BREXIT এর অশনি সংকেত ভারত কি টের পাচ্ছে?

0

বার্লিনের পাঁচিল ভাঙার পর সব থেকে বড় বিপর্যয়টা বোধ হয় এই সেদিন ঘটে গেল ইউরোপে। ব্রিটেনের ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তটা গোটা দেশ গণতান্ত্রিক ভাবে নিয়ে নিলো। যদিও এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার রেফারেন্ডাম বুঝিয়ে দিল জনমতের এই লড়াই ছিল টানটান। তবু ঘুটি টা ফেলতেই হত। এবং ব্রিটেন আর কখনও আগের জায়গায় ফিরতে পারবে না। অবশ্যই বিশ্ব অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়বে। নতুন করে মন্দার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। রীতিমত আতঙ্কিত হতে শুরু করে দিয়েছে গোটা দুনিয়া। বিশেষজ্ঞরা প্রমাদ গুনছে। আরও আবছা হয়ে যাচ্ছে সামনের আকাশ। ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। সময়টা আরও খারাপ হতে পরে। দেখুন চিনের অর্থনীতির দিকে যদি তাকান গত কয়েক দশক ধরে যে ঊর্ধ্বমুখী ইনডেক্সগুলো আমরা দেখেছি এখন কিন্তু সবগুলোই গোত্তা দিয়ে নীচে নামছে। ব্রাজিলের পরিস্থিতি খুবই সঙ্গিন, সে রাজনীতিই বলুন আর অর্থনীতি। আর ভারতে গগনচুম্বী দাবী ছাড়া আর কিচ্ছু নেই। বাস্তবটা আড়াল করে রাখা আছে প্রচারের নকশি কাঁথায়।

অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে যত না, তার থেকেও রাজনৈতিক ভাবে এই রেফারেন্ডাম খুবই অর্থবহ। তিনটে জিনিসকে চিহ্নিত করেছে এই রেফারেন্ডাম।
১) গোটা বিশ্বজুড়েই মাইগ্রেশন একটা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। বাইরে থেকে যতই উদার মনে হোক আসলে উন্নত বিশ্বও আগন্তুককে জায়গা করে দেওয়ার প্রশ্নে ততটা উদার নয়।
২) দ্বিতীয়ত এখানে একটা স্পষ্ট বিভাজিকা রেখা টানা আছে। গরিব বড়লোকের। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সঙ্গে থাকার কোনও ভবিষ্যৎ আদৌ আছে একথা লন্ডনের থেকে কম উন্নত এলাকার মানুষ, কিংবা অর্থনৈতিক ভাবে পিছিয়ে থাকা এলাকার লোকজন বিশ্বাসই করে না। তাই লন্ডন পড়ে থাকল বাকিদের দলে।
৩) বিশ্বায়নের প্রক্রিয়ার থেকে জাতীয়তা বেশি সুনির্দিষ্ট এবং রাজনৈতিকভাবে অনেক সফল একটি আবেগ। সাজানো বৃহত্তর জাতীয়তা বোধ ততটা আকর্ষক ধারণা থাকে না যখন অর্থনীতির প্রশ্নে আশাভঙ্গ হতে থাকে।

