন। কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেছিলেন ওই ছবি গিয়ে ছেলেকে দেখাবেন। এই স্মৃতি ভুলব না।’’ যাঁরা অমিতের কাজ দেখেন তারাও যে বিস্মৃত হতে পারেন না। কৌতুহলী চোখ বারবারই জানতে চায় খালি চোখে একটা চালে কীভাবে এত কিছু আঁকা, লেখা সম্ভব। এই রহস্য নিয়েই আরও অনেক দূর যেতে চান কল্যাণীর উদ্যমী।