এখনও ভোটের প্রচারে জমজমাটি পট-গান

0

এক একটা পটে এক এক রকম গল্প। কখনও পুরানের অংশ, কখনও লোকগাঁথা। পট এঁকে সঙ্গে গান বাঁধা। সারা বছর গ্রামে গ্রামে ঘুরে এভাবেই উপার্জন পটশিল্পী, লোকশিল্পীদের। ভোট আসতেই তা কয়েকগুন বেড়ে যায়। নাওয়া খাওয়ার সময় নেই। এক এক দল আগে থেকেই বায়না করে রাখে। অর্ডার মতো পট এঁকে, গান বেঁধে পাড়া থেকে পাড়ায়, মহল্লা থেকে মহল্লায় ঘুরে বেড়ান। আধুনিক যুগের হাইটেক প্রচারে খানিকটা চাপা পড়লেও এখনও সমান জনপ্রিয় পট-ছবিতে ভোট-কথা প্রচারের সেই চিরাচরিত রেওয়াজ।

লোকসভা, বিধানসভা, পঞ্চায়েত,পুরসভা রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক পরিকাঠামোকে সুসংহত রাখতে কোনও না কোনও ভোট লেগেই আছে। ভোট এলে শুধু রাজনৈতিক দলগুলির ব্যস্ততাই বাড়ে না। তার বাইরে নানা পেশার মানুষ রয়েছেন যারা পরোক্ষভাবে এই পেশার মাধ্যমে রোজগারের পথ বেছে নেন। পট এবং লোকশিল্পী তাদের মধ্যে অন্যতম। অলি-গলি, বড় রাস্তার ধার- যেখানে দেওয়াল সেখানেই প্রচার। বাউন্ডারি ওয়াল থেকে সাইবার ওয়াল, প্রচারের দাপটে সব ওয়াল রাজনৈতিক দলগুলির দখলে চলে যায়। গ্রামগুলিতে এখনও অবশ্য হাইটেক প্রচার সেভাবে সুবিধে করে উঠতে পারেনি। আর সেই ফাঁকে বাজার মাত করে রেখেছে লোকশিল্পীদের গান, পটে পটে গল্প এঁকে প্রচার। বীরভূমের নানুরের পাঁকুড়হাঁস গ্রামে পটশিল্পীদের বাস। গ্রামের প্রায় সত্তর শতাংশ মানুষ একসময় পটশিল্পের ওপর নির্ভর করে জীবীকা উপার্জন করতেন। আর তাকিয়ে থাকতেন কখন ভোট আসবে। শতাংশের হিসেবটা একটু কমলেও রোজগারে ভাটা পড়েনি। পশ্চিম মেদিনীপুরে যেমন ঝুমুর-বাউল গানের শিল্পীদেরও ভোটের সময় বাড়তি রোজগার। গানের সুরে বার্তা, ‘সকলে ভোট দিলে পরে, দেশের ভবিষ্যৎ বাড়বে ওরে, সবাই মিলে হও গো সচেতন।’

বীরভূমের পটশিল্পী তরুণ দাস বলেন, ‘ভোটের তিন মাস আগে থেকে নানা রাজনৈতিক দল আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। অগ্রিম দিয়ে বায়না করে যায়। প্রচার শুরু হতেই সকাল থেকে বেরিয়ে পড়ি। গ্রামে গ্রামে ঘুরে পট এঁকে গানের তালে প্রচার করি’। বিগত সরকারের ভালো কাজ, ক্ষমতায় এলে কী কী সুবিধা দেবে, বিরোধী প্রচার হলে বিগত সরকারের সমালোচনা এবং তারা ক্ষমতায় এলে কী কী সুবিধা পাবে জনগন- সবটাই থাকে পটে এবং গানে। কখনও সুরে বাঁধা পড়ে ‘নিজেদের মতো সরকার গড়তে হলে, সবাইকে সচেতন হতে হবে’, কখনও সুরে সুরে , ‘পড়স পড়সকে বলতে হবে, সময় মতো ভোট দিতে হবে’। পটশিল্পীদের সঙ্গে কখনও থাকে ঢোল বাজনার দল। গ্রামের মানুষের কাছে এই পট গান ভোটের উপরি পাওনা।

‘আধুনিকতার ছোঁযায় পট-গানে ভোটের প্রচারে ভাটা একটু এসেছে বটে। তবে সারা বছর গ্রামে গ্রামে ঘুরে যা রোজগার তার প্রায় কয়েকগুন রোজগার এই ভোটের সময়টাতে’, বলছিলেন পটশিল্পী সুধীর চিত্রকর।

বিগত নির্বাচনগুলোয় জেলায় কখনও ৬৫- ৭০ শতাংশ ভোট পড়েছে। কখনও ৭০- ৭৫ শতাংশ ভোট পড়েছে। এ বার জেলায় ১৮ থেকে ৩৯ বছর বয়সী ভোটারের সংখ্যাই প্রায় ২১ লক্ষ। তরুণ ভোটারদের সকলে বুথমুখী হলেও ভোটদানের হার কিছুটা বাড়ে। নির্বাচন কমিশনই চাইছে, তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ভোটদানে উৎসাহ বাড়ুক। এ জন্য জেলায় নানা ধরণের সচেতনতামূলক কর্মসূচিও হয়। লোকশিল্পের মাধ্যমে ভোট- সচেতনতা প্রচারের কাজ হলে তা সাধারণ মানুষের মধ্যে সাড়া ফেলবে বলেই মনে করেন জেলা প্রশাসনের কর্তারা। ফলও মিলেছে হাতেনাতে। রাজ্যে প্রথমদফার প্রথম পর্বে আশি শতাংশের ওপর ভোট পড়েছে।

গ্রাম কেন, শহরেও পটচিত্র আর গানে গানে ভোটপ্রচার বেশ জনপ্রিয়। লোকশিল্পী সাধন, সুমিতরা বলেন, এ ভাবে প্রচারের ফলে প্রার্থীদের আবেদন সহজে মানুষের কাছে যেমন পৌঁছানো যায়, তেমনি হারিয়ে যাওয়া লোকশিল্প নতুন একটা দিকও খুঁজে পেয়ে যাবে! অর্থাৎ, রথ দেখা আর কলা বেচা দুইই হবে।