ভারত, দ্রুত উন্নতিশীল অর্থনীতি। অন্তত এমনটাই ভারত সরকারি ভাবে ঢেঁড়া পিটিয়ে থাকে। কিন্তু জানবেন এর ধাক্কা ভারতে পড়বে। বিশেষ করে সেই সময় যখন রঘুরাম রাজনের মত মানুষ রিজার্ভ ব্যাঙ্কের পদ ছাড়তে আগ্রহ প্রকাশ করছেন এবং ভাবনার জগতে ফিরতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। তখন বুঝতে হবে ইঙ্গিত ভালো নয়। আমার ব্যক্তিগত ভাবে মনে হয় BREXIT কী সেটা ভারতের আরও গভীরভাবে বোঝা উচিত। কারণ এর মধ্যে অনেকগুলো লুকোনো বিষয় রয়েছে যার প্রভাব এসে পড়তে চলেছে ভারতের অর্থনীতি, রাজনীতি এবং সমাজের ওপরে। সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে BREXIT এ ভারতের বিপদ আছে। অর্থনৈতিক বিপদের থেকে তার গুরুত্ব অনেকটাই বেশি। যেসব পণ্ডিতেরা একে বিদেশি বিদ্বেষ বা উগ্র-জাতীয়তা বলে ব্যাখ্যা করছেন আমি তাঁদের সঙ্গে সরাসরিভাবেই একমত নই। আমার মনে হয় একটি জটিল রাজনৈতিক সামাজিক সমস্যার এটি অতি সরলীকৃত উত্তর, এটা শুধু সরল উত্তর বললেই কথা শেষ হয়ে যায় না, বরং একটা অপেক্ষমাণ রূঢ় সত্য যেটা দানবের দৃষ্টি দিয়ে গোটা দুনিয়াকে দেখছে তাকে আমরা এড়িয়ে যাচ্ছি। BREXIT কোনও গভীর অসুস্থতার কোনও পৃথক উদাহরণ নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির শীর্ষ নেতাদের আপত্তি সত্ত্বেও গুটি গুটি পায়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের উঠে আসাটাও একই মুদ্রার আরেকটি পিঠ। ফ্রান্সের দিকে দেখুন, পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হওয়ার দৌড়ে উগ্র দক্ষিণ-পন্থী নেত্রী ম্যারিন লে পেন উঠে আসছেন। যদি ভাগ্য সহায় হয় তিনি হবেন। আর ভারত তো ইতিমধ্যেই চলে গিয়েছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সঙ্ঘ পরিবারের খপ্পরে। ভারতকে ওরা হিন্দু রাষ্ট্র বানানোর তালে আছে। পশ্চিম এশিয়া সহ গোটা দুনিয়া আইএসআইএস-এর উগ্র সন্ত্রাসের শিকার। কোনও দেশ এবং কোথাও কোনও নাগরিক এখন আর নিরাপদ নয়। এবং এই সবারই এক জায়গায় মিল রয়েছে সেটা হল এরা সবাই বিচ্ছিন্নতা এবং বিভিন্ন মতের প্রশ্নে অসহিষ্ণু। বিংশ শতাব্দীর মূলমন্ত্র ছিল সাম্য স্বাধীনতা আর মৈত্রী।

মানব সভ্যতার অগ্রগতির ইতিহাসে দেশান্তর এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল যা মানব সভ্যতাকে পরিপূর্ণতা দিয়েছে। মাইগ্রেশন সস্তায় শ্রমিক দিয়েছে। কিন্তু তার থেকেও বেশি দিয়েছে বিশ্বের আপাত অপরিচিত অংশ থেকে আসা নতুন নতুন উদ্ভাবনী চিন্তা। নতুন চিন্তা নতুন সম্ভাবনা নিয়ে এসেছে। চিন্তার সঙ্গে চিন্তার মিলন হয়েছে। আর তার ফসল হিসেবে মানব সভ্যতা পেয়েছে একের পর এক উদ্ভাবনী শক্তি। যা দিয়ে সে বিপদের সঙ্গে যুঝেছে এবং জয়ী হয়েছে। মাইগ্রেশন দু ধরণের হতে পারে। এক তো দেশের ভিতর থেকেই একটি অঞ্চল থেকে অন্য একটি অঞ্চলে স্থানান্তরিত হওয়া জীবন ও জীবিকার সন্ধানে গ্রাম থেকে শহরে আসার মত মাইগ্রেশন। আর হতে পারে অন্য দেশ থেকে আসা। অন্য সংস্কৃতি থেকে। অন্য জীবন যাপন, খাদ্যাভ্যাস থেকে একদম অপরিচিত শহরে, অপরিচিত দেশে, ওই জীবন আর জীবিকার সন্ধানে চলে আসা।

ভারতে এরকম মাইগ্রেশন তো আছেই। ঘটেই থাকে। বিহার ইউপির গ্রামের নিশ্চিন্ত আশ্রয় ছেড়ে কত মানুষ যান আশপাশের শহরে। লখনৌ কিংবা পাটনায়। কিংবা আরও দূরে। মুম্বাই কিংবা বেঙ্গালুরু কিংবা কলকাতার রাস্তায় আমরা রোজ দেখি এরকম ঘর গেরস্থালি দেশে রেখে শহরে এসেছেন রোজগার করতে। টাকা পাঠাবেন ঘরে সেখানে সংসার চলবে। এভাবে তো মুম্বাই-দিল্লির মত শহর ভরে গিয়েছে। একে অপরের সংস্কৃতিকে আপন করে নিয়েছে।

