সুখসাগর পেঁয়াজে বলাগড়ে সমৃদ্ধির খোঁজ

অন্য প্রজাতির থেকে চাষের খরচ বেশ কম। সময়ও লাগে অল্প। ফলনও অনেকটা বেশি। সংরক্ষণের তেমন হ্যাপা নেই। এক সঙ্গে এত গুণের সুখসাগর পেঁয়াজ নিয়ে তাই আহ্লাদের শেষ নেই হুগলির বলাগড়ের চাষিদের। রাজ্যের পেঁয়াজের গোলা বলাগড় এই পেঁয়াজেই সুখের খোঁজ পেয়েছে। পেঁয়াজ বিক্রি করে অনেকেই ভদ্রস্থ আয়ের পথ পেয়েছেন, পাশাপাশি পেঁয়াজ বীজ বিক্রি করেও কেউ কেউ প্রতিষ্ঠিত।

0

দুর্গাপুজো পেরোলেই তোড়জোড় শুরু হয়ে যায় মিন্টু দাস, পুষ্পেন্দু দাস, আশিস দাসদের। আমন ধানের জমি পরিষ্কার করে সেখানে সুখসাগরের বীজ ফেলা হয়। কার্তিক-অগ্রহায়ণে এই পর্ব শেষ হওয়ার পর দু মাস ধরে ঠিকমতো যত্ন নিলেই আর চিন্তা নেই। জমি থেকে পেঁয়াজ বাড়ি আসার আগেই খদ্দের হাজির। হুগলির বলাগড় ব্লকের জিরাট, খামারগাছি, বেহুলার মতো এলাকার অধিকাংশ কৃষিজমিই এখন পেঁয়াজের মানচিত্রে। সব জায়গাতেই সুখসাগর প্রজাতির পেঁয়াজ চাষ হয়। রাজ্যের বাড়তে থাকা পেঁয়াজের চাহিদা নাসিকের বাইরে মেটায় এই বলাগড়। বলাগড়ের পেঁয়াজ ঢুকলেই দামের ঝাঁঝ থেকে অনেকটা মুক্তি মিলবে।

কয়েক বছর আগেও বলাগড়ে পেঁয়াজের এত রমরমা ছিল না। স্থানীয় পেঁয়াজ চাষি মিন্টু দাসের কথায়, সুখসাগর পেঁয়াজ চাষ শুরু হওয়ার পর বোরো ধানের চাষ একেবারে বন্ধ। আলু নিয়ে তেমন আর কেউ আগ্রহ দেখান না। কারণ আগে অন্য পেঁয়াজ চাষ হলেও অন্তত ৯০ দিন সময় লেগে যেত। অথচ ৭৫ দিনেই হয়ে যায় সুখসাগর। শুধু সময়ের সাশ্রয় নয়, ফলনেও অন্য প্রজাতির পেঁয়াজকে টেক্কা দিয়েছে সুখসাগর। সাধারণ পেঁয়াজে বিঘে প্রতি ৪০ মণ হলে যেখানে দারুণ ফলন হয়েছে বলে ধরে নেওয়া হয়, সেখানে খুব খারাপ হলে সুখসাগরের ফলন হয় ৭০ মণ। সর্বোচ্চ ১২০ মণ। ফলন বেশি তাই রোজগারও বেশি। এর পাশাপাশি সুখসাগরের সংরক্ষণ নিয়েও ভাবতে হয় না চাষিদের। কারণ পাতা সহ পেঁয়াজের আঁটি বাড়ির চালে কিংবা বাঁশের কড়িকাঠে ঝুলিয়ে দিলে মাস ছয়েক দিব্যি চলে যায়। আসলে এই পেঁয়াজের খোসা কিছুটা মোটা হওয়ায় কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সহজে পচে যায় না।‌ সুখসাগরের জন্য সংরক্ষণের ঝামেলা এবং হিমঘরে নিয়ে যাওয়া থেকে মুক্তি পেয়েছেন চাষিরা। এর ফলে তারা আর্থিক দিক থেকেও অনেকটা লাভবান হয়েছেন। জেলা কৃষি দফতর সূত্রের খবর এবার বলাগড় ব্লকে ২০০০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ চাষ হচ্ছে। যার নব্বই ভাগই সুখসাগর।

খামারগাছির ছোট্টু দাস তাঁর ৭ বিঘে জমিতে এবার সুখসাগর চাষ করেছিলেন। প্রায় ৬৫০ মণ পেঁয়াজ পেয়েছেন তিনি। বীজ বসানো, শ্রমিকদের মজুরি, সার, জলের খরচ ধরে বিঘে প্রতি ২০ হাজার টাকার মতো লাগে। পারিবারিক সমস্ত চাহিদা মিটিয়ে সেখানে বিঘে প্রতি রোজগার হয় পাঁচ হাজার টাকা। ছোট্টুর মতো আশিস দাসও সুখসাগর চাষ করে সমৃদ্ধি পেয়েছেন। আশিসের কথায়, কয়েক বছর আগে আমরা পারিবারিক চাহিদা মেটাতে মূলত পেঁয়াজ চাষ করতাম। তাতে তেমন একটা লাভ হত না। কিন্তু সুখসাগর চাষের পর সব প্রয়োজন মিটিয়েও বাড়তি রোজগার হচ্ছে। মিন্টু দাসের এক বিঘা জমি। এই তরুণ চাষি মনে করেন আরও কিছুটা জমি থাকলে পেঁয়াজটা আরও জমিয়ে চাষ করতে পারতেন। আক্ষেপ থাকলেও পেঁয়াজের বীজ বিক্রি করে তিনি বাড়তি রোজগারের পথ পেয়েছেন। পেঁয়াজ বীজ বাড়ি বয়ে নিয়ে যান চাষিরা। মিন্টুদের মতো চাষিদের সুখসাগর পেঁয়াজের বীজ পৌঁছে যাচ্ছে মুর্শিদাবাদ, দুই চব্বিশ পরগনা, বর্ধমান এমনকী বাংলাদেশে।