খেত থেকে সরাসরি রান্নাঘরে তাজা সবজি! সৌজন্যে iOrderFresh

0

সবজি বিক্রির ক্ষেত্রে খুচরো ব্যবসায়ীরা পাইকারি দামের চেয়ে অন্তত ১০০শতাংশ এবং উৎপাদন মূল্যের চেয়ে অন্তত ১৫০-২০০ শতাংশ বেশি দাম নেন। তা সত্ত্বেও তাঁরা খুব একটা লাভ রাখতে পারেন না। এর কারণ একটাই - আমাদের দেশে এই পুরো বাজার ঘিরে চলতে থাকা সাপ্লাই চেন। এক হাত থেকে আর এক হাত বদল হতে হতে আপনার বাড়ির দরজায় পৌঁছনো পর্যন্ত সবজির অর্ধেক গুণমান নষ্ট হয়ে যায়। 

ঠিক এই জায়গাটাই ধরতে চেয়েছেন, নীতিন সহনি এবং সন্ধ্যা সহনি। লক্ষ্য একটাই, খেত থেকে তোলার ১২ঘণ্টার মধ্যে তাজা সবজি মানুষের রান্নাঘরে পৌঁছে দেওয়া। এতে দামও লাগবে কম, আবার সাধারন মানুষ এবং কৃষক- উভয়েই উপকৃত হবেন।

২০১৪ সালের ডিসেম্বর মাসে চালু হওয়া iOrderFresh একটি ফ্রেশ প্রোডিউস এবং গ্রসারি মোবাইল রিটেল প্ল্যাটফর্ম, যা দিল্লি এবং গুরগাঁওয়ের ঘরে ঘরে তাজা খাবার এবং মুদির জিনিস পৌঁছে দেয়। ফ্রেশ ফুড, মূলত, কাঁচা সবজি এবং ফলের ক্ষেত্রে সাপ্লাই চেন-এর বিভিন্ন সমস্যার কথা মাথায় রেখেই কাজ শুরু করেছিল এই সংস্থা। 

নীতিনের মতে তাঁর সংস্থা একেবারে অন্যরকম এবং সুরক্ষিত পরিষেবা প্রদান করে। কারণ, এখানে রাতভর খাদ্য মজুত করে রাখার কোনও বিষয় নেই। প্রাত্যহিক দুটি নির্দিষ্ট সময়ে তাজা ফলমূল, শাক সবজি ক্রেতাদের বাড়িতে পৌঁছে দেন তাঁরা।

বিনিয়োগ এবং বৃদ্ধি

নীতিন এবং সন্ধ্যার জমানো টাকা এবং পরিবার ও বন্ধুদের কাছ থেকে নেওয়া সাহায্য - মোট ২০,০০০ মার্কিন ডলার নিয়ে কাজ শুরু করেছিল iOrderFresh। প্রথমেই নিজেদের প্রযুক্তিগত বিষয়গুলির উপর জোর দিয়েছিলেন তাঁরা, যার মধ্যে নিজেদের অ্যান্ড্রয়েড এবং আইওএস অ্যাপ তৈরীর প্রক্রিয়াও ছিল বৈকি। তাঁরা এমন এক রেভিনিউ মডেল অনুসরণ করছেন, যেখানে, বিক্রেতাদের নিজেদের নথিভুক্ত করার জন্য একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হয। এই টাকার অংকটাও সংস্থার মোট আয়ের একটা অংশ।

আর সংস্থার বৃদ্ধির কথা যদি বলেন, "চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসে আমরা প্রতিদিন গড়ে ১০০০টি করে অর্ডার পেয়েছি। গত এক বছরে আমাদের নথিভুক্ত গ্রাহকের সংখ্যা ১লক্ষ ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ৫৫শতাংশ মানুষের কাছ থেকে আমরা নির্দিষ্ট সময় পরপর অর্ডার পাচ্ছি। এভাবে চলতে থাকলে ২০১৬-র মার্চ মাসের মধ্যে আশা করা যায়, আমাদের গ্রাহকসংখ্যা ২.৫ লক্ষ ছাড়িয়ে যাবে। তবে আগামী বছরেও অন্য কোনও শহরে শাখা খোলার পরিকল্পনা আমাদের নেই। আমরা দিল্লির বাজারটাকেই ধরতে চাই, এবং এই ক্ষেত্রে সেখানকার সবচেয়ে বড় ব্যবসায়ী হয়ে উঠতে চাই," জানালেন নীতিন।

