হুল হজম করেই বাঁকুড়ায় সুখের ‘সমৃদ্ধি’

0

ধোঁয়া, আগুন জ্বালিয়ে মৌমাছিদের ছন্দ নষ্ট করা নয়। আত্মরক্ষায় শরীর ঢাকা পোশাক পরা কিংবা কোনওরকম ক্রিম ব্যবহারে তাঁর সায় নেই। খালি হাতেই মৌমাছিদের বাগে আনেন সুখ মহম্মদ। মৌমাছিরা মনের সুখে হুল ফোটালেও এতটুকু দমেন না। সেই আত্মবিশ্বাস থেকেই বাঁকুড়ার ওন্দার যুবক মধু সংগ্রহে করে বেড়ান মালদহ, সোনামুখী কিংবা সুন্দরবনে। কখনও আবার বিহার, ঝাড়খণ্ড বা গুজরাতে। চাক ভাঙা মধু ওন্দায় এনে প্রক্রিয়াকরণ শুরু হয়। মধুর সৌজন্যে গ্রামের স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মেয়েদের মুখে হাসি ফুটেছে। প্রকৃতির স্বাদ বোতলবন্দি হয়ে পৌঁছে যাচ্ছে বাংলার নানা প্রান্তে।

এগারোজনের সংসার। ইচ্ছে থাকলেও ক্লাস এইটের বেশি পড়া হয়নি সুখ মহম্মদ দালালের। ওন্দার চিঙ্গানীর বাসিন্দা ছোট থেকেই একটু ডানপিটে। গাছে চড়ার অভ্যাস ছিল বরাবর। সেটাই মধু সংগ্রহে কাজে আসে। পাড়া-গাঁয়ে মধুর চাক ভাঙার ডাক পড়ত তাঁর। একদিন মৌমাছি ভাঙার জন্য নির্দেশ আসে খোদ বিষ্ণুপুরের মহকুমাশাসকের থেকে। মৌমাছিদের বিরক্ত না করে নিপুণ হাতে সুখের কাজ দেখে চমকে গিয়েছিলেন মহকুমাশাসক। তিনি উদ্যমীকে পরামর্শ দেন এভাবে এর-তার বাড়িতে মৌমাছির চাক ভেঙে সময় নষ্ট করলে চলবে না, সংগঠিতভাবে কিছু করতে হবে। মধু তৈরি‌র পর ঠিকমতো প্যাকেজিং করলেই খাটনি হবে স্বার্থক। এব্যাপারে জেলাশাসকের সঙ্গে কথা বলেন মহকুমাশাসক। জেলাশাসকের হস্তক্ষেপে মধু তৈরির আধুনিক মেশিনের জন্য খাদি বোর্ড থেকে চার লক্ষ টাকার ঋণ পান সুখ। মৌমাছির পিছনে দৌড়ালে যে অনেক দূর যাওয়া যাবে তা তখন থেকেই বুঝতে শুরু করেন সুখ।

বিভিন্ন জায়গায় মধু ভাঙার জন্য এমনিতেই একটা পরিচিতি তৈরি হয়েছিল। সেটা কাজে লাগিয়ে রাজ্যের নানা প্রান্তে ছুটতে থাকেন সুখ। শুরু হয় স্বপ্ন দেখা। একবার খবর পান মালদার কালিয়াচকে লিচু ফুল থেকে ভালমানের মধু হয়। কার্যত বিনা সরঞ্জামে পৌঁছে যান মালদায়। একইভা‌বে নিজের জেলা বাঁকুড়ার বান্দোয়ান, রানিবাঁধ ও ঝিলিমিলির পলাশ ফুলের মধুও সংগ্রহ‌ শুরু হয়। আবার বিহার, ঝাড়খণ্ড থেকেও মধু সংগ্রহ করেন তিনি। গুজরাতের আমেদাবাদে এক ধরনের ঘাসের ফুলেও ভাল মানের মধু হয়। সেই মধুও রয়েছে সুখের জিম্মায়। শুরুর দিকে নিজের বাড়িতে মধু শোধনের কাজ শুরু করেন সুখ। এক প্রশাসনিক আধিকারিকের পরামর্শে গ্রামের মেয়েদেরও এই কাজে তিনি জুটিয়ে ফেলেন। তৈরি হয় স্বনির্ভর গোষ্ঠী। জেলা থেকে ভিনরাজ্যে ঘুরে মধু জোগাড়ে আরও গতি আনেন সুখ। কাঁচা মধুকে সংশোধন ও প্যাকেজিং-এর কাজ করেন রাফিয়া বিবি, সকিয়া বিবি, কলসুমা বিবিরা। তাদের তৈরি মধু কাচের বোতলে ২৫ গ্রাম থেকে এক কেজিতে পাওয়া যায়।

