"সমস্যার ভিতর সুযোগ খুঁজুন"- সো ইয়ং কাং

0

আপনাদের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেব এক লেখিকার। নাম সো ইয়ং কাং। ‘ইনসাইড আউট- কনভার্সেশন অ্যাবাউট লিডারশিপ অ্যান্ড ইনোভেশন ইন এ নিউ গ্লোবাল ইকনমি’ এই লম্বা নামের দুর্দান্ত বইয়ের লেখিকা। 

আরও পরিচয় বাকি, ইয়ং কাং একজন উদ্যোগী মহিলা, হার্ভাড বিজনেস স্কুল থেকে এমবিএ। পেনসিলভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সঙ্গীত তত্ত্বে মাইনর ডিগ্রী।তাছাড়াও পূর্ব এশিয় বিদ্যা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কে যৌথ স্নাতক ইয়ং কাং ম্যাকিনসে, সিটিগ্রুপ, জাপানের চিবা ব্যুরোয় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলেছেন।

তিনি awaken group নামের একটি মাল্টি ডিসিপ্লিনারি ট্রান্সফর্মেশান ডিজাইন ফার্মও খুলেছেন। তিনিই তার প্রতিষ্ঠাতা এবং কর্ণধার। পাশাপাশি পেশাদারী প্রশিক্ষণমূলক মোবাইল প্রশিক্ষণ অ্যাপ Gnowbe -এর যুগ্ম-প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও।

বিশ্বের তাবড় নেতাদের দীর্ঘ কুড়ি বছর প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। ২০০০ সালে তিনি তৈরি করেছেন 'দি ইয়ং প্রফেশনালস’ গ্রুপ। এই অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ছাত্রছাত্রীদের পেশাদারী স্বপ্ন পূরণের সুলুক সন্ধান দেয় এই গ্রুপ। TED Talk-এও দারুণ জনপ্রিয় ইয়ং। ওয়ার্ল্ড ইকনমিক ফোরাম তাঁকে ইয়ং গ্লোবাল লিডারের সম্মানে ভূষিত করেছে। 

ইওরস্টোরি’র ফ্ল্যাগশিপ কনফারেন্স টেকস্পার্ক এর বক্তা হিসেবে বেঙ্গালুরু এসেছিলেন ইয়ং। দেখা হয়ে গেল এই আশ্চর্যময়ী নারীর সঙ্গে। বললেন উদ্যোগের মৌলিক উপাদান; উদ্ভাবনী শক্তি, নেতৃত্ব, প্রযুক্তি এবং নতুন কিছু করে দেখাবার অদম্য আগ্রহ নিয়ে নানা কথা।

শুরুতেই জেনে নেওয়া যাক কোরিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সিঙ্গাপুর- এই তিনটে মশলা কিভাবে আপনার চরিত্রে গুলে গেল?

আমি একজন কোরিয়ান আমেরিকান যার জন্ম, বেড়ে ওঠা ও শিক্ষাদিক্ষা আমেরিকায়। জীবনের অধিকাংশ সময়টাই নিউ ইয়র্কে কাটিয়েছি। সম্প্রতি লস অ্যাঞ্জেলসে এসেছি। স্নাতক স্তরে পড়াশোনা করেছি ইউনিভার্সিটি অফ পেনসিলভেনিয়ায়। এমবিএ হার্ভাড বিজনেস স্কুলে। কোরিয়ায় কখনও না থাকলেও সেখানে অনেক সময় কাটিয়েছি। আমার অনেক ক্লায়েন্ট আছেন সেখানে। আমি কোরিয়ান ভাষাটা কোরিয়ানদের মতই জানি। মজার কথা হল আমি প্রায় দু বছর জাপানে ছিলাম। ফলে আমি স্বচ্ছন্দে জাপানীও বলতে পারি। এখন সিঙ্গাপুরে থাকি।

আপনার মতে আজকের ব্যক্তি জীবন ও পেশাদারী জীবনে প্রযুক্তির প্রধান তিনটি প্রভাব কি কি?

প্রযুক্তি (সমগ্র মানব ইতিহাস জুড়ে) আমাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা, কাজকর্ম ও খেলাধুলাকে এমন ভাবে পরিবর্তন করে চলেছে যা এক কথায় অভূতপূর্ব। আমার মতে এর তিনটি প্রধান অবদান-

১) ব্যক্তির ক্ষমতায়ন- সোশ্যাল মিডিয়া প্রত্যেককে তার নিজস্ব ভাবনা, ধারণা আর মতামত প্রকাশ করার ভাষা দিয়েছে। কিছু মানুষ অত্যন্ত দ্রুত ও বিপুল আকারে ডিজিটাল বিপ্লবের ক্ষমতা লাভ করছে আর প্রযুক্তির মঞ্চকে এমন ভাবে কাজে লাগাচ্ছে যে তার জেরে তাবড় রাষ্ট্র পর্যন্ত হিমশিম খাচ্ছে। এটা ভালো হোক মন্দ হোক প্রযুক্তির দৌলতেই ক্ষমতা পেয়েছে মানুষ।

