সমুদ্রের জল থেকে পানীয় জলের ব্যবসা

0
সুমনা মিশ্র তাঁর Vision India 2020 বইএ ৪৫ টি শুরুয়াতি ব্যবসার পরিকল্পনার কথা বলেছেন, যে ব্যবসার বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা হয়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রবন্ধগুলি কল্প হিসেবে লেখা হয়েছে, ২০২০ সালের প্রেক্ষিতে। ব্যবসাগুলি যেন শুরু হয়েছে গত দশকে। সেই বইয়েরই একটি অধ্যায় তুলে দেওয়া হল। আশা করি এই রচনা সফল শুরুয়াতি ব্যবসা গঠনে সহায়ক হবে।

২০০৮ সালে ফোর্বসের কলামে আমি লিখেছিলাম, অ্যালকেমি একটি মধ্যযুগীয় বিজ্ঞান যা ধাতুকে সোনায় রূপান্তরিত করে। আমরা প্রাকৃতিক সম্পদকে যে দ্রুততায় ধ্বংস করছি তাতে অ্যালকেমির একটি বিশেষ শাখা মানুষের টিঁকে থাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে, তা হল সমুদ্রের জলকে পানীয় জলে পরিণত করার কৌশল। ওই কলামে এনার্জি রিকভারি আইএনসি. (ERI) নামের ক্যালিফোর্নিয়ার একটি কোম্পানি সম্পর্কে বিস্তারিত লেখা হয়। সেই কোম্পানিটি আমাদের হাইড্রো-অ্যালকেমি উদ্যোগ গঙ্গোত্রীর মূল দায়িত্বে ছিল। জুলাই, ২০০৮ এ আইপিও এর ঠিক আগে ডমিনিক সেখানে যোগ দেন। এই কলাম লেখার জন্য কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা নরওয়েজিয়ান উদ্যোগপতি এইচ.পি মিকেলের সঙ্গে আমাকে একাধিকবার দেখা করতে হয় যার ফলে জল শিল্প সম্পর্কে আমি প্রচুর জ্ঞান লাভ করি।

ERI পিএক্স প্রেসার এক্সচেঞ্জার নামে একটি সেরামিক যন্ত্র তৈরি করেছিল, এই যন্ত্র জল পরিশোধন প্ল্যান্টগুলির ডিস্যালিয়েশনের খরচ কমাতে সাহায্য করে। ২০০৮এ এই যন্ত্র ডিস্যালিয়েনের খরচ ইউএস ডলার ০.৪৬, প্রতি কিউবিক মিটারে নামিয়ে এনেছিল। স্পেন, ইজিপ্ট, আফ্রিকা, চীন এবং অস্ট্রেলিয়ায় ERI গ্রাহকরা প্রতিদিন ৫.২ মিলিয়ন কিউবিক মিটার পরিশুদ্ধ জল তৈরি করতে শুরু করে এবং এতে ৫০০ মেগাওয়াট শক্তি বা প্রতি বছর ৩৫২ মিলিয়ন ইউএস ডলার খরচ বাঁচে। ERI এর খুবই বড় মাপের ডিস্যালিয়েনেশনের উদ্যোগ ছিল, অ্যালজেরিয়ার প্ল্যান্টে প্রতিদিন ১৭৫,০০০ কিউবিক মিটার জল ও অস্ট্রেলিয়ার পার্থে ১৪৪,০০০ কিউবিক মিটার জল পরিশোধন হত ও এই প্ল্যান্টগুলি সমুদ্রের জল ডিস্যালিয়েশন করে মিউনিসিপ্যাল জল সরবরাহ করত।

ভারতে ঠিক এটাই হওয়া প্রয়োজন ছিল, খুব বড় মাপে। গঙ্গোত্রী ভারতের পরিশুদ্ধ জলের নতুন উত্স হয়ে উঠবে এমনটাই পরিকল্পনা ছিল, ২০১০ এর পর থেকেই গঙ্গা যে ভূমিকা নিতে অক্ষম। পান করা থেকে রান্না, সেচ, শিল্প প্রতিটি ক্ষেত্রেই পরিশুদ্ধ জল প্রয়োজন। তাই বাজারের কোন ক্ষেত্রটি আমরা বাছব সে বিষয় সতর্ক থাকা প্রয়োজন ছিল, এবং সেই মতই পরিকল্পনা করা দরকার ছিল।