মস্ত ঝুঁকি নিয়ে কাজ। খালি হাতে কাজ করতে গিয়ে মাঝেমধ্যে মৌমাছির কামড়ও খেয়েছেন সুখ। সাতাশ বছরের যুবার কথায়, এখন কয়েকশো মৌমাছি কামড়ালেও সামলে নিতে পারি। তাঁর এমন কাজ অনেকের কাছেই তা বিস্ময়ের। কীভাবে এটা সম্ভব। তা অবশ্য ভাঙেননি সুখ। সবটাই তাঁর অভিজ্ঞতায় গাঁথা। আসলে মৌমাছিদের সঙ্গে তাঁর যে বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছে। মাঝেমধ্যে হুল ফুটলেও, তার বিনিময়ে অনেক কিছুই পেয়েছেন এই যুবক। সংসার এখন একাই টানেন। বোনেদের বিয়ে দিয়েছেন। ভাইদের পড়াশোনার দায়িত্ব। সুখ সবাইকে বোঝাতে চান ধোঁয়া বা আগুন জ্বালালে মধু পেতে কোনও সমস্যা হয় না। কিন্তু তাতে ক্ষতি হয়ে যায় মৌমাছির। এর ফলে বেশ কিছু মৌমাছি মারাও যায়। সুখ মনে করেন, যাদের থেকে আমরা এত কিছু পাচ্ছি, তাদের ক্ষতি করা ঠিক নয়। মৌমাছিরা বাঁচলে আমাদের লাভ। এই বার্তাই বিভিন্ন সরকারি শিবিরে বলে বেড়ান ওন্দার এই স্বপ্নসন্ধানী।

নিজেদের ব্রেনচাইল্ডের নাম সুখ রেখেছেন ‘ন্যাচারাল হানি’। ভাল প্যাকেজিং-এর দৌলতে তাঁদের মধু বাঁকুড়ায় ভাল বিক্রি হচ্ছে। মেলা, প্রদর্শনীর সুবাদে পৌঁছে যাচ্ছে রাজ্যের অন্যান্য প্রান্তে। সদ্য শেষ হওয়া ঝাড়গ্রামে জঙ্গলমহলে উত্সবের পাঁচ দিনে তাদের মধু প্রায় আশি হাজার টাকার বিক্রি হয়েছে। অনেকেই এমন মধুর খোঁজ করেছেন। সুখের কথায়, ‘‘মৌমাছির কামড় আমায় খেতে হবে। যখন দেখি আমার মতো গ্রামের অনেকেই মধুর ভরসায় সংসার ভালমতো চালাচ্ছেন তখন আর কোনও যন্ত্রণা থাকে না।’’ ওন্দার চিঙ্গানী এলাকা সংখ্যালঘু প্রভাবিত। কোনওরকমে চাষবাস করে মানুষের সংসার চলে। সেই বাড়ির মেয়েরাও এখন পর্দা সরিয়ে নির্ভরতার পথ খুঁজে পেয়েছেন। মধু তৈরির সঙ্গে যুক্ত গ্রামের স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সদস্য কলসুমা বিবির কথায়, ‘‘হাতের কাছে এমন কাজের সুযোগ আর কোথায় পাব। কীভাবে আরও রোজগার বাড়ে তারজন্য আমরা মনপ্রাণ দিয়ে কাজ করি। মাস গেলে দু থেকে তিন হাজার টাকা এসে যায়।’’ গোষ্ঠীর আর এক সদস্য সাকিয়া বিবি বলেন, ‘‘মধু তৈরি করে ছেলেমেয়েদের এখন একটু পড়াতে পারছি। সংসারের অবদান রাখতে পেরে ভাল লাগছে।’’ গোষ্ঠীর আঠারো জন সদস্যের কাছে এখন এমনই তৃপ্তির রেশ। সুখের স্বর্গে এখনই পৌঁছে গিয়েছেন বলে মনে করেন না সুখ। মধুর হাত ধরে এলাকা শুধু অন্যরাও যাতে সুখের খোঁজ পান সেটাই চান এই যোদ্ধা। মৌমাছির ক্ষতি না করে মধু সংগ্রহে তাঁর একান্ত পদ্ধতি এখন বাঁকুড়া, পুরুলিয়ার আলোচনার বিষয়।

Related Stories