আলোর খোঁজে কবাডি হাতিয়ার বন্দি ইলিয়াসের

0

যাবজ্জীবনের সাজার সিদ্ধান্তে আচমকাই জীবনে নেমে ‌আসে অন্ধকার। একেবারে নিকষ। তখন গরাদের অন্তরালে শুধুই দীর্ঘশ্বাস পড়ত। অন্ধকার থেকে মুক্তধারার ডাক শুনতে পেয়েছিলেন এক বন্দি। আলিপুর সংশোধনাগার আক্ষরিক অর্থেই তাঁর জীবনে শোধনের পথ খুঁজে দেয়। ১৩ বাই ১০ মিটারের কোর্টের প্রতি টান এড়াতে পারেননি। এই ব্যাপারে উত্সাহ পান এডিজির কারার থেকে। আর থামতে হয়নি। কবাডির কোর্টে ঝড় তোলেন ইলিয়াস সরদার। দক্ষিণ ২৪ পরগনার তালদির এই যুবক এখন আলিপুর কবাডি দলের অধিনায়ক। পরপর টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়নও।

ক্যানিং-বারুইপুর রোডে তালদি মোড়ে নেমে আঁকা-বাঁকা পথ। সবুজ ধানক্ষেতের মাঝে অসমান রাস্তা ধরে মিনিট পনেরো এগোলে ইলিয়াস সরদারের বাড়ি। নারায়ণগড়ের এই বাড়িতে তিনি একপ্রকার ‘অতিথি’। এক সপ্তাহের জন্য এসেছেন।‌ ছেলের সঙ্গে গল্প, মা, দাদা, স্ত্রীর সঙ্গে সংসার নিয়ে কথা বলতে গিয়েই কীভাবে সময় বেরিয়ে যায়। আবার যেতে হবে আলিপুর সংশোধনাগারে।

২০০৬ সালে তালদির দাঁড়িয়ায় এক খুনের ঘটনায় জড়িয়ে পড়েন ইলিয়াস ও তাঁর আত্মীয়রা। ইলিয়াসদের অভিযোগ সেসময় তাঁরা বিরোধী দল করায় রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের শিকার হন। সেই থেকে আলিপুর সেন্ট্রাল জেলই তাঁর ঘর-বাড়ি। হ্যাঁ, বাড়িই বটে। বাড়ির মতোই এখানে কয়েক ঘণ্টা কবাডি খেলতে পারেন। ছোটবেলায় যেমন গ্রামের বন্ধুদের গাইড করতেন, এখানেও তেমন। এখানে ইলিয়াস যে আলিপুর সংশোধনাগারের কবাডি টিমের নেতা। জেলের অন্ধকার থেকে মুক্তির স্বাদ পেতে কবাডিই ইলিয়াসের ধ্যানজ্ঞান। এডিজি কারা থাকাকালীন বিডি শর্মার নজর এড়ায়নি ইলিয়াসের নৈপুণ্য। মূলত তিনিই উত্সাহ দেন এই যুবককে। তারপর আর পিছনে তাকাতে হয়নি। সংশোধনাগারের সব কাজ সেরে ঠিক বেলা ৩টে হলেই কবাডি কোর্টে চলে আসেন ইলিয়াস। সহযোদ্ধাদের নিয়ে শুরু হয় নতুন ভোরের লড়াই।

২০০৬ সাল থেকে বন্দিদশা থাকলেও, কিছু দিনের মধ্যেই নিজের যোগ্যতা বুঝিয়ে দেন ইলিয়াস। তাঁর নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা নজর এড়়ায়নি জেল কর্তৃপক্ষের। ২০১০ সালে তাঁকে ক্যাপ্টেন করা হয়। এরপর জেল টিমের অধিনায়ক হিসাবে ইলিয়াস মেদিনীপুরে গিয়েছেন। সেখানে ১৬টি টিমের মধ্যে চ্যাম্পিয়ন। ক্যালক্যাটা প্রিমিয়ার কবাডি লিগ। সেখানেও সেরা। সাফল্যের সরণিতে হাঁটতে হাঁটতে এই মুহূর্তে দেশের সাড়া ফেলে দেওয়া প্রো কবাডি লিগে খেলার সুযোগ এসে গিয়েছিল। কিছু সরকারি নিয়ম ও অনভিজ্ঞতার কারণে অবশ্য আর তথাকথিত গ্ল্যামারের ময়দানে নামা হয়নি ইলিয়াসের। তাতে কী। আলিপুরের টিমমেটদের নিয়ে পৌঁছে যেতে চান আরও আরও দূরে। কবাডি খেলায় ইলিয়াসের পছন্দের পজিশন গালা ক্যাচার। গালা ক্যাচারের কাজ বিপক্ষ কোনও খেলোয়াড় ঢুকলেই তাকে জাপটে ফেলা। এই করতে করতেই বোধহয় মুক্তির দড়ি ছুঁয়ে ফেলার কাজটাও অলক্ষ্যে করে ফেলছেন ইলিয়াসরা।

দেখতে দেখতে যাবজ্জীবনের ৯ বছর পেরিয়ে গিয়েছে। এত ভাল খেলার জন্য ও সংশোধনাগারে শৃ্ঙ্খলানরক্ষার কারণে বছরে একাধিকবার প্যারোলে বাড়িতে আসার সুযোগও পায় ইলিয়াস। মূলস্রোতে ফেরার তার এই অদম্য লড়াইয়ে কবাডি হয়ে উঠেছে মন্ত্র। সংশোধনাগারের অন্যান্য সাজাপ্রাপ্তদের সে অনেকটাই বোঝাতে পেরেছে অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া নয়, আলোয় ফিরতে হলে লড়াই করতে হবে প্রতিনিয়ত। তারা মূলস্রোতে ফিরলে লাভ সকলের।

শিবপ্রসাদ বসু ও নন্দিতা রায়ের ‘মুক্তধারা’ দেখিয়েছিল সংশোধানাগারের সবকিছুই সাদা-কালো নয়। ইউসুফ ওরফে নাইজেল আকারা যে তাঁর জ্বলন্ত উদাহরণ। অলকানন্দা রায়ের নৃত্যনাট্য ‘বাল্মিকী প্রতিভা’ জীবনের চোখ খুলে দিয়েছিল ইউসুফদের। বাস্তবের ইলিয়াসরাও সেই পথের পথিক। অলকানন্দার দলের হয়ে মুম্বই, দিল্লি গিয়ে নৃত্যনাট্যে মাতিয়ে এসেছেন ইলিয়াস ও তার সহবন্দিরা। কলকাতায় তাদের নাচের কেরামতি দেখে আবেগতাড়িত হয়ে পড়ে তাদের পরিবারও। ভুল হয়। কিন্তু সেই ভুলের জন্য দোষারোপ না করে, আর যাতে ভুল না হয় সেই পথই খুঁজে চলেছেন এই যুবকরা। মুক্তির সন্ধানে পাগল হয়ে উঠেছে তাদের হৃদয়।

জীবনের ৩৩টা বসন্ত পার। হারা ম্যাচ অনেক জেতালেও বন্দিদশার ইনিংস কত দ্রুত শেষ হবে জানেন না ইলিয়াস। তবে এটা জানেন নিজের কাজ করে গেলে সত্যিই মুক্তির ভোর আসবে জীবনে।

Related Stories