আমরা প্রতিটি ক্ষেত্রের সম্ভাবনা ও অসুবিধাগুলি খতিয়ে দেখি। একটা জিনিস পরিস্কার ছিল, বহু সমুদ্রবন্দরে প্রচুর অব্যবহৃত উপকূলীয় রিয়্যাল এস্টেট সম্পত্তি রয়েছে যেখানে তারা ডিস্যালিয়েনেশন প্ল্যান্ট তৈরি করতে ইচ্ছুক। বন্দর এলাকায় অনেক উত্পাদন ইউনিটও ছিল, ফলে বাজারে ঢোকার কৌশল হিসেবে শিল্পের এই বাজারটি আমাদের কাছে লোভনীয় ছিল। ওয়ার্ল্ড ওয়াটার ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট ২০০৩ এর পূর্বাভাস অনুযায়ী শিল্প ক্ষেত্রে ব্যবহৃত জলের পরিমাণ ৭৫২ কিউবিক কিলোমিটার প্রতিবছর (১৯৯৫) থেকে বেড়ে ২০২৫ এ হবে ১,১৭০ কিউবিক কিলোমিটার। রিপোর্ট অনুযায়ী শিল্পে জলের ব্যবহার সবথেকে বেশি বাড়বে ভারতের মতো দ্রুত উন্নয়নশীল দেশগুলিতে।

২০১০ সালে আমরা আমাদের প্রথম চুক্তি করি হলদিয়া বন্দরের সঙ্গে, পাশাপাশি হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যালকে আমরা আমাদের প্রথম ক্রেতারূপে পাই। হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যাল ছিল কাছেই এবং সেখানে প্রচুর পরিমাণ জলের প্রয়োজন ছিল। প্রথম রাউন্ডের বিনিয়োগ আসে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাঙ্ক থেকে, পাইলট হিসেবে প্ল্যান্টের প্রথম পর্যায়ে সিঙ্গাপুরের হিফলাক্স এর সঙ্গে একযোগে তারা বিনিয়োগ করে।

গঙ্গোত্রীতে হিফলাক্স নতুন হলেও ERI এর অন্যান্য প্রকল্প ও ERI এর সিইও জি.জি. পিকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছিল সংস্থাটি। উত্তর-পশ্চিম আলজেরিয়ার ২০০,০০০ কিউবিক মিটার ক্ষমতা সম্পন্ন ডিস্যালাইলেশন প্ল্যান্ট Souk Tleta SWRO এর কাজ ২০১০ এর প্রথমার্ধে শুরু হওয়ার কথা ছিল. আলজেরিয়ার সরকারি জল ব্যবহার্য কোম্পানি আলজেরিয়ান এনার্জি কোম্পানিকে পরিশুদ্ধ জল সরবরাহের কথা ছিল তাদের।

চিনের ১০০,০০০ কিউবিক মিটার প্রতিদিন ক্ষমতাসম্পন্ন তিয়াঞ্জিন ডিস্যালিয়েনেশন প্রকল্পের জন্য হিফলাক্স এর আগেই ERI এর পিএক্স প্রযুক্তির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিল। আমাদের পাইলট পর্যায়ে হিফলাক্সের প্রকল্পের গতি ও দ্রুততা দেখা ছিল এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। সিঙ্গাপুরের ১০ শতাংশ জলের প্রয়োজনীয়তা মেটানোর জন্য পরিকল্পিত প্রকল্প সিঙস্প্রিংএর নক্সার অনেককিছুই এখানে অনুসরণ করত তারা। এই সময়টি আমরা সিঙস্প্রিং-এ কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সিঙাপুরের টিমের কাছে আমাদের ভারতীয় টিমের শিক্ষার জন্য ব্যবহার করি। পাইপ ও টারবাইন কাজ শুরুর পর, আমরা স্বচক্ষে অ্যালকেমি দেখি, ইউএস ডলার ১৫০ মিলিয়ন তৈরির খরচে ১০০,০০০ কিউবিক মিটার জল প্রতিদিন, যা সিংস্প্রিং এর ১৬,৩৮০ কিউবিক মিটার প্রতিদিন এর কাছাকাছি।

