আঙ্গুঠা ছাপের Cashless ইকোনমি

1

এরকমই শীতের সকালে কনকনে ঠাণ্ডায় পিঠে ঢাউস ব্যাগ নিয়ে স্কুলে যেতাম। বুধিয়া কাকার রিক্সা আসত। কুয়াসা কেটে কেটে বড় দিঘির পাড় দিয়ে সোজা স্কুল। এবড়ো খেবড়ো রাস্তায় ঝনঝন আওয়াজ করতে করতে রিক্সা ছুটত। খবরের কাগজের নিমাই কাকা, সাইকেলে ক্রিং ক্রিং করে পাশ দিয়ে রোজ ছুটতেন বাড়ি বাড়ি। তখন আমার প্রাইমারি। সেখানে যে আয়া মাসি কাজ করতেন, যিনি স্কুলের গেট থেকে আরেকটা মায়ের দায়িত্ব নিতেন তিনি লক্ষ্মী মাসি। আমাদের আপনজন। টিচার রা বকলে, টিচারদের বকতেন। গোটা স্কুলের করিডোরে দৌড়াদৌড়ি করলে আমাদেরও বকতেন। সহবত শেখানোর চেষ্টা করতেন। জীবনের অনেক শিক্ষাই পেয়েছি লক্ষ্মী মাসির কাছ থেকে। স্কুলের সেই মাসিকে একদিন দেখে ফেলেছিলাম অফিস ঘরে, কেষ্টকাকু টাকা দিচ্ছেন, লক্ষ্মীমাসি টাকা নিচ্ছেন, আর একটা লম্বা খাতায় আঙুলে কালি লাগিয়ে ছাপ দিচ্ছেন।

আমি দেখে ফেলেছিলাম বলে কী ভীষণ লজ্জা পেয়েছিলেন শ্যামলা মাঝবয়সী সেই মহিলা। বাঁ হাতে কব্জির ওপরে উল্কি। হিন্দিতে ছবির মতো আঁকা মাঁ... চোখে চোখ রাখতে দ্বিধা করতেন বেশ কয়েকদিন। আমি তখন ক্লাস থ্রি। আমিও একটা অপরাধ বোধে ভুগতাম। রহস্যে মোড়া সেই অপরাধ বোধ একদিন কেটে গেল। জানলাম লক্ষ্মী মাসির আরেকটা নাম 'অঙ্গুঠা ছাপ'। লিখতে পড়তে জানেন না বলেই তাকে এই অপমানের কালি আঙুলে লাগাতে হয়।

একটা সময় লেখা পড়া শেখার অন্যতম প্রেরণা ছিল, নিজে হাতে সই করতে শেখা। নিরক্ষরতার অভিশাপ থেকে মুক্ত হওয়া। আর আঙুলের কালি লাগিয়ে টিপসই যাতে দিতে না হয় তাই এত শিক্ষার অভিযান। এত কালি কলমের অহমিকা।

কেরল ১০০ শতাংশ সাক্ষর হয়েছে। এগোচ্ছে বিহার। এতদিনে লক্ষ্মী মাসি পড়তে শিখেছেন কিনা জানি না। কিন্তু নাম সই করার কাজটা যেমন শিখিয়েছিলাম তেমন ভাবে করতে পারেন এখনও। ছবির মত। সেভাবেই ব্যাঙ্ক থেকে টাকা তোলেন। টিপছাপের অভিশাপ থেকে মুক্তির স্বাদ পেয়েছিলেন লক্ষ্মী মাসি। সম্প্রতি লক্ষ্মী মাসি বেশ দ্বিধান্বিত। বয়স হয়েছে। দেখা হয়েছিল বাজারে। ডেকে বললেন, "শুনেছিস তো এবার আবারও টিপ সই দিয়ে টাকা লেনদেনের দিন ফিরে এলো।" বুঝলাম লক্ষ্মী মাসির কাছেও আধার পে অ্যাপের খবর আছে।

আধার পে অ্যাপ। অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ। সহজেই যে কোনও মোবাইলে ডাউনলোড হয়ে যাবে। IDFC Bank অ্যাপটি তৈরি করেছে Unique Identification Authority of India (UIDAI) এবং National Payments Corporation of India (NPCI) এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে। ক্যাশলেস টাকা লেনদেনের যে পরিবেশ তৈরি হয়েছে তাতে এই অ্যাপটি দারুণ কার্যকর হবে তা বলাই বাহুল্য। কারণ ক্রেতা বিক্রেতার মধ্যে টাকা লেনদেনের ক্ষেত্রে এতদিন হয় নগদ টাকা, ক্রেডিট কার্ড, ডেবিট কার্ড কিংবা চেকের ব্যবহার ছিল। এবার শুধু আঙুলের ছাপ দিলেই টাকা লেনদেন করা সম্ভব হবে। কারণ দেশের ৪০ শতাংশ প্রাপ্ত বয়স্কের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের সঙ্গে আধার কার্ড যুক্ত হয়ে গিয়েছে। মোবাইলে অ্যাপ্লিকেশনটি ডাউনলোড করলেই আর জিনিস পত্র কেনা কাটায় টাকা লেনদেন করতে হবে না। কার্ড দেখাতে হবে না। চেক সই করতে হবে না। আধার কার্ডের নম্বর আর আঙুলের ছাপ থাকলেই টাকা লেনদেন সম্ভব হয়ে যাবে।

দিন যত এগোবে, ততই টিপ ছাপটাই একান্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যাবে ভারতে। লিখতে পড়তে না জানলেও চলবে। লক্ষ্মী মাসির এতে খুশি হওয়া উচিত ছিল, কিন্তু তিনি বেশ মনমরা। জিজ্ঞেস করলে বলছেন, এই বন্দোবস্তে তার অপমান লুকিয়ে রয়েছে। আঙুলের ছাপ দিতে তাঁর মর্যাদায় বাঁধে।