'তোমাকে ভালোবাসি' বলতে এত লজ্জা কিসের?

0

এদেশের মানুষ কিছু কিছু বিষয়ে একই রকম স্বভাব-চরিত্রের পরিচয় দেন। এ ব্যাপারে প্রতিযোগিতা হলে আমরা সোনা, রূপো আর ব্রোঞ্জও জিতে নিতে পারি। আমাদের জীবনের যেন একটা ধরাবাঁধা ট্র্যাক রেকর্ড আছে। কেউ কোনও ভালো কাজ করলে আমরা সে মানুষটিকে সহজে প্রশংসা করি না। আমার কথায় বিশ্বাস না হলে, পরীক্ষা করে নেবেন। সবার‌ আগে নিজেকে প্রশ্ন করে দেখুন, আপনি কবে শেষবার কাউকে প্রশংসা করে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানিয়েছেন?

আমাদের চারপাশের পৃথিবী, ঘরবাড়ি থেকে শুরু করে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে মানুষ মানুষের মাধ্যমে প্রশংসিত হচ্ছে না। কেননা, মানুষ নিজে প্রতিযোগিতার পাল্লায় পড়েছে। মানুষের প্রতিযোগী হয়ে উঠছে মানুষই। এমনকি, আমাদের স্টার্ট আপের দুনিয়াতেও আমরা একেকজন যেন সমালোচক হয়ে উঠছি। যেন আমরা সমালোচক হিসাবে এক-একজন বিশেষজ্ঞ।

এটা আমি বহু বছর ধরেই লক্ষ্য করছি। আর দেখেশুনে অবাক হয়ে ভেবেছি, কেন আমরা এরকমটা করি? গতকালই এবিষয়ে আমি খানিক অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছি। একটি নতুন সংস্থার একদল উজ্জ্বল কর্মীর সঙ্গে আলাপ করার সুযোগ পেয়েছিলাম। ওঁদের কাছে আমি জানতে চেয়েছিলাম, আপনারা কি পরস্পরের ভিতর কোনও অসাধারণত্ব খুঁজে পেয়েছেন ? আর সে কারণে কি একে অন্যের প্রশংসা করেছেন? সহ‌কর্মীরা একে অন্যকে কাছে গিয়ে আপনারা কি ভালো কাজের কথা কিছু বলেছেন? সত্যিই অবাক করার মতো ব্যাপার। ওই কর্মীরা কেউই তা করেননি।

এজন্য দায়ী আমাদের বাবা-মা। আপনিও নিশ্চয়ই আমার সঙ্গে একমত হবেন (তবে আমার সঙ্গে তর্কে নামতেও পারেন, আমার জীবনের গপ্পোটা আপনাকে শোনালে।) যদিও, এই-ই সবচেয়ে সহজ পথ!

আমাদের বাবা-মায়েরা প্রশংসা ও ভালোবাসা জানানোর জন্যে আমাদের একটা আজব কায়দা শিখিয়েছেন। এব্যাপারে আমার ‌জীবনের গল্পের সঙ্গে আপনার জীবনের গল্পোটা মিলে গেলে তা আমাকে জানাবেন।

স্কুলে পড়ার সময় আমি ভালো বাগ্মী ছিলাম। ডিবেট প্রতিযোগিতাতেও ভালোই করতাম। পুরস্কার হাতে নিয়ে বাড়ি ফেরার পরে মা আমার দিকে তাকিয়ে হাসতেন‌। তখন আমি উপল‌ব্ধি করতাম, আমার সাফল্যে মা খুব সুখী হয়েছেন। তাছাড়াও, মা আমার জন্যে গর্বিত। এরপর মা আমায় কিছু কথা বলতে চাইতেন। মা বলতেন, এসব খুবই ভালো ব্যাপার। কিন্তু, মা বলতেন, মায়ের চেনা একটি মেয়ে তাঁর বাগ্মী‌তার জেরে এখন বিবিসি-র সঙ্গে একটা প্রোজেক্টে গুরুত্বপূর্ণ কোনও কাজ করছে। তা তুমিও ভালোই করছ। ম‌নে রেখো, তোমাকে বহুদূর পর্যন্ত যেতে হবে। সামনে অনেকটা পথ পেরোতে হবে। ও কথায় আমি বিরক্ত হলেও, মায়ের প্রতি শ্রদ্ধাবশত আমার ওই মনোভাব প্রকাশ করিনি।

আসলে আমার মা অনবরত উদ্বিগ্ন থাকতেন একারণে, হয়তো এইসব ছোটখাটো জয়গুলি আমার মাথায় পাকাপাকিভাবে ঢ‌ুকে যাবে। মা এটা চাইতেন না। ‌কিন্তু. আমি নিজে অন্যরকমভাবে ভাবতাম। আমি চাইতাম, আমার এই সাধারণ জয়গুলিও উদযাপিত হোক। এরকম হওয়া উচিত বলেই মনে করতাম। আর সেইসঙ্গে আশা করতাম, পরিবারের পক্ষ থেকে অন্তত ছোটখাটো কোনও উপহার দিয়েও আমাকে স্বীকৃতি দেওয়া হোক। অন্তত, একটা আইসক্রিম কিংবা একদিন পাঠ্য বই পড়ার রুটিন থেকে ছাড়। কেননা, আমি জিতে এসেছি। আমার স্কুলবেলায় এরকমটাই ঘটেছে।

