রায়গঞ্জের তুলাইপাঞ্জি বিশ্বে বাংলার ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর

0

চটপট রান্না। ধবধবে সাদা। অসম্ভব সুন্দর গন্ধ। সহজপাচ্য। যে পদ ঘিরে আহারের বাকি পদগুলি আবর্তিত হয়, তা যদি গুণের শিরোমণি হয় তাহলে আর কী চাওয়ার থাকতে পারে। এত কথা প্রযোজ্য তুলাইপাঞ্জি চালের জন্য। উৎকৃষ্ট এই সুগন্ধী চাল দেশের মধ্যে একমাত্র পাওয়া যায় এরাজ্যের রায়গঞ্জে। কিছুটা হেমতাবাদে। অন্যান্য ধানের থেকে তুলাইপাঞ্জির ফলন কিছুটা কম হলেও বাজারে কিন্তু দাম মিলছে প্রায় দ্বিগুণ। সেই সঙ্গে চাহিদাও দ্রুত বাড়ছে। তুলাইপাঞ্জির ভরসায় চাঙ্গা অর্থনীতির স্বপ্ন দেখছে রায়গঞ্জ।

অগ্রহায়ণে তার যত তেজ। চেনা ক্ষেতে তখন কত ব্যস্ততা। ফসল ঘরে তুলতে হবে যে। জমিতে জমিতে ধান কাটার তত্পরতা। আর কিছু দিনের মধ্যেই বাজারে এসে যাবে উত্তর দিনাজপুরের অহংকার তুলাইপাঞ্জি চাল। আর এই ধানের জন্য আদর্শ রায়গঞ্জের বিন্দোল এলাকা। অনেক জায়গাতে অনেকে চেষ্টা করেছেন কিন্তু বেলে-দোঁয়াশ মাটির বিন্দোলের তুলাইপাঞ্জির স্বাদ আর কোথ্থাও মেলে না। হেমতাবাদেও বিক্ষিপ্তভাবে চাষ হয়। বাজারে অজস্র সুগন্ধী চাল থাকলেও তুলাইপাঞ্জির যারা একবার পরখ করেছেন তারা জানেন ‌এর কী জাদু। এর ইউএসপি হল, প্রথমত তুলোর মতো নরম। যার জন্য নাম তুলাইপাঞ্জি। চাল ফোটালে মাত্র পাঁচ মিনিটেই ভাত তৈরি হয়ে যায়। আর ভাত চাপালে এমনই সুঘ্রাণ যে বিষয়টা আপনার গর্ব, পড়শির ঈর্ষার গোছের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। এতো গেল ক্রেতার স্বাদসুখের গপ্পো।

যারা ঘাম ঝরিয়ে এই ধান ফলান তারা বুঝে গিয়েছেন তুলাইপাঞ্জি অনেক কিছুই দেবে। অন্য ধানের থেকে ফলন অপেক্ষাকৃত কম। কিন্তু তুলাইপাঞ্জি বিক্রি করলে অন্য চালের থেকে অন্তত দ্বিগুণ দাম মেলে। শুধু আর্থিকভাবে লাভবান হওয়া নয়, এই চাষে আমন ধানের মতো অত জলও লাগে না। তবে একটু যত্ন করতে হয়। সুন্দর স্বাদ ও গন্ধের জন্য রাসয়নিক নয়, জৈবসার ব্যবহার করেন চাষিরা। ফলে অন্য চালের থেকে তুলাইপাঞ্জি অনেক বেশি স্বাস্থ্যকর। এই ধানের ফলন বাড়ানোর জন্য জমিতে আগে পাট চাষ করে নিতে হয়। আর চাল তৈরি হয়ে যাওয়ার কয়েক মাস পর্যন্ত চাল সংরক্ষণ করতে পারলে ভাতের গুণমান বাড়ে। সরকারি স্তরে কিছু উদ্যোগ নেওয়ার চাষিদের মধ্যে এই চাষ নিয়ে ভাল প্রভাব পড়েছে। কারণ এই তুলাইপাঞ্জি চাল বিক্রি করে কেজিতে ৭০ থেকে ৯০ টাকা মেলে। অন্য চালের ক্ষেত্রে সেটা মেরেকেটে হয় ৩০ থেকে ৪৫ টাকা। অর্থনীতির নিয়মে তাই রায়গঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় রীতিমতো জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে তুলাইপাঞ্জি চাষ। এই যেমন প্রদীপ দে। রায়গঞ্জে প্রদীপবাবুর কাঠের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসা। তিনি কয়েকজনকে নিয়ে তুলাইপাঞ্জি চাষ মন দিয়ে করছেন। প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ বিঘে জমিতে এবার তাদের চাষ হয়েছে। ফলনও মন্দ হয়নি। সব কিছু ঠিকঠাক থাকলে প্রতি মাসে তাদের ১০০০ কুইন্টল চাল কলকাতায় যাবে বলে জানিয়েছেন প্রদীপবাবু।

সমর সরকার নামে বিন্দোলের এক চাষির কথায়, কয়েক বছর আগে তুলাইপাঞ্জি চাষ নিয়ে এতটা হইচই ছিল না। কিছুটা প্রচার এবং ধানের ভাল দাম পাওয়ায় অনেকেই এই চাষে ঝুঁকছেন। তাছাড়া তুলাইপাঞ্জি ধানের চাষে সার, বীজ বা জলের খরচ অন্যান্য ধানের তুলনায় অনেকটা কম। পোকার সমস্যাও তেমন দেখা যায় না।

দীর্ঘ দিন ধরে ভারত থেকে শুধু বাসমতী চালই বিদেশে রফতানি হত। সম্প্রতি কেন্দ্র সরকার বাসমতীর মতো আরও পাঁচটি প্রজাতির চালকে বিদেশে পাঠানোর পরিকল্পনা নিয়েছে। যার মধ্যে অন্যতম তুলাইপাঞ্জি। পাশাপাশি রাজ্য সরকারের তরফে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়ায় তুলাইপাঞ্জি চাষ করে বাংলার একান্ত স্বাদ বিদেশের বাজারে পৌঁছে দেওয়া যাবে বলে মনে করে এই চাষের সঙ্গে যুক্ত কয়েক হাজার মানুষ।