শিশুশ্রম হটাতে দোরে দোরে দুচাকায় আইআইটি‍ খড়গপুরের উজ্জ্বল

0

আইআইটি খড়গপুরের কৃতী ছাত্র উজ্জ্বল চৌহান। প্রাণশক্তিতে ভরপুর, উচ্ছ্বল ২২ বছরের এক যুবক। লেখাপড়ায় যে দুর্দান্ত তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। ওশন টেকনোলজি এবং নাভাল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়তে যান খড়গপুরে। কিন্তু খেলাধুলোয় সামনের সারিতে উঠে আসার সুযোগ পায়নি সে। তাই মনের মধ্যে একটা জেদ ছিল। আর সেই জেদের বশেই কলেজের দৌড় প্রতিযোগীদের দলে নাম লেখালেন। মাত্র এক মাসের প্রশিক্ষণে ৪২ কিমি ম্যারাথন দৌড় শেষ করেছিলেন। তখনই উজ্জ্বল উপলব্ধি করলেন সাইক্লিং করা আর ফোটোগ্রাফি তাঁর নেশা। দু‍চাকায় ভর করে কিমি এর পর কিমি সাইকেল নিয়ে ছুটে বেড়ানো। আর তার ফাঁকে জীবনকে ফ্রেমবন্দি করে রাখার মধ্যে রোমাঞ্চ খুঁজে পেলেন উজ্জ্বল। পেয়ে গেলেন এক সঙ্গীকেও।

একদিন তিনি ও তাঁর বন্ধু ঠিক করলেন আরও বড় লক্ষ্য নিতে হবে। অনেক তর্কাতর্কির পর সিদ্ধান্ত হল, ২৫০০ কিমি সাইক্লিং করবেন তাঁরা। কিন্তু শুধু রোমাঞ্চের খাতিরেই এই দীর্ঘ পথ অতিক্রম না করে সমাজসেবামূলক কাজে লাগতে চেয়েছিলেন উজ্জ্বল। ‌যোগাযোগ করলেন ক্রাই বা চাইল্ড রাইটস অ্যান্ড ইউ-এর সঙ্গে। ঠিক হল দেশের পূর্ব থেকে পশ্চিমে সাইক্লিং করে যাবেন।কলকাতা থেকে মুম্বই যাওয়ার এই দীর্ঘ পথে ছবি তুলবেন শিশুদের। তাদের অবস্থার, পরিস্থিতির। একইসঙ্গে শিশুশ্রম রুখতে অর্থ সংগ্রহ করবেন।

যেমন ভাবা তেমনই কাজ। মে মাসের শেষে এক কাঠ ফাটা দুপুরে কলকাতা থেকে যাত্রা শুরু করলেন উজ্জ্বল ও তাঁর বন্ধু সিদ্ধার্থ। কোনও অত্যাধুনিক বাইকে চেপে নয়। সাধারণ সাইকেলে ভর করেই সূচনা হল তাঁদের অ্যাডভেঞ্চারের। সঙ্গে নিলেন যৎসামান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী।

এভাবে শুধুমাত্র একটা সাইকেলের ভরসায় সম্পূর্ণ অজানা এলাকা দিয়ে ২৫০০ কিমি -এর সফর! ভয় করেনি?

উত্তরে স্মিত হেসে উজ্জ্বল বললেন, “মহারাষ্ট্রের রেড বাসকে খুব ভয় পেয়েছিলাম। একবার হাইওয়ের ধারের এক ধাবায় সাইকেল চুরি যাওয়ার ভয়ে সারারাত জেগে কাটিয়েছিলাম। আবার অমরাবতীর নির্জন অন্ধকার দীর্ঘ রাস্তা দিয়ে ‌যাওয়ার সময়ে ভূতের ভয়ও পেয়েছিলাম। কিন্তু যখন দেখলাম ৪৫ ডিগ্রি তাপমাত্রাতেও বেঁচে আছি, তখন উপলব্ধি করলাম যে কোনওকিছুই আমাকে আটকাতে পারবে না।”

যাত্রাপথের পুরো অভিজ্ঞতাই ব্লগে লিখে রেখেছিলেন উজ্জ্বল। জানালেন, আধ পেটা খেয়ে, খোলা আকাশের নিচে দিনের পর দিন লডা়ই করতে থাকা সেই শিশুদের সঙ্গে নিজের ছোটবেলাকে কিছুতেই মেলাতে পারছিলেন না তিনি। মানুষের দারিদ্র, শিশুদের অসহায়তা তাঁর চোখে যেমন জল এনেছিল, তেমনই গুড স্যামারিটান‍-দের বদান্যতা তাঁকে মুগ্ধ করেছিল। অনেকেই শিশুদের জন্য সাধ্যমতো অর্থসাহায্য করেছিলেন।

৩০ দিনে চার রাজ্য অতিক্রম করে জুনে মুম্বই পৌঁছন উজ্জ্বল। যাত্রাপথেই নিজের অভিজ্ঞতা, ফ্রেমবন্দি মুহূর্তগুলো ব্লগে, সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করেন।

এই দীর্ঘ যাত্রাপথ কি খুব কঠিন ছিল? উজ্জ্বল বললেন, “হ্যাঁ, তবে একইসঙ্গে রোমাঞ্চকরও ছিল। এর থেকে ভাল ছুটি কাটানোর উপায় আমার জানা নেই।”

বর্তমানে সিঙ্গাপুরের একটি জাহাজ সংস্থায় কাজ করছেন উজ্জ্বল। কিন্তু পড়াশোনার ফাঁকে ‌যখনই সময় পেয়েছেন শিশুদের জন্য ভলান্টিয়ারিং করেছেন এই মেধাবী যুবক। স্বপ্ন দেখেন, দেশে ফিরে দুস্থ শিশুদের পাশে দাঁড়িয়ে আরও বড় কিছু করার। গুডলাক উজ্জ্বল।