আমার এও মনে আছে, সিএনবিসি থেকে অফার লেটার পাওয়ার পরে মা আমাকে কী বলেছিলেন। খবরটা পেয়ে মা খুব খুশি হয়েছিলেন। তারপর বলেছিলেন, তোমার খুড়তুতো ভাইকে দেখো। আমেরিকায় সে একজন সফল মানুষ। প্রতি মাসে বাবা-মাকে এক হাজার ডলার করে পাঠায়।

কিছু জিনিস মোটেও বদলায় না। আবার কিছু জিনিসের স্বাদ আজও আমরা পেলাম না। অন্তত, বেশিরভাগ মানুষের কাছেই ওটা অধরা। আমরা অন্যের প্রশংসা করতে এবং কারও প্রশংসা গ্রহণ করার মতো উপযুক্ত যেন হয়ে উঠতে পারিনি। এর অন্যতম কারণ হল, আমরা বৈচিত্রকে স্বীকার করতে সহজে চাই না। মানুষের সঙ্গে সরল সম্পর্ক গড়তে তাই নানা অনীহায় ভুগি।

সমীক্ষা ও গবেষণা থেকে দেখা যাচ্ছে, মানুষের ওপর সেই মানুষ‌গুলির প্রভাবই বেশি, যাঁরা কথায় কথায় আমাদের নেতিবাচক সমালোচনা করেন। আমরা সেই মানুষগুলির সংস্পর্শ চাই, যাঁরা আমাদের নেতিবাচক সমালোচনা করবেন। যাঁরা আমাদের সম্পর্কে ইতিবাচক তাঁদের তুলনায় এঁদেরই আমরা বেশি বুদ্ধিমান বলে মনে করি। তাই, যতই আপনি লোকের খারাপ ধরনের সমা‌লোচনা করতে পারবেন আর টেনে নীচে নামাতে পারবেন, ততই যেন বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিতে পারবেন আপনি।

যা কিছু ‌ইতিবাচক তা যেন একঘেয়ে। এমনকি বুদ্ধিহীন। তাই, ইতিবাচক মানসিকতাকে আমরা গ্রাহ্যের মধ্যে নিই না। একটা সিগারেট টানতে যেটুকু সময় লাগে, ,সেকারণে ওইটুকু সময়েও জীবনের ইতিবাচক দিকগুলিকে আমরা উপভোগ করি না। এও সত্যি ঘটনা, ইতিবাচক খবরাখবর হেডলাইন হয় না। তবে, আমি বিশ্বাস করি, ইতিবাচক মানসিকতা আর প্রশংসার ভিতর দিয়ে সব সময়েই জয় আসে। আমি সেইসমস্ত ইতিবাচক মানসিকতার মানুষজনকে শ্রদ্ধা করি, যাঁরা মানুষের প্রশংসা করতে আর মানুষের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ে উন্মুখ। এভাবে তাঁরাও নিজের জীবনে নিরাপত্তা ও ভালোবাসার বোধ তৈরি করেন।

প্রত্যেক নতুন দিন জীবনকে তারিফ করার মতো সুযোগ সৃষ্টি করে। নিজেদের জীবন ছাড়াও এতে উপকৃত হন, যাঁরা আমাদের সঙ্গে আছেন, সেই মানুষগুলিও। তাই আসুন, আমরা তারিফ করি আর ভালোবাসি। সারা পৃথিবী কী বলল, তা পরোয়া না করলেও চলবে।

যদি আপনি কাউকে বা কোনও কিছু ভালোবাসেন, তাহলে ওই ভালোবাসা অকুণ্ঠভাবে জানিয়ে ফেলুন। এটা নিশ্চয়ই আপনারা সবাই জানেন, অন্যের প্রশংসা করাটা‌ও এই মানবজীবনে এ‌কটা অতি গুরুত্বপূর্ণ কাজের মধ্যেই পড়ছে। ‌

আমরা যারা ভ্যালেন্টাইনস ডে উদযাপন করছি চলুন সবাই মিলে অঙ্গিকার করি আমাদের স্টার্টআপ জার্নিটা অনাস্বাদিত দুর্দান্ত অভিজ্ঞতা করে তুলতে আমরা ভালোবাসব, প্রশংসা করব এবং অপরের ভালোকাজের তারিফ করব।


[লেখা- শ্রদ্ধা শর্মা, প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রধান সম্পাদক, ইওর স্টোরি

অনুবাদ- অর্ণব দত্ত]