প্রাথমির পর্যায়ে ERI ও হিফলাক্সের নাম বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আমাদের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে সাহায্য করে। এবং হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যালকে ক্রেতা হিসেবে পাওয়া ও পাইলট পর্যায়ে তা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করায় আমরা বিনিয়োগ পাওয়ার ক্ষেত্রে খুবই ভালো জায়গায় ছিলাম। সরকারি-বেসরকারি যৌথতা বা ব্যাঙ্কের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হওয়া প্রতিটি ক্ষেত্রেই। সিঙস্প্রিং প্রকল্পে বিনিয়োগকারী পাঁচটি ব্যাঙ্ক- ডিবিএস, কেবিসি ব্যাঙ্ক, আইএনজি ব্যাঙ্ক, স্ট্যান্ডার্ড চাটার্ড ব্যাঙ্ক, নরডয়েচে ল্যান্ডব্যাঙ্ক গিরোজেনট্রেলকে নিয়ে আসে হিফলাক্স।

২০১২ এ হলদিয়া প্ল্যান্ট পুরোদমে কাজ শুরু করে পশ্চিমবঙ্গের শিল্পক্ষেত্রের একটা বড় অংশকে জল দিতে আরম্ভ করে এবং আরও অনেক বিনিয়োগও আসতে থাকে। ওড়িশা সরকার আমাদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়। স্বাধীনতার পর থেকে বড় সময় ব্যাকওয়াটার রাজ্য হিসেবে কাটিয়েছে ওড়িশা। তারা একটি সুযোগ খুঁজছিল এবং হাউড্রো-অ্যালকেমি তাদের সেই সুযোগ দেয়। ন্যাশনাল হাইওয়ে ৫ এ সাইনবোর্ডে বড় অক্ষরে লেখা দেখা যায় ওড়িশা-নতুন হিমবাহ রাজ্য।

২০১৭ এর মধ্যে ওড়িশার উপকূলে সরকারি জমিতে প্রচুর ভর্তুকিতে ৩০ টি গঙ্গোত্রী ডিস্যালিয়েনেশন প্ল্যান্ট শুরু হয়। ৪.৫ বিলিয়ন ইউএস ডলার খরচে প্রতিদিন তিন মিলিয়ন কিউবিক মিটার পরিশুদ্ধ জল তৈরি হচ্ছিল। এর দ্বারা ওড়িশা, বিহার, মধ্যপ্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ ও পশ্চিম মহারাষ্ট্রের শিল্প বাজারের ৭৮ শতাংশ শেয়ার দখল করে গঙ্গোত্রী।

২০১৮ এর মধ্যে গঙ্গোত্রী তাদের কমপ্লেক্স গ্রিডের মাধ্যমে দক্ষিণ ভারতীয় বিভিন্ন রাজ্যেও জল সরবরাহ শুরু করে। বিশ্ব ব্যাঙ্কের থেকে ওয়াটার গ্রিড প্রকল্পের জন্য বড় বিনিয়োগ পায় ভারত সরকার। আইবিএম সেটা পরিকল্পনা ও স্থাপন করে। এই সময়ই হঠাত্ করেই একটি বহু পুরোনো কূটনৈতিক সমস্যার সমাধান করে ফেলি আমরা। ভারত হিমালয় থেকে আসা নদীগুলিকে যুক্ত করে দক্ষিণের দিকে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছিল। এরফলে বাংলাদেশ অত্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হত কারণ তাদের ২০ মিলিয়ন ছোট কৃষকের ৮০ শতাংশেরও বেশি এই জলের ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু ২০১৮ তে গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রের বড় অংশের জলের গতিপথ পরিবর্তনের বদলে ভারত সরকার দক্ষিণি নদীগুলিতে ওড়িশার গঙ্গোত্রী প্রকল্প থেকে পরিশুদ্ধ জল সরবরাহ করতে সক্ষম হয়।

বাংলাদেশকে এই দুর্যোগের হাত থেকে বাঁচাতে পারায় আমরা ও দেশের ডিস্যালিয়েনেশন প্রকল্পের, যার চাহিদা 1১.৫ মিলিয়ন কিউবিক মিটার প্রতিদিন প্রায় ১০০ শতাংশ তৈরি করার কাজ হাতে পাই। যা আমাদের ২০১৯ এর সংগ্রহকে ২.২৫ বিলিয়ন ইউএস ডলারে নিয়ে যায়। ২০২০ তে গঙ্গোত্রী একটি বহু বিলিয়ন ডলারের কোম্পানি, কিন্তু আমরা আরও অনেক কিছু। আমরা পৃথিবীর একটি অন্যতম বড় সমস্যা সমাধানের জন্য কাজ করছি, বিরাট বড় দায়িত্ব, তার থেকেও অনেক বেশি আনন্দ।