২) স্বচ্ছতা ও দায়িত্ববোধ- প্রযুক্তির আরেকটি বড় প্রাপ্তি হল এটি পণ্য, সার্ভিস নিয়ে কোনও পর্দা থাকে না। সবই ওপেন। এতোটাই এমনকি ব্যক্তি মানুষের দুর্ভেদ্য হৃদয়ের গভীর পর্যন্ত স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ করে দেয়। ফলে মানুষ চাপে পড়ে হলেও অনেকবেশী দায়িত্বশীল হয়ে উঠতে বাধ্য হয়েছে। আড়াল মুছে যাওয়ায় দুনিয়াটা তুলনায় একটু স্পষ্ট হয়েছে। মানবিক চেতনাও ধীরে ধীরে মাথা তুলছে।

৩) সমতাবিধান- আমরা খুব কাছ থেকে দুশকোটি মানুষকে দেখেছি যারা মৃত্যুর পরও তাঁদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। আর এসব সম্ভব হয়েছে প্রযুক্তির দৌলতেই। যদিও এখনও অনেক পথ চলা বাকি, কিন্তু তবুও প্রযুক্তিতে ভর দিয়েই স্বাধীন হয়েছে মানুষ। ব্যাঙ্কিং পরিষেবাই হোক বা উচ্চশিক্ষা, মোবাইল পেমেন্ট হোক কিম্বা নতুন ফান্ডিং এর বিভিন্ন সুযোগ। সব ক্ষেত্রেই প্রযুক্তির প্রয়োগ অনস্বীকার্য। 

এই কয়েনের অপর পিঠেও তিনটি চ্যালেঞ্জ। যেগুলি ভাবাচ্ছে। ভাবতে হবে বইকি

১) প্রকাশ্য ও ব্যক্তিগত পরিসরের মধ্যেকার বিভাজিকা রেখাটি ক্রমশ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। ‘বিগ ব্রাদার’ এর নজরদারি নিয়ে একটা সুনিশ্চিত ভয়ও তৈরি হচ্ছে আর তার ফলে 'ব্যক্তিগত' পরিসরটি তাৎপর্য হারিয়ে ফেলছে।

২) ডিজিটাল দুনিয়ায় সামাজিক নিয়মকে পুনর্লিখনের প্রয়োজন আছে।

৩) মনুষ্যত্বের সংজ্ঞাটি কে পুনর্নির্ধারণ করা প্রয়োজন। যেহেতু আমরা বেশির ভাগ সময় ডিভাইসের সঙ্গে কাটাচ্ছি এবং প্রকৃত মানবিক আদানপ্রদানের পরিসর দিন দিন কমে আসছে, ফলে আমাদের ভাবতে হবে যে মানুষ বলতে এখন ঠিক কী বোঝায়?

উদ্ভাবনী বিষয়ে এতো রকমের বই রয়েছে- আপনার লেখা ইনসাইড আউট বইটি এই সাহিত্যে ঠিক কি ধরণের নতুন জিনিষ যোগ করতে সক্ষম হবে?

আমার মনে হয়েছিল প্রতীক হয়ে যাওয়া মানুষ গুলোর বিশ্বাস, জীবন দর্শন, মূল্যবোধ ও ভয় গুলোকেও অন্বেষণ করা জরুরী। কেননা আমি মনে করি যে মানসিকতা ও বিশ্বাস থেকেই সাফল্য আসে। এটা প্রথম থেকেই ছিল এমন একটা প্রোজেক্ট যা বিভিন্ন দেশের প্রেরনাদায়ী উদ্ভাবনময় নেতাদের তুলে ধরতে সাহায্য করবে, আর আমরা ইনসাইড আউট ইন্ডিয়া নিয়েও ভীষণই আগ্রহী।

শুরুয়াতি উদ্যোগপতিদের জন্যে আপনার পরামর্শ?

(স্টার্টআপ) শুরুয়াতি উদ্যোগপতিদের পথটা খুবই কষ্টসাধ্য। কিন্তু যদি কারোর হাতে দুনিয়া বদলের চাবিকাঠি থাকে তাহলে আমার মতে তা আছে একজন আন্ত্রেপ্রেনিওর এর হাতে। যখন গোটা দুনিয়া সমস্যা আর ঝামেলা দেখে, আমরা যারা উদ্যোগপতি তারা সেখানেই সুযোগ খুঁজতে থাকি। আমরা আয়ত্ত করতে চাই সমস্যাকে সাফল্যে বদলে ফেলার শিল্প। ব্যর্থতা আমাদের কাছে শিক্ষার সুযোগ। ‘না’ এর অর্থ ‘আবার জিজ্ঞেস করো’ অথবা ‘এখন নয়’। আমরা ‘না’ ও ‘হতে পারেনা’ তে বিশ্বাস করিনা। আমরা করে দেখিয়ে দিই। একটু ক্ষ্যাপাটে হলেও আমরাই জীবন কে সবচেয়ে বেশী উপভোগ করি।