সত্য নাদেলা, সুন্দর পিচাইয়ের মত মানুষ আজকে পৃথিবীর সবথেকে বড় দুটি সংস্থার নেতৃত্ব দিচ্ছেন। একজন মাইক্রোসফট আরেকজন গুগল। ইন্দ্রা নুইই পেপসি চালাচ্ছেন, কিছুদিন আগে পর্যন্ত নিকেশ আরোরা জাপানি একটি সংস্থার নেতৃত্ব দিয়েছেন। আর এগুলো সম্ভব হয়েছে মাইগ্রেশন হয়েছে বলেই। পূর্ব পশ্চিম উভয়ই এই মিলনে উপকৃত হয়েছে। গত শতাব্দী রাজত্ব করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এটা অন্য দেশ থেকে জড়ো মানুষেরই দেশ। দুর্ভাগ্যবশত BREXIT অন্য কাহিনি রচনা করছে। নতুন ইতিহাস। এটা দুনিয়াকে বলতে চাইছে মাইগ্রেশন ভালো নয় এবং যারা এভাবে এসেছেন তাঁদের স্বাগত জানানো হচ্ছে না। অভিবাসন নেওয়া মানুষগুলো দেশে দেশে অবাধ বিচরণেই সব থেকে বেশি ক্ষোভ ছিল ব্রিটেনের। এরাই গণভোটে EXITএর পক্ষে মত দিয়েছেন। যখন গোটা দুনিয়া লন্ডনের মেয়র পদে একজন মুসলিমকে নির্বাচিত হতে দেখে আহ্লাদে আটখানা তখন সেই সমাজেরই আরেক দল এর ঘোর বিরোধী।

কয়েক বছর আগের মুম্বাইয়ের শিবসেনা এবং এমএনএসের নেতৃত্বে রাজ ঠাকরের উগ্র জাত্যভিমানে ভরপুর সেই তাণ্ডবময় চিত্রনাট্যের কথা মনে করিয়ে দিল। ৬০, ৭০ এর দশকে বালা সাহেব তো দক্ষিণ ভারতীয়দের উপর অকথ্য অত্যাচার করেছেন। আর তারপর উত্তর ভারতীয়দের ওপর চলেছে অকথ্য নির্যাতন। রাজ কাকাবাবুর দেখিয়ে দেওয়া পথে হেঁটেই হিংসার প্রদর্শন করেছেন মুম্বাইয়ের রাস্তায়। এই তো সহিষ্ণুতার চিত্র। অন্যদিকে ভারতীয় সংবিধানে দেশের মানুষকে মুক্ত ভাবে ঘুরে বেড়ানোর, জীবন জীবিকার সন্ধানে দেশের যেকোনও প্রান্তে বসবাস করার অধিকার দিয়েছে। কিন্তু চিরকালই মাথা চারা দিয়ে উঠেছে আমরা বনাম ওরার লড়াই। অসমে বাঙালি 'খেদাওয়ের' দাঙ্গা হয়েছে। এখনও উত্তর ভারতের মানুষকে দিল্লির রাজনীতিবিদদের একাংশ সমস্ত অপকম্মের দোষের ভাগী করেন। এখনও উত্তর পূর্বাঞ্চলের মানুষের সঙ্গে দেশের মূল ভূখণ্ডের মানুষের একটা মৌলিক সংঘাত লেগেই থাকে। এবং আজকাল এটা গম্ভীর সমস্যা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আর এসবের ভিতর দিয়েই আমরা টের পাই আমাদের দেশের ভিতর আমরা কত বীভৎস অসহিষ্ণু।

যখন বিশ্ব গ্রামের কথা বলি। এই সময়টা যখন এই বিশ্ব-গ্রামের। বিশ্বায়নের তখনও আমরা ভুলি না আমাদের পরিচয়টাই আসল। নিজেদের মধ্যে মিলে মিশে যাওয়াটা ততক্ষণ পর্যন্ত গ্রহণযোগ্য যতক্ষণ না এটা বৃহত্তর অর্থে সমাজের সমষ্টির পরিচয়ের ওপর দাগ কাটছে এবং ব্যক্তিকে সেটা ভয় দেখাচ্ছে। রবীন্দ্রনাথ বলছেন বিবিধের মাঝে মিলন মহান। কিন্তু বিবিধের বৈচিত্র্য হঠাৎ করেই যেন অসুবিধের খোপে পড়ে গিয়েছে। বহুত্বের ভাবনা উন্নত সমাজের কাছে মরণ-ফাঁদ হয়ে গিয়েছে। কিন্তু ভারতে এই বহুত্ব, এই বিবিধের মাঝে মিলনই এখনও মহান একটি মূর্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আর পরিচয়ের জিগির তোলা এই দেশের সেই সব শক্তি মহান মিলনের মূর্তিটা ভাঙতে চাইছে। সেটা দেশের জন্যে সব থেকে বড় অভিশাপ হতেই পারে। সিঁদুরে মেঘ দেখে আমাদের ভয় পাওয়ার কারণ আছে বইকি! রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আছে সামাজিক মনস্তাত্ত্বিক প্ররোচনা আছে। জাতি হিসেবে তাই আমাদের উচিত BREXIT এর নিহিত অর্থটি গভীর ভাবে অনুধাবন করা উচিত।

লিখেছেন AAP নেতা সাংবাদিক আশুতোষ-অনুবাদ Team YS Bangla

(Disclaimer: The views and opinions expressed in this article are those of the author and do not necessarily reflect the views of YourStory)