বিভিন্ন পরিচিত ব্যক্তির সূত্র ধরে গত এক বছরে আরও ১লক্ষ মার্কিন ডলার বিনিয়োগ পেয়েছে এই সংস্থা। গত জুলাই মাসে বেস্ট ফুডওয়ার্কসের কাছ থেকে এসেছে আরও ১লক্ষ মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ। "আমরা একক অর্থনীতিতে মনযোগ দিচ্ছি এবং আমাদের সংস্থাকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করে তোলার চেষ্টা করছি। তবে আরও পুঁজির প্রয়োজন আছে এবং তার জন্য আরও বিনিয়োগ প্রয়োজন। আমরা আগামী বছরের প্রথম তিনমাসের মধ্যেই আরও এক ধাপ বিনিয়োগের আশা করছি," বললেন নীতিন সহনি।

বাজার ও প্রতিযোগীতা

আজকের বাডারে এটি সবচেয়ে বড় কনজিউমার সেগমেন্টগুলির মধ্যে একটা। যে ক্ষেত্রের এখনকার বাজারমূল্য ৩৩০ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২০ সাল পর্যন্ত ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। 

বিগবাস্কেট, গ্রোফার্স এবং পেপারট্যাপ-এর মতো সংস্থাগুলি iOrderFresh এর মূল প্রতিযোগী। গত কয়েক মাসে এই সংস্থাগুলির প্রত্যেকেই বিশাল অঙ্কের বিনিয়োগ জোগাড় করতে পেরেছে।

এবছর বিগবাস্কেট তাঁদের বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে, আরও ৫০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ পেয়েছে। এর আগে, গতবছর সেপ্টেম্বর মাসে হেলিয়ন ভেঞ্চার্স এবং জোডিয়াস ক্যাপিটাল-এর কাছ থেকে মোট ২০০কোটি টাকার বিনিয়োগ পেয়েছিল এই সংস্থা।

অন্যদিকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে সেক্যুয়া ক্যাপিটাল এবং টাইগার গ্লোবালের কাছ থেকে ১০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ পেয়েছিল গ্রোফার্স। এপ্রিল মাসে আরও এক ধাপ বিনিয়োগ পায় এই সংস্থা। ওই বিনিয়োগকারীরাই আবার ৩৫ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেন গ্রোফার্সে।

গত সেপ্টেম্বরে, দ্বিতীয় ধাপে, ৩৬মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ পেয়েছে মোবাইলকেন্দ্রিক হাইপারলোকাল গ্রসারি ডেলিভারি সার্ভিস পেপারট্যাপ-ও। সংস্থার তরফে খবর, তাঁদের বিনিয়োগকারীদের তালিকায় স্ন্যাপডিল, সেক্যুয়া ইন্ডিয়া, সইফ পার্টনার্স-এর পাশাপাশি যোগ হয়েছে জ্যাফকো, আরইউ-নেট,বিনেক্সট-এর নাম।

যদিও প্রতিযোগীতা থাকলেও নীতিন বলছেন, এই ক্ষেত্র কখনওই কোনও সংস্থার একচেটিয়া বাজার হয়ে উঠতে পারে নি এবং ভবিষ্যতেও পারবে না। এটি একটি একেবারে স্থানীয় বাজার এবং স্থানীয় বাজারের হিসেবে কোনও নির্দিষ্ট এলাকার মানুষের কাজে আসতে পারলে তবেই এই সেগমেন্টে টিকে থাকা সম্ভব।

তবে বিভিন্ন সংস্থার নিজেদের প্রতিযোগীতা নয়, এই বাজারে টিকে থাকার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলেন গ্রাহকরা এবং তাঁদের অভ্যেস। এখনও অনলাইনে জামাকাপড় কিনলেও গ্রসারি শপিংয়ে সেভাবে অভ্যস্ত হতে পারেননি সাধারণ মানুষ। তাঁদের ইন্টারনেট বা অ্যাপ ব্যবহার করে মুদিখানার জিনিস অর্ডার করতে অভ্যস্ত করে তুলতে হবে। চাহিদা অনুযায়ী প্রোডাক্ট সরবরাহ, উন্নতমানের জিনিস দেওয়া এবং বাজারে খুব সহজে পাওয়া যায় না এরকম প্রিমিয়াম রেঞ্জের প্রোডাক্ট বাড়ির দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে পারলে তবেই মানুষকে আকর্ষণ করা সম্ভব। ইতিমধ্যেই ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন ধরণের প্রোমোশনের ব্যবস্থা করে খানিকটা হলেও নজর কাড়তে পেরেছে ই-কমার্স। নীতিন বলছেন, "আমরা সাধারণ মানুষকে বোঝাতে চাই, দোকানে যাওয়ার প্রয়োজন কী, যখন পুরো সুপারমার্কেটটাই আপনার পকেটে রয়েছে!"

(লেখা : তৌসিফ আলম, অনুবাদ : বিদিশা ব্